অস্ত্র ছাড়তে ৬০ দিনের ইসরাইলি আলটিমেটাম হামাসের প্রত্যাখ্যান

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

  • যুদ্ধবিরতি কার্যকরে ইসরাইলের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধির আহ্বান
  • রাফাহ সীমান্ত খোলায় মাত্র ২৯ শতাংশ বাস্তবায়ন
  • পশ্চিম তীরের জমিকে ‘রাষ্ট্রীয় ভূমি’ ঘোষণার নিন্দায় তুরস্কসহ ৮ দেশের যৌথ বিবৃতি

ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসকে ৬০ দিনের মধ্যে নিরস্ত্র হতে হবে বলে হুমকি দিয়েছেন ইসরাইল সরকারের এক কর্মকর্তা। তিনি বলেছেন, হামাস তা না মানলে ইসরাইল আবারো ‘গণহত্যামূলক যুদ্ধ’ শুরু করবে। এই মন্তব্য সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে হামাস।

আল-জাজিরাকে হামাসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মাহমুদ মারদাবি সোমবার বলেন, এমন কোনো দাবির বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। তিনি বলেন, ‘ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং গণমাধ্যমের মাধ্যমে দেয়া বক্তব্যগুলো চলমান আলোচনার সাথে সম্পর্কহীন, এগুলো কেবল ভিত্তিহীন হুমকি।’

মারদাবির এই মন্তব্য এলো এমন এক ঘটনার পর, যখন ইসরাইলের মন্ত্রিপরিষদ সচিব ইয়োসি ফুকস সোমবার জেরুসালেমে এক সম্মেলনে বক্তব্য দেন। সেখানে তিনি হুমকি দিয়ে বলেন, ৬০ দিনের মধ্যে হামাস নিরস্ত্র না হলে গাজায় ‘গণহত্যামূলক যুদ্ধ’ আবার শুরু করা হবে। নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ফুকস দাবি করেন, এই দুই মাস সময় দেয়ার প্রস্তাবটি যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের পক্ষ থেকে এসেছে। তিনি বলেন, ‘আমরা সেটিকে সম্মান করছি।’

এই আলটিমেটাম ঠিক কবে থেকে শুরু হবে, তা নিশ্চিত না করলেও ফুকস বলেন, এটি ১৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিসের’ বৈঠক থেকে শুরু হতে পারে। এটি ওয়াশিংটনের সমর্থিত গাজা পুনর্গঠন পরিকল্পনা। ফুকস বলেন, ‘আমরা বিষয়টি মূল্যায়ন করব। যদি কাজ করে, তাহলে ভালো। আর যদি না করে, তাহলে আইডিএফকে (ইসরাইলি সেনাবাহিনী) মিশন সম্পন্ন করতে হবে।’

হামাসের মারদাবি আল-জাজিরাকে আরো বলেন, যুদ্ধ ফের শুরু করার যেকোনো হুমকি ‘পুরো অঞ্চলের জন্য গুরুতর পরিণতি’ ডেকে আনবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘ফিলিস্তিনি জনগণ আত্মসমর্পণ করবে না।’

জানুয়ারির মাঝামাঝি তথাকথিত ‘যুদ্ধবিরতি’ চুক্তির দ্বিতীয় ধাপ শুরু হয়। এতে যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, তারা হামাসকে নিরস্ত্র করা এবং একটি আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েনের বিষয়টি দেখবে। তবে ইসরাইল গাজা দখল করে রাখলে অস্ত্র ছাড়বে না বলে জানিয়ে দিয়েছে হামাস।

এ মাসের শুরুর দিকে, বিদেশে অবস্থানরত হামাসের রাজনৈতিক নেতা খালেদ মেশালও গাজায় ফিলিস্তিনি সংগঠনগুলোর নিরস্ত্রীকরণের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, দখলদার শক্তির অধীনে থাকা জনগণের কাছ থেকে অস্ত্র কেড়ে নেয়া হলে তারা ‘সহজ শিকার হয়ে ধ্বংসের মুখে’ পড়বে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরাইলের গণহত্যায় ৭২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে হাজার হাজার শিশু রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় অক্টোবরে শুরু হওয়া তথাকথিত ‘যুদ্ধবিরতি’ কার্যকর থাকার পরও ইসরাইলের হামলা অব্যাহত রয়েছে। এই সময়ের মধ্যে ৬০০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। গাজা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ইসরাইল এই ‘যুদ্ধবিরতি’ এক হাজার ৫২০ বার লঙ্ঘন করেছে। প্রায় প্রতিদিন ফিলিস্তিনিদের হত্যা ছাড়াও, গাজায় প্রবেশ করা খাদ্য, ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, আশ্রয় উপকরণ এবং প্রিফ্যাব ঘরের পরিমাণও কঠোরভাবে সীমিত করেছে ইসরাইল। সেখানে প্রায় ২০ লাখ ফিলিস্তিনি বাস করছেন। তাদের মধ্যে ১৫ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত। তারা ভয়াবহ মানবিক পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

যুদ্ধবিরতি কার্যকরে ইসরাইলের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধির আহ্বান

ফিলিস্তিনের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মুস্তাফা গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাস্তবায়নে ইসরাইলের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন। রামাল্লাহতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ফিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এলিনা ভালটোনেনের সাথে এক বৈঠকে তিনি এ আহ্বান জানান। খবর আনাদোলু এজেন্সির।

বৈঠকে মোহাম্মদ মুস্তাফা বলেন, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও গাজায় সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে এবং চুক্তির দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে। তিনি মানবিক সহায়তা বৃদ্ধির পাশাপাশি গাজার পুনর্গঠন প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু করার ওপর জোর দেন।

ফিলিস্তিনি প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেন, গাজায় যুদ্ধবিরতির পাশাপাশি অধিকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুসালেমে বসতি সম্প্রসারণ ও ভূখণ্ড দখলের পরিকল্পনা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইল, যা শান্তি প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তার মতে, এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরো সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। ফিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এলিনা ভালটোনেন বলেন, তার দেশ গাজায় যুদ্ধের অবসান, মানবিক সহায়তা জোরদার এবং পুনর্গঠন কার্যক্রমে সমর্থন অব্যাহত রাখবে। তিনি জাতিসঙ্ঘের প্রাসঙ্গিক প্রস্তাব বাস্তবায়নের মাধ্যমে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান জোরদার করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।

রাফাহ সীমান্ত খোলায় মাত্র ২৯ শতাংশ বাস্তবায়ন

রাফাহ স্থল সীমান্ত আবার খোলার ক্ষেত্রে ইসরাইল মাত্র ২৯ শতাংশ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করেছে বলে জানিয়েছে গাজার সরকারি মিডিয়া অফিস। সংস্থাটির তথ্যমতে, ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে আবেদনকারীদের বড় অংশ সীমান্ত পার হওয়ার সুযোগ পাননি। বিবৃতিতে বলা হয়, ২ থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রায় দুই হাজার ৮০০ জন আবেদন করলেও মাত্র ৮১১ জন যাতায়াত করতে সক্ষম হন। এর মধ্যে ৪৫৫ জন গাজা ছাড়েন এবং ৪৫৬ জন প্রবেশ করেন। আরো ২৬ জনকে সীমান্ত থেকে ফেরত পাঠানো হয়। গাজা কর্তৃপক্ষ জানায়, চুক্তি অনুযায়ী প্রতিদিন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগী ও তাদের সাথীদের যাতায়াতের কথা থাকলেও বাস্তবে তা মানা হয়নি। ফলে আহত ও গুরুতর অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা সঙ্কট আরো গভীর হয়েছে। স্থানীয় হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ২২ হাজার মানুষ চিকিৎসার জন্য গাজা ছাড়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। একই সাথে প্রায় ৮০ হাজার বাসিন্দা ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও গাজায় ফিরে আসার জন্য নাম নিবন্ধন করেছেন, যা জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি প্রত্যাখ্যানের স্পষ্ট বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

পশ্চিম তীরের জমিকে ‘রাষ্ট্রীয় ভূমি’ ঘোষণার নিন্দায় তুরস্কসহ ৮ দেশের যৌথ বিবৃতি

অধিকৃত পশ্চিম তীরের জমিকে ‘রাষ্ট্রীয় ভূমি’ ঘোষণা করার ইসরাইলি সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে তুরস্কসহ আটটি দেশ। তুরস্ক, মিসর, ইন্দোনেশিয়া, জর্দান, পাকিস্তান, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এক যৌথ বিবৃতিতে এই সিদ্ধান্তকে আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে আখ্যা দেন। খবর আনাদোলু এজেন্সির।

যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, এই পদক্ষেপ বসতি সম্প্রসারণ, ভূমি দখল এবং অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণ আরো দৃঢ় করার উদ্দেশ্যে নেয়া হয়েছে। এতে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব ২৩৩৪ (২০১৬) এবং চতুর্থ জেনেভা কনভেনশনের লঙ্ঘন ঘটছে বলে উল্লেখ করা হয়। বিবৃতিতে আরো বলা হয়, আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের পরামর্শমূলক মতামতের সাথেও এই সিদ্ধান্ত সাংঘর্ষিক, যেখানে ভূখণ্ড দখলের মাধ্যমে সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠাকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা সতর্ক করে বলেন, এ ধরনের একতরফা পদক্ষেপ দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনাকে দুর্বল করছে এবং অঞ্চলে অস্থিরতা বাড়াচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানানো হয়।

নতুন ইসরাইলি বিধিনিষেধে গাজা ছাড়ছে আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলো

নতুন ইসরাইলি প্রশাসনিক বিধি-নিষেধের কারণে গাজা উপত্যকা থেকে কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে একাধিক আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা। ব্রিটিশ ও ইউরোপীয় কয়েকটি সংস্থাসহ অন্তত ৩৭টি আন্তর্জাতিক সংগঠনকে জানানো হয়েছে যে তাদের নিবন্ধনের মেয়াদ শেষ হয়েছে। মানবিক সূত্রগুলোর বরাতে মিডলিস্ট মনিটর জানায়, নতুন নিয়ম অনুযায়ী সংস্থাগুলোকে ফিলিস্তিনি কর্মীদের বিস্তারিত তথ্য ও অর্থায়নের পূর্ণাঙ্গ হিসাব জমা দিতে বলা হয়েছে। সংস্থাগুলোর দাবি, এসব শর্ত মানবিক নীতির পরিপন্থী এবং কর্মীদের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ জানুয়ারি থেকে ৬০ দিনের সময়সীমা নির্ধারণ করে দেয়, যার মধ্যে শর্ত পূরণ না করলে বিদেশী কর্মীদের প্রত্যাহার ও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এসব সহযোগী সংস্থাগুলো চলে গেলে গাজার খাদ্য, পানি ও স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।