ময়মনসিংহ অফিস
জ্যৈষ্ঠের তীব্র তাপদাহে কার্যত দগ্ধ হচ্ছে বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চল। গত কয়েক দিন ধরে ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর ও নেত্রকোনার বিস্তীর্ণ এলাকায় মাঝারি থেকে তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঘরে ওঠানামা করছে। ফলে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে, পাশাপাশি পরিবেশগত ভারসাম্য নিয়েও দেখা দিয়েছে গভীর উদ্বেগ।
জনজীবনে চরম ভোগান্তি : প্রচণ্ড রোদ ও গরম বাতাসে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন নিম্নআয়ের খেটে খাওয়া মানুষ। রিকশাচালক, ভ্যানচালক, দিনমজুর ও কৃষিশ্রমিকরা জীবিকার তাগিদে রোদেই কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেকেই মাথা ঘোরা, অতিরিক্ত ক্লান্তি ও পানিশূন্যতায় অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।
শহরের রাস্তাঘাট দুপুরের পর প্রায় ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও উপস্থিতি কমে গেছে। অনেক অভিভাবক সন্তানদের ঘরের বাইরে যেতে নিরুৎসাহিত করছেন।
বিদ্যুৎ সঙ্কট বাড়াচ্ছে দুর্ভোগ : তাপমাত্রা বাড়ার সাথে সাথে বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়েছে। ফলে লোডশেডিং বেড়ে গিয়ে জনদুর্ভোগ আরো তীব্র হয়েছে। শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা যাচ্ছে। এতে রাতের ঘুমও ব্যাহত হচ্ছে সাধারণ মানুষের।
স্বাস্থ্যঝুঁকি উদ্বেগজনক : চিকিৎসকদের মতে, এ সময় হিটস্ট্রোক, ডিহাইড্রেশন (পানিশূন্যতা), ডায়রিয়া, সানবার্ন ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগের প্রকোপ বেড়ে যায়। ইতোমধ্যে হাসপাতালগুলোতে গরমজনিত অসুস্থ রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। চিকিৎসকরা পর্যাপ্ত পানি পান, ওরস্যালাইন গ্রহণ, ছায়াযুক্ত স্থানে থাকা এবং অপ্রয়োজনে বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন।
তাপপ্রবাহের কারণে কৃষি খাতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। মাঠের ধান, সবজি ও বীজতলায় অতিরিক্ত সেচ দিতে হচ্ছে। অনেক জায়গায় মাটির আর্দ্রতা দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে।
পুকুর, খাল-বিল ও জলাশয়ের পানি কমে যাওয়ায় মাছ চাষিরা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। পানির তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় মাছের রোগবালাইও বাড়ছে। অন্য দিকে গবাদিপশু গরমে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে, ফলে দুধ উৎপাদন কমে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন খামারিরা।
পরিবেশে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব : পরিবেশবিদরা বলছেন, ময়মনসিংহ অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির পেছনে স্থানীয় কারণও রয়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়ন, বৃক্ষনিধন, জলাশয় ভরাট ও কংক্রিটের অবাধ বিস্তার তাপমাত্রা বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখছে।
একসময় সবুজে ঘেরা ও নদী-খালবিল সমৃদ্ধ এই অঞ্চলে প্রাকৃতিক শীতলতা ছিল বেশি। কিন্তু এখন সেই পরিবেশ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদসহ বিভিন্ন জলাধারের পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় তাপমাত্রার ভারসাম্যও বিঘিœত হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেও তাপপ্রবাহের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব বাড়ছে। অতীতে যেখানে কয়েক দিন তাপপ্রবাহ থাকত, এখন তা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে এবং ঘন ঘন ফিরে আসছে।
বাংলাদেশের মতো নদীবহুল ও নিম্নভূমির দেশে এ ধরনের পরিবর্তন জনস্বাস্থ্য, কৃষি ও জীববৈচিত্র্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেয়া জরুরি। যেমন- ব্যাপক বৃক্ষরোপণ ও সবুজায়ন বৃদ্ধি, জলাশয় সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার এবং নগর পরিকল্পনায় পরিবেশবান্ধব নীতি অনুসরণ করা। এ ছাড়া স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাপপ্রবাহ মোকাবেলায় সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
সবমিলিয়ে, তীব্র তাপপ্রবাহ শুধু সাময়িক অস্বস্তির বিষয় নয়- এটি জনস্বাস্থ্য, কৃষি ও পরিবেশের জন্য এক বহুমাত্রিক হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে ময়মনসিংহ অঞ্চলে এ সঙ্কট আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।



