মো: সাজ্জাতুল ইসলাম ময়মনসিংহ
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের রক্তাক্ত দিনগুলো বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। রাজপথে গুলির শব্দ অনেক আগেই থেমে গেছে; কিন্তু সেই শব্দের প্রতিধ্বনি আজও শোনা যায় ময়মনসিংহের অসংখ্য পরিবারের বুকভাঙা কান্নায়। কোথাও সন্তানহারা মা-বাবার দীর্ঘশ্বাস, কোথাও স্বামী হারানো স্ত্রীর নিঃসঙ্গতা, কোথাও বা গুলিবিদ্ধ আহতদের আজীবনের যন্ত্রণা- সব মিলিয়ে জুলাই যেন এখনো শেষ হয়নি।
দুই বছর পেরিয়ে গেলেও শহীদ পরিবারের অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। হত্যাকাণ্ডের বিচার কোথায়? আহতদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কতটা নিশ্চিত হয়েছে? রাষ্ট্রের দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলো কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে? শহীদদের পরিবার এখনো ন্যায় বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন।
আন্দোলনের সূচনা
২০২৪ সালের ৫ জুলাই রাতে ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থী গোপনে বৈঠকে বসেন। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়, ৬ জুলাই টাউন হল মোড়ে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচির মাধ্যমে আন্দোলনের সূচনা করা হবে। একই সময়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও আন্দোলনে যুক্ত হন। রেলপথ অবরোধ, বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের মধ্য দিয়ে অল্প সময়েই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে জেলার বিভিন্ন এলাকায়।
প্রথমদিকে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা সীমিত থাকলেও ১৬ জুলাইয়ের পর আন্দোলন গণজোয়ারে রূপ নেয়। প্রশাসনিক বাধা ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের চাপ উপেক্ষা করে ১৬, ১৭ ও ১৮ জুলাই প্রতিদিন প্রায় ২০ থেকে ৩০ হাজার শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে ময়মনসিংহের রাজপথ মুখর হয়ে ওঠে।
১৯ জুলাই : ময়মনসিংহের সবচেয়ে রক্তাক্ত দিন
১৯ জুলাই ছিল ময়মনসিংহের সবচেয়ে ভয়াবহ দিন। কারফিউ উপেক্ষা করে হাজারো ছাত্র-জনতা রাজপথে নামেন। দিনভর বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ ও সহিংসতায় অন্তত চারজন নিহত হন। পরদিন আরো একজনের মৃত্যু হয়।
রিদোয়ান হোসেন সাগর (১৯) ময়মনসিংহ নগরীর আকুয়া চৌরাঙ্গী মোড় এলাকার মো: আসাদ মিয়ার ছেলে (১৯ জুলাই মিন্টু কলেজ রোড এলাকায় নিহত)। ২০ জুলাই কলতাপাড়ায় শহীদ হন জোবায়ের হোসেন (১৮) গৌরীপুরের কাওরাট গ্রামের মো: আনার উদ্দিনের ছেলে, ১৯ জুলাই নিহত বিপ্লব (১৮) গৌরীপুরের চূড়ালী গ্রামের মো: বাবুল মিয়ার ছেলে, রাকিব (১৯) রাম গোলপুর ইউনিয়নের দামগাঁও গ্রামের আব্দুল হেকিম মুন্সির ছেলে ও সাইফুল ইসলাম (৩৮) ফুলপুর উপজেলার চর ডাকিরকান্দা গ্রামের তৈয়ব আলীর ছেলে।
এ ছাড়া অর্ধশতাধিক আন্দোলনকারী আহত হন। অনেকের শরীরে এখনো গুলির স্পিøন্টার রয়ে গেছে। কেউ হারিয়েছেন দৃষ্টিশক্তি, কেউ স্থায়ীভাবে কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন।
শহীদ পরিবারের অন্তহীন অপেক্ষা
ময়মনসিংহ নগরীর সি কে ঘোষ রোড দিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ চলাচল করেন। কিন্তু সেই পথেই আজও থমকে দাঁড়িয়ে যান শহীদ রিদওয়ান হোসেন সাগরের বাবা মো: আসাদুজ্জামান। ছেলের শেষ কথাগুলো আজও তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।
তিনি বলেন, ‘আমি বাসায় ঢুকছিলাম, তখন সাগর বের হচ্ছিল। আমি একটি কাজের কথা বলেছিলাম। সে বলেছিল, ‘আগামীকাল করে দেব।’ সেটিই ছিল আমার সাথে ওর শেষ কথা।’
গৌরীপুরের শহীদ বিপ্লব হাসানের গল্পও একই রকম হৃদয়বিদারক। ১৯ জুলাই সকালে মায়ের কাছ থেকে নাশতা খাওয়ার জন্য ৫০ টাকা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু আর ফিরে আসেননি।
বিপ্লবের বাবা-মা বলেন, ‘আমাদের ছেলে যে বাংলাদেশ চেয়েছিল, সেই বাংলাদেশ এখনো আমরা পাইনি। আমরা শুধু হত্যার বিচার চাই।’
অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর জন্য ওষুধ আনতে গিয়ে শহীদ রাকিব
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী ঘটনাগুলোর একটি নূরে আলম সিদ্দিকী রাকিবের মৃত্যু।
গৌরীপুর উপজেলার রামগোপালপুর ইউনিয়নের দামগাঁও মধ্যপাড়া গ্রামের এই তরুণ হাফেজ ও মাদরাসাশিক্ষক ২০ জুলাই সকালে অন্তঃসত্ত্বা ও অসুস্থ স্ত্রীর জন্য ওষুধ কিনতে কলতাপাড়া বাজারে গিয়েছিলেন। কিন্তু ওষুধ নিয়ে আর বাড়ি ফেরা হয়নি তার।
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাকিব কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে যাননি। বাজারে সংঘর্ষ শুরু হলে তিনি মোবাইল ফোনে ঘটনাটি ধারণ করছিলেন। এ সময় ছোড়া একটি গুলি তার বুকে বিদ্ধ হয়। ঘটনাস্থলেই নিভে যায় একটি তরুণ জীবনের স্বপ্ন।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, তিনি তার অনাগত সন্তানের মুখ দেখে যেতে পারেননি। তার মৃত্যুর পর জন্ম নেয়া সন্তান আজও বাবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত। নববধূ স্ত্রী সাদিয়া আক্তারের হাতের মেহেদির রঙ মুছে যাওয়ার আগেই তাকে শহীদের স্ত্রী হিসেবে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে।
আজও রাকিবের পরিবার হত্যার বিচার এবং রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুত ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় দিন গুনছে।
মেয়ের জন্য আম কিনতে গিয়ে শহীদ হন সাইফুল
সংসারের অভাবের মধ্যেও মেয়ের আবদার পূরণ করতে আম কিনতে বাজারে গিয়েছিলেন ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার কৃষক সাইফুল ইসলাম। ধান বিক্রির পর ফলের দোকানের দিকে যাওয়ার সময় গুলিবিদ্ধ হন তিনি। হাসপাতালে নেয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর পর স্ত্রী রহিমা ও তিন শিশু সন্তান চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। ছোট মেয়ে আজও বাবার ফেরার অপেক্ষায় থাকে, আর পরিবারের একটাই দাবি- ন্যায়বিচার।
আহতদের নীরব যুদ্ধ
যারা প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন, তাদের সংগ্রামও থেমে নেই। জুলাই যোদ্ধা রোকনুজ্জামান রোকন বলেন, ‘কারফিউর পর আত্মগোপনে ছিলাম। ২১ জুলাই রাতে ডিবি পুলিশ আমাকে গ্রেফতার করতে এসে গুলি করে। এখনো পিঠে সেই ক্ষতের যন্ত্রণা বহন করছি।’
আহত আন্দোলনকারী মনিরুজ্জামান মানিক বলেন, ‘যে চেতনা নিয়ে আমরা আন্দোলন করেছিলাম, সেই চেতনা আমরা শতভাগ ধরে রাখতে পেরেছি কি না- এ প্রশ্ন আজও রয়ে গেছে।’
অনেক আহত ব্যক্তি এখনো নিয়মিত চিকিৎসা নিচ্ছেন। কেউ চাকরি হারিয়েছেন, কেউ আগের মতো কাজ করতে পারেন না। অনেক পরিবার চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে গিয়ে আর্থিক সঙ্কটে পড়েছে।
সরকারি সহায়তা : কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে?
সরকার শহীদ পরিবার ও আহতদের জন্য আর্থিক সহায়তা, মাসিক সম্মানী ভাতা এবং পুনর্বাসনের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ময়মনসিংহ বিভাগের আহত জুলাই যোদ্ধাদের জন্যও সম্মানী ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
তবে মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে। সব শহীদ ও আহত কি সরকারি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন? নাকি এখনো কেউ তালিকার বাইরে রয়ে গেছেন? অনেক পরিবার জানিয়েছে, প্রাপ্ত সহায়তা তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটালেও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও জীবিকার জন্য তা পর্যাপ্ত নয়।
অসমাপ্ত ন্যায়বিচারের অপেক্ষা
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাস কেবল রাজপথের আন্দোলনের ইতিহাস নয়; এটি অসংখ্য পরিবারের অশ্রু, আত্মত্যাগ এবং অসমাপ্ত স্বপ্নের ইতিহাস। শহীদদের রক্তের ঋণ শুধু আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা বা স্মরণসভা দিয়ে শোধ হবে না। হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, আহতদের পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা এবং শহীদ পরিবারের মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করাই হতে পারে তাদের আত্মত্যাগের প্রকৃত মূল্যায়ন।
ময়মনসিংহের শহীদ ও আহতদের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়- একটি গণ-অভ্যুত্থান শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের নাম নয়; এটি মানুষের অধিকার, আত্মত্যাগ, ন্যায়বিচার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি মানবিক, জবাবদিহিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকার।



