সরকারি চাকুরেদের জন্য নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের পক্ষে নয় আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটি বাংলাদেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এনে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন স্থগিত করার দৃশত পরামর্শ দিয়েছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই মহূর্তে পে-স্কেল বাস্তবায়ন স্থগিত করার সম্ভব নয়।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বাংলাদেশ ও হংকংবিষয়ক মিশনপ্রধান ইভো ক্রজনার নেতৃত্বে একটি ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন গেল সপ্তাহে বাংলাদেশে সফরে এসে অর্থ বিভাগের সাথে আলোচনায় এ পরামর্শ দেয়। মিশনটি চলতি জুলাই মাসের ১২ থেকে ১৬ জুলাই ঢাকা সফর করে। এ সময় তারা অর্থ মন্ত্রণালয়, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ বিভিন্ন সংস্থার সাথে ধারাবাহিক বৈঠক করেছে।
সূত্র জানায়, অর্থ বিভাগের সাথে আলোচনায় আইএমএফের পক্ষ থেকে নতুন পে-স্কেল সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। এ সময় অর্থ বিভাগ থেকে জানানো হয়, গত ১২ বছর ধরে সরকারি চাকুরেদের কোনো পে-স্কেল দেয়া হয়নি। এ সময় জীবন যাত্রার ব্যয় বহুগুণ বেড়ে গেছে। তাই সরকারি চাকুরেদের জন্য বর্ধিত বেতন কাঠামো ছাড়া কোনো বিকল্প পথ খোলা নেই। এ সময় আইএমএফের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করতে কত টাকার প্রয়োজন হবে। অর্থ বিভাগ থেকে বলা হয়, পুরোটা বাস্তবায়ন করা হলে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। তবে এটি একসাথে বাস্তবায়ন করা হবে না। দু’টি ধাপে বাস্তবায়ন হতে পারে। তাই একসাথে পুরো টাকার প্রয়োজন পড়বে না। আইএমএফ পক্ষ থেকে বলা হয়, সরকার নতুন করে ঋণের জন্য আইএমএফের সহায়তা চেয়েছে। সরকারের যখন অর্থের প্রয়োজন, সেখানে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের সরকারের ব্যয় আরো বেড়ে যাবে। পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে আরো বেশি করে ঋণ করার প্রয়োজন হতে পারে। তাই এ মুহূর্তে পে-স্কেল বাস্তবায়ন কিছু সময়ে স্থগিত করা সম্ভব কিনা।
এর জবাবে অর্থ বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়,সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে জুলাই থেকে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা হবে। বাজেটে তা ঘোষণা করা হয়েছে। এতে করে সরকারি চাকুরেদের মধ্যে একটি প্রত্যাশার সৃষ্টি হয়েছে। তাই এ পে-স্কেল বাস্তবায়ন স্থগিত করা সম্ভব নয়।
এ বিষয়ে অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেছেন, আইএমএফের পক্ষ থেকে সরসারি নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন স্থগিত কথা বলা হয়নি। তবে তারা যে সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিপক্ষে তা আমরা আলোচনার সময়ই বুঝতে পেরেছি। তারা আমাদের কাছে জানতে চেয়েছে নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নে কত টাকার প্রয়োজন হবে। এই টাকা কোথায় থেকে সংগ্রহ করা হবে। পে-স্কেল বাস্তবায়িত হলে তা মূল্যস্ফীতি ওপর কী প্রভাব ফেলবে। কয়েক বছর ধরেই তো মূল্যস্ফীতি ৯-১০ শতাংশের ঘরে অবস্থান করছে। এখন পে-স্কেল বাস্তবায়িত হলে মূল্যস্ফীতি আরো বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
এ বিষয়ে অর্থ বিভাগ বলেছে, নুতন পে-স্কেল বাস্তবায়িত হলে মূল্যস্ফীতির ওপর একটি প্রভাব পড়বে। ২০১৫ সালে সর্বশেষ স্কেল বাস্তবায়নের সময়ও তা হয়েছিল। মূল্যস্ফীতির হার কম থাকার কারণে সেটি তিন মাস স্থায়ী হয়েছিল। কিন্তু এবার মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপর অবস্থান করছে। এখন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা হলে তা মূল্যস্ফীতির ওপর বড়জোর ছয়-সাত মাস স্থায়ী হতে পারে। পরে আস্তে আস্তে মূল্যস্ফীতি কমে আসবে। তারা এ সম্পর্কে একটি পেপার আইএমএফের মিশনের সামনে উপস্থাপন করে।
উল্লেখ্য, আইএমএফ সাথে একটি নতুন ঋণ চুক্তি করতে চায় সরকার। এ জন্য অর্থমন্ত্রী পক্ষ থেকে আইএমএফের কাছে একটি চিঠিও দেয়া হয়েছে। সরকার চাচ্ছে এই সংস্থার কাছ থেকে ৫০০ কোটি ডলার ঋণসহায়তা। এই ঋণসহায়তার বিষয়টি খতিয়ে দেখতে আইএমএফ মিশনটি বাংলাদেশ সফর করে।
এ দিকে মিশন শেষে আইএমএফ এক বিবৃতিতে বলেছে, বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য রাজস্ব, আর্থিক খাত ও মুদ্রাস্ফীতির চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে এই চাপগুলো আরো বেড়েছে, যা আমদানি ও ভর্তুকি ব্যয় বৃদ্ধি করেছে এবং ব্যাংকিং খাতের উচ্চ চাপের মধ্যে নতুন করে মুদ্রাস্ফীতির চাপ সৃষ্টি করেছে।
অব্যাহত রাজস্ব ও আর্থিক খাতের চাপের কারণে ২০২৭ অর্থবছরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে ৩.৫ শতাংশে দাঁড়াবে এবং মধ্যমেয়াদে তা ৩ শতাংশের নিচে থাকবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। রাজস্ব আহরণ শক্তিশালী করতে এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাগুলো মোকাবেলায় সংস্কার এগিয়ে নিলে মধ্যমেয়াদি পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
ইভো ক্রজনার বলেন, “আইএমএফ প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সাথে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক ঘটনাবলি এবং তাদের নীতিগত অগ্রাধিকার নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা করেছে। এই তথ্য-অনুসন্ধানমূলক(ফ্যাক্ট ফাইনডিং) সফরটি কর্তৃপক্ষের নীতি পরিকল্পনা, অর্থনৈতিক সংস্কারের অগ্রাধিকার এবং সক্ষমতা উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা আরো ভালোভাবে বোঝার সুযোগ করে দিয়েছে। একটি নতুন ব্যবস্থার সম্ভাব্য রূপরেখা যার মধ্যে এর আকার এবং সংশ্লিষ্ট সংস্কার প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত থাকবে বলে আমরা মনে করি। এ নিয়ে আগামী মাসগুলোতে আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে।



