৫৬ স্পিøন্টার বুলেটে ক্ষতবিক্ষত রায়হান

Printed Edition
৫৬ স্পিøন্টার বুলেটে ক্ষতবিক্ষত রায়হান
৫৬ স্পিøন্টার বুলেটে ক্ষতবিক্ষত রায়হান

বরিশাল ব্যুরো

চব্বিশের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে বরিশালে পুলিশের ছোড়া স্পিøন্টার বুলেটে গুরুতর আহত হন রাইয়ান আহমেদ রায়হান। শরীরে ৫৬টি বুলেটের আঘাত নিয়ে তিনি এখনো সেই দিনের বিভীষিকা বয়ে বেড়াচ্ছেন।

নগরীর সরকারি সৈয়দ হাতেম আলী কলেজসংলগ্ন চৌমাথায় বিক্ষেভের সময় পুলিশের ছোড়া স্পিøন্টার বুলেটে ঝাঁঝরা হয় রাইয়ানের শরীর। তার জুলাইযোদ্ধা স্বাস্থ্য কার্ডের কেস আইডি ৩৪২৫০। আজো মাথা, বুক ও শরীরে কয়েকটি বুলেট বহন করছেন তিনি। মুখমণ্ডল ও বাম চোখের জটিলতা এখনো কাটেনি।

রায়হান জানান, ৪ আগস্ট সকালে সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ থেকে মিছিল নিয়ে তিনি নথুল্লাবাদ কেন্দ্রীয় বাসস্ট্যান্ডে যান। সেখানে হাজারো শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ আন্দোলনে অংশ নেন। দুপুর পর্যন্ত অবস্থান কর্মসূচি চলার পর দেড়টার দিকে সাবেক পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক শামীমের বাসার দিক থেকে পুলিশ গুলি ছুড়তে শুরু করে।

ঘটনার বর্ণনায় তিনি বলেন, কয়েক ঘণ্টা ধরে পুলিশ এবং ছাত্রলীগ-যুবলীগের কর্মীদের সাথে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া চলে। টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করা হয়। টিয়ার গ্যাসের ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হলেও তিনি আন্দোলনস্থল ছাড়েননি।

রায়হানের ভাষ্য, একপর্যায়ে অধিকাংশ আন্দোলনকারী সরে গেলেও প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ জন সেখানে অবস্থান করেন। পরে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ-সমর্থিত কর্মীদের ধাওয়ায় তারা সরকারি সৈয়দ হাতেম আলী কলেজ গেট থেকে চৌমাথার দিকে চলে যান। সংঘর্ষের মধ্যেই হঠাৎ একাধিক স্পিøন্টার বুলেট তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করে।

রায়হানের শরীরে লাগা ৫৬টি স্পিøন্টার বুলেটের মধ্যে ৩৩টি মুখমণ্ডলে বিদ্ধ হয়। একটি বুলেট বাম চোখে লাগে। মুখ থেকে রক্ত মুছে ফেলতে পারলেও বুক ও পেটের রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে পারেননি। পরে পাশের কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের জামে মসজিদে আশ্রয় নেন। মুসল্লিরা তাকে আহত অবস্থায় দেখে রক্তপাত বন্ধের চেষ্টা করেন এবং পরে রিকশায় করে সেনাবাহিনীর সদস্যদের কাছে নিয়ে যান।

পরে তাকে বরিশাল শেরেবাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকেরা তার মুখ থেকে কয়েকটি বুলেট অপসারণের চেষ্টা করেন। তবে হাসপাতালে হামলার আশঙ্কায় সেদিন রাতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছিল বলেও জানান তিনি।

পরদিন তাকে চক্ষু বিভাগ থেকে নাক-কান-গলা বিভাগে স্থানান্তর করা হয়। দুই দিন ধরে নাক দিয়ে রক্তক্ষরণ চলে। ৫ আগস্ট হাসপাতালে থাকাকালেই তিনি শেখ হাসিনার পলায়নের খবর পান। শারীরিক অবস্থার কারণে বিজয়ের আনন্দে অংশ নিতে না পারলেও ঘটনাটি তাকে মানসিকভাবে স্বস্তি দেয়।

৮ আগস্ট হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার পর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তি করা হয়। এখন কিছুটা সুস্থ হলেও মুখের স্নায়ু ও চোখের জটিলতা পুরোপুরি কাটেনি। রায়হান বলেন, আন্দোলনে যাওয়ার আগে তিনি পরিবারকে জানাতেন না। তবে ৪ আগস্ট বাবা-মায়ের দোয়া নিয়ে বের হন। তার ভাষায়, সেদিন মনে হয়েছিল, হয়তো ফিরে আসব, নইলে আর ফিরব না।

তিনি জানান, এখনো শরীরে কয়েকটি স্পিøন্টার বুলেট রয়ে গেছে। দীর্ঘ চিকিৎসা ও শারীরিক কষ্টের মধ্যেও তিনি মনে করেন, দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের আন্দোলনে নিজেরও একটি অবদান রয়েছে। সেই অনুভূতিই তাকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি জোগায়।