গণভোটে হ্যাঁ মানে আজাদি না মানে গোলামি : ডা: শফিক

Printed Edition
সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চবিদ্যালয় মাঠে জেলা জামায়াতের নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য রাখেন ডা: শফিকুর রহমান : নয়া দিগন্ত
সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চবিদ্যালয় মাঠে জেলা জামায়াতের নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য রাখেন ডা: শফিকুর রহমান : নয়া দিগন্ত

যশোর অফিস

জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, তারা দলীয় রাজনীতির বিজয় নয় বরং ১৮ কোটি মানুষের বিজয় চান। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে দেশে ফ্যাসিবাদী কায়দায় শাসন চলবে না, চাঁদাবাজি হবে না। ‘হ্যাঁ’ মানে আজাদি, ‘না’ মানে গোলামি। গতকাল মঙ্গলবার সকালে যশোর ঈদগাহ ময়দানে আয়োজিত বিশাল নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াত আমির এ কথা বলেন। প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ‘চব্বিশের বিপ্লব ছিল বুলেটের বিরুদ্ধে, আর আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির বিপ্লব হবে ব্যালটের মাধ্যমে।’

যুবসমাজের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘যুবসমাজ বস্তাপচা রাজনীতি আর দেখতে চায় না। যে রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে দেশকে অন্ধকার গলিতে ঠেলে দিয়েছে, সেই রাজনীতি তারা করতে চান না।’

১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ভোটে প্রথম ভোটটি ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে দেয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ১৮ কোটি মানুষ পরিবর্তন দেখতে চায় এবং গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হবে।

যশোর-৪ আসনে দলের মনোনীত প্রার্থী অধ্যাপক গোলাম রসুলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জনসভায় আরো বক্তৃতা করেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার, যশোর-১ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী আজিজুর রহমান, যশোর-২ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী ডা: মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ, যশোর-৩ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী আব্দুল কাদের, যশোর-৫ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী গাজী এনামুল হক, যশোর-৬ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী মোক্তার আলী, এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা খালিদ সাইফুল্লাহ জুয়েলসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।

ডা: শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে সিটি করপোরেশনসহ যশোরবাসীর সব ন্যায্য দাবি পূরণ করা হবে। উন্নয়নের ক্ষেত্রে কোনো বৈষম্য করা হবে না। কোনো জেলায় অনেক উন্নয়ন, আবার কোথাও হচ্ছে না এমনটি হবে না।

জামায়াত আমির বলেন, একটি দল বলছে, তারা ক্ষমতায় গেলে নাকি মহিলাদের হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেবে। আবার তারাই মহিলাদের গায়ে হাত তুলছে। তার মানে ‘একদিকে ফ্যামিলি কার্ড, আরেকদিকে গায়ে হাত।’ তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ‘কেউ যদি কোনো মা-বোনের সম্মানহানি করে, বেইজ্জতি করে তাহলে দাঁতভাঙা জবাব দেয়া হবে।’

তিনি বিএনপিকে উদ্দেশ করে বলেন, আপনারা আপনাদের আদর্শ প্রচার করুন, আমরা আমাদের আদর্শ প্রচার করি। আমরা যদি নির্বাচনী কোনো আচরণবিধি লঙ্ঘন করি তাহলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করুন। তারা যাচাই-বাছাই করে যদি আমাদের অপরাধ পায় তাহলে শাস্তি দিলে আমরা তা মাথা পেতে নেবো। কিন্তু আপনারা কেন হুমকি-ধামকি দেবেন, আমাদের মহিলা কর্র্মীদের গায়ে হাত তুলবেন। এটি কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না।

প্রশাসনের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা নির্দিষ্ট কোনো দলের হয়ে কাজ না করে জনগণের পক্ষে কাজ করুন। উপস্থিত লাখো মানুষের উদ্দেশে বলেন, সিন্ডিকেট-চাঁদাবাজির হাত থেকে রক্ষা পেতে জামায়াতকে ভোট দিন। বিগত ১৭ বছর জামায়াতের ওপর যে নির্যাতন হয়েছে তা বর্ণনাতীত। তারপরও তাদের পাত্তাই দেয়নি। সুযোগ পেলেই মানুষের কাছে ছুটে গিয়েছি। যতটুকু পেরেছি মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি। ফ্যাসিস্টকে কোনোদিন তোয়াজ করিনি। ৫ আগস্টের পর আমরা একজনকেও মিথ্যা মামলায় অন্তর্ভুক্ত করিনি। অথচ একটি দল থেকে সারা দেশে হাজার হাজার মামলা দিয়ে বাণিজ্য করেছে। যা নিন্দনীয়।

জামায়াত আমির বলেন, যে দল তার নেতাকর্মীদের সামলাতে পারে না তারা দেশ সামলাবেন কিভাবে। জামায়াতের নেতাকর্মীরা সুশৃঙ্খল। এ কারণে তারা শৃঙ্খলভাবে দেশ চালাতে পারবে। কেউ যদি দেশকে নতুন করে ফ্যাসিবাদের দিকে নিতে চায় তাহলে আল্লাহর ওপর ভরসা করে রুখে দেয়া হবে। একটি দল বলে- তারাই নাকি গণতন্ত্রের উদ্ধারকারী। অথচ তারাই এখন গণতন্ত্রের চর্চা করতে দিচ্ছে না।

ডা: শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে বেকারভাতা দিতে চায় না, বেকারদের দক্ষ করে কাজ দিতে চায়; যাতে তারা দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে। মা-বোনদের ঘর থেকে কর্মস্থল সব জায়গায় সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। সব ধর্মের মানুষ পছন্দমতো তাদের পোশাক পরতে পারবে। কেউ ভোটের অধিকার কেড়ে নিতে চাইলে তা প্রতিরোধ করা হবে।

সাতক্ষীরায় জনসভা

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, বাংলাদেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অপরাধ ও অন্যায় করা হয়েছে সাতক্ষীরাবাসীর ওপর। সাতক্ষীরাবাসীর সাথে সাড়ে ১৪ বছর সৎ মায়ের মতো আচরণ করা হয়েছে। বুলডোজার দিয়ে আমাদের নেতাকর্মীদের বাড়িঘর ভেঙে গুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। সাতক্ষীরার মানুষের অপরাধ ন্যায়-ইনসাফের পক্ষে অবস্থান নেয়া।

তিনি বলেন, সাতক্ষীরার মানুষ ন্যায় ও ইনসাফের পক্ষে থাকায় বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় এখানে কোনো উন্নয়ন হয়নি। সাতক্ষীরা ছিল সবচেয়ে অবহেলিত জেলা। সাতক্ষীরাকে দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। তারা ভেবেছিল এ অবস্থা চিরকাল থাকবে। কিন্তু আল্লাহ যাকে ইচ্ছা সম্মান দেন, আর যাকে ইচ্ছা সম্মান কেড়ে নেন। জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় এলে সাতক্ষীরার উন্নয়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হবে।

গতকাল দুপুরে সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জেলা জামায়াত আয়োজিত এক জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ন্যায়-ইনসাফ, জনগণের সরকার ও মদিনার শাসন আমলের সুশাসন কায়েম করার জন্য আপনারা যদি আমাদের উপহার দেন তাহলে আপনাদের প্রতি আমরা গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবো।

ডা: শফিকুর রহমান আরো বলেন, যুবকদের হাতে আমরা বেকার ভাতা উঠিয়ে দেবো না। আমরা মনে করি তাদের হাতে বেকার ভাতা উঠিয়ে দেয়া মানে তাদের অপমান করা। যুবকরা সম্মানের সাথে লড়াই করে দেশ গড়তে চায়। সে যুবকদের হাত আমরা দক্ষ নাগরিক, দেশ গড়ার কারিগরের হাতে পরিণত করবো উপযুক্ত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেয়ার মাধ্যমে এবং এর দায়িত্ব পালন করবে রাষ্ট্র।

ডা: শফিকুর রহমান বলেন, আমরা জামায়াতের বিজয় চাই না ১৮ কোটি মানুষের বিজয় চাই। জামায়াতে ইসলামী দেশের সবচেয়ে নির্যাতিত রাজনৈতিক দল। আমাদের অসংখ্য নেতাকর্মীকে হত্যা ও গুম করা হয়েছে, অনেককে অন্যায়ভাবে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়েছে। দলের নিবন্ধন ও প্রতীক বাতিল করা হয়েছে এবং এক পর্যায়ে দল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বহু মানুষকে আটক রেখে নির্যাতন করা হয়েছে। মা-বোনদেরকে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন ও অত্যাচার করা হয়েছে।

সাম্প্র্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট উল্লেখ করে ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ৫ তারিখে আল্লাহ যখন আমাদের এ অবস্থা থেকে মুক্তি দিয়েছেন, তখন আমরা সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছি। জননিরাপত্তা রক্ষায় নিজ নিজ এলাকায় দায়িত্ব পালনের কথা বলেছি। কোথাও অমাদের নেতাকর্মীরা চাঁদাবাজিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে নাই। মামলা করে নাই। আমরা প্রতিশোধের রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না।

সাতক্ষীরার চারটি সংসদীয় আসনে ন্যায়-ইনসাফ প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের সরকার গঠনের লক্ষ্যে সমর্থন চান জামায়াত আমির। তিনি বলেন, মদিনা সনদের আদলে সুশাসন প্রতিষ্ঠাই তাদের লক্ষ্য।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুইটা দুষ্টু চক্রের কারণে আজ দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি। একটা চাঁদাবাজ, আরেকটা সিন্ডিকেট। আমরা আপনানাদের কথা দিচ্ছি আল্লাহ আমাদের সুযোগ দিলে প্রথমে চাঁদাবাজদের হাত শক্ত করে ধরে ফেলব। তারপর সিন্ডিকেট ভেঙে চুরমার করে দেবো। সমাবেশে সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের আমির শহিদুল ইসলাম মুকুলের সভাপতিত্বে জনসভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সাতক্ষীরা-১ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী অধ্যক্ষ মুহাম্মদ ইজ্জত উল্লাহ, সাতক্ষীরা-২ আসনের প্রার্থী মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক, সাতক্ষীরা-৩ আসনের প্রার্থী রবিউল বাশার এবং সাতক্ষীরা-৪ আসনের প্রার্থী গাজী নজরুল ইসলামসহ জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় নেতারা। এ ছাড়া ১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের নেতারা বক্তব্য দেন।