পাতারটেকে ‘জঙ্গি নাটক’ সাজিয়ে সাতজনকে হত্যা

হাসিনা, শহীদুল, পাটোয়ারীসহ ১০ জনের বিচার শুরুর আর্জি

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

গাজীপুরের পাতারটেকে ২০১৬ সালে পরিচালিত কথিত ‘অপারেশন শরতের তুফান’-এ সাতজনকে হত্যা এবং রাজধানীর কল্যাণপুরের ‘জাহাজবাড়ি’ অভিযানে নয়জন নিহত হওয়ার পৃথক দুই মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বিচারিক কার্যক্রমে অগ্রগতি হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ রোববার পাতারটেক মামলায় প্রসিকিউশনের অভিযোগ গঠন-সংক্রান্ত শুনানি শেষ হওয়ার পর আসামিপক্ষের শুনানির জন্য আগামী ১০ আগস্ট দিন ধার্য করেছেন। একই দিনে জাহাজবাড়ি হত্যা মামলায়ও আসামিদের ডিসচার্জ (অব্যাহতি) আবেদনের শুনানির নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।

গতকাল রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর সদস্য বিচারক মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চ এ আদেশ দেন।

পাতারটেক হত্যামামলা

এই মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) গঠন করে বিচার শুরুর আবেদন জানিয়ে শুনানি করেন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম। তার সাথে প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ, সহিদুল ইসলাম সরদার, আবদুস সাত্তার পালোয়ান, মামুনুর রশিদ ও মার্জিনা রায়হান উপস্থিত ছিলেন।

শুনানিতে প্রসিকিউশন অভিযোগ করে, ২০১৬ সালের ৮ অক্টোবর গাজীপুরের নোয়াগাঁও পাতারটেক এলাকায় পরিচালিত ‘অপারেশন শরতের তুফান’ নামে অভিযানে সাতজনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়। প্রসিকিউশনের দাবি- এর আগে তাদের দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে তুলে এনে বগুড়ায় পুলিশের একটি গোপন বন্দিশালায় রাখা হয়েছিল। পরে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের নেতৃত্বে কথিত জঙ্গিবিরোধী অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে তাদের হত্যা করা হয়।

শুনানিতে প্রসিকিউশন আরো দাবি করে, নিহতদের পরিবারের সদস্যরা লাশ গ্রহণে ভয়ভীতির মুখে পড়েছিলেন এবং নিহতদের মধ্যে চারজনের পরিচয় এখনো শনাক্ত হয়নি। পরিচয় নিশ্চিত হওয়া তিনজন হলেন মো: ইবরাহীম, ফরিদুল ইসলাম আকাশ ও সাইফুর রহমান। ইবরাহীমের বাবার অভিযোগের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলার কার্যক্রম শুরু হয়।

প্রসিকিউশনের বক্তব্য শেষে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা ডিসচার্জ আবেদন শুনানির জন্য সময় চান। আইনজীবী সিফাত মাহমুদ শুভ আদালতকে জানান, প্রয়োজনীয় নথিপত্র বিলম্বে পাওয়ায় প্রস্তুতির জন্য সময় প্রয়োজন। এতে প্রসিকিউশন আপত্তি না জানালে ট্রাইব্যুনাল ১০ আগস্ট আসামিপক্ষের শুনানির দিন নির্ধারণ করেন।

মামলার অন্য আসামিরা হলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক, সাবেক এসবি প্রধান ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী, সাবেক ডিএমপি কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া, সাবেক সিটিটিসি প্রধান মনিরুল ইসলাম, বগুড়ার সাবেক পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান, গাজীপুরের সাবেক পুলিশ সুপার ও ডিবিপ্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ, বগুড়ার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরিফুর রহমান মণ্ডল এবং তৎকালীন সিটিটিসির সোয়াট টিমের কর্মকর্তা এসএম জাহাঙ্গীর হাছান।

বর্তমানে সাবেক আইজিপি একেএম শহীদুল হক ও সাবেক ডিএমপি কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া গ্রেফতার অবস্থায় কারাগারে রয়েছেন। রোববার তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।

চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি এ মামলায় ১০ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। পরে ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ আমলে নিয়ে পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন।

জাহাজবাড়ি হত্যা মামলাও ১০ আগস্ট

এ দিকে রাজধানীর কল্যাণপুরের জাহাজবাড়ি নামে পরিচিত ভবনে ২০১৬ সালের অভিযানে ৯ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আট আসামির ডিসচার্জ (অব্যাহতি) আবেদনের শুনানিও পিছিয়ে আগামী ১০ আগস্ট ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।

এর আগে ২১ জুলাই প্রসিকিউশন অভিযোগ গঠনের বিষয়ে শুনানি শেষ করে। শুনানিতে প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম মামলার ঘটনার বিবরণ তুলে ধরে অভিযোগ করেন, অভিযানে নিহতদের পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছিল এবং ঘটনাটি মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল। প্রসিকিউশন আদালতের কাছে আট আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের আবেদন জানায়।

পরে আসামিপক্ষের সময় আবেদনের পর রোববার শুনানির দিন নির্ধারণ করা হলেও পুনরায় সময়ের আবেদন মঞ্জুর করে ট্রাইব্যুনাল আগামী ১০ আগস্ট নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন।

এই মামলায় বর্তমানে গ্রেফতার অবস্থায় রয়েছেন সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক ও সাবেক ডিএমপি কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া। পলাতক অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, ডিএমপির সাবেক অতিরিক্ত কমিশনার শেখ মুহম্মদ মারুফ হাসান, সাবেক সিটিটিসি প্রধান মনিরুল ইসলাম, তৎকালীন যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) কৃষ্ণ পদ রায় এবং তৎকালীন যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) আব্দুল বাতেন।

প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ২৫ জুলাই রাতে কল্যাণপুরের জাহাজবাড়িতে পরিচালিত ‘অপারেশন স্টর্ম-২৬’-এ ৯ জন নিহত হন। মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, ঘটনাটি পরিকল্পিত মানবতাবিরোধী অপরাধ।