নয়া দিগন্ত ডেস্ক
যুদ্ধ থামাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক আগামীকাল রোববারের মধ্যে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় স্বাক্ষরিত হতে পারে। গতকাল শুক্রবার একজন পশ্চিমা কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছেন। ওই কর্মকর্তা জানান, স্মারকের ভাষা চূড়ান্তের কাজ এখনো চলছে। লেবাননে চলমান যুদ্ধকেও এই চুক্তিতে রাখার দাবিতে অনড় রয়েছে তেহরান।
এ দিকে আজ শনিবারের মধ্যে চুক্তির ভাষা চূড়ান্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। নিজ নিজ দেশের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ চুক্তিতে সই করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বৃহস্পতিবার দাবি করেছেন সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর এক কূটনীতিক এবং এক মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে জানা গেছে, প্রস্তাবিত এই চুক্তির আওতায় হরমুজ প্রণালী অবিলম্বে কোনো টোল ছাড়াই খুলে দেয়া হবে এবং চুক্তির শর্ত বাস্তবায়নের ভিত্তিতে ইরান ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা থেকে অব্যাহতি পাবে।
অন্য দিকে একজন শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তা শুক্রবার রয়টার্সকে জানান, চুক্তির খসড়ায় ইরানের তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, কোটি কোটি ডলারের আটকে রাখা সম্পদ ছাড় এবং লেবাননসহ সব ফ্রন্টে হামলা বন্ধের বিষয় থাকবে। প্রাথমিক চুক্তিতে পারমাণবিক ইস্যু থাকবে না। তা পরবর্তী আলোচনার জন্য তোলা থাকবে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের এক খবরে বলা হয়েছে, এই সমঝোতা স্মারকের আওতায় যুদ্ধবিরতি আরো ৬০ দিনের জন্য বাড়ানো হবে। এর মধ্যে লেবাননও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। একই সময়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হবে। চুক্তির খসড়ায় ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ নিয়ে একটি কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কোনো বাস্তব পদক্ষেপ কার্যকর হবে আরো বিস্তারিত দ্বিতীয় একটি চুক্তি সম্পাদনের পর।
খসড়া নথি সম্পর্কে অবগত মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর এক কূটনীতিক বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান চুক্তির পাঠ্য নিয়ে একমত হয়েছে। তবে এখনো উভয় পক্ষের চূড়ান্ত অনুমোদন বাকি রয়েছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ইরানের উচ্চপর্যায়ে চুক্তিটি অনুমোদন পেয়েছে বলে জানা গেছে। তবে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এখনো এতে চূড়ান্ত সম্মতি দিয়েছেন কি না, সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। ট্রাম্প বলেছেন, তিনি আশা করছেন সপ্তাহান্তেই একটি আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, তেহরান এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি।
গত দুই মাসে একাধিকবার হোয়াইট হাউজ মনে করেছিল যে একটি চুক্তি হতে যাচ্ছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আলোচনা ভেঙে পড়েছিল। তবু এবার মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর প্রতিনিধিরা আশাবাদী যে চুক্তিটি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়নের পথে এগোবে।
এ দিকে বৃহস্পতিবার চারটি মার্কিন বিমানবাহিনীর সি-১৭ পরিবহন বিমান ইউরোপের উদ্দেশে যাত্রা করেছে। সম্ভাব্য স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের অংশগ্রহণের প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই এই সরঞ্জাম পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
দুই মধ্যস্থতাকারী দেশের দুই কূটনীতিক এবং দুই মার্কিন কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, বুধবার রাতে দীর্ঘ আলোচনার পর প্রাথমিক সমঝোতা অর্জিত হয়। আলোচনায় কাতারের মধ্যস্থতাকারী আলী আল-ছাওয়াদি এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তেহরানে অনুষ্ঠিত ওই আলোচনার সময় আল-ছাওয়াদি একাধিকবার ফোনে ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনারের সাথে যোগাযোগ করেন বলেও জানা গেছে।
চুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে বলে ট্রাম্পের ঘোষণাটি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য অপ্রত্যাশিত ছিল। মার্কিন এক সূত্রের দাবি, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে নেতানিয়াহু ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগ করে আলোচনার অগ্রগতি জানার চেষ্টা করছিলেন। প্রস্তাবিত সমঝোতা অনুযায়ী, ইরান প্রতিশ্রুতি দেবে যে তারা কখনো পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চেষ্টা করবে না এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিয়ে চলমান বিরোধের সমাধানে কাজ করবে। এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, এই বিরোধের সমাধানে ইরানের ভেতরেই জাতিসঙ্ঘের পরিদর্শকদের তত্ত্বাবধানে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে কম সমৃদ্ধ পর্যায়ে নামিয়ে আনার বিকল্প বিবেচনায় নেয়া হয়েছে এবং ট্রাম্প এ বিষয়ে সম্মতি দিয়েছেন।
তবে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কোনো পদক্ষেপ বাস্তবায়ন হবে কেবল তখনই, যখন আরো বিস্তৃত ও বিস্তারিত দ্বিতীয় একটি চুক্তি সম্পাদিত হবে। বিশ্লেষকদের মতে, সেটি অর্জন করা সহজ হবে না। মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর এক কূটনীতিক দাবি করেছেন, বর্তমান এমওইউতে পারমাণবিক ইস্যুর সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং এটি যুক্তরাষ্ট্রের সব প্রধান শর্ত পূরণ করে।
চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু করা।
খসড়া অনুযায়ী, চুক্তি কার্যকর হওয়ার সাথে সাথেই প্রণালীটি খুলে দেয়া হবে এবং ৩০ দিনের মধ্যে যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের সমপরিমাণ জাহাজ চলাচল পুনরুদ্ধার করা হবে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রও তার অবরোধ প্রত্যাহার করবে। মার্কিন কর্মকর্তারা এর আগে জানিয়েছিলেন, হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু হওয়ার পর ইরানকে ৬০ দিনের জন্য অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হবে, যাতে দেশটি আন্তর্জাতিক বাজারে তেল বিক্রি করতে পারে। এতে তেহরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব আয়ের সুযোগ তৈরি হবে।
চুক্তির শর্ত যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে এবং পরবর্তী আলোচনায় ইরান সদিচ্ছা প্রদর্শন করলে নিষেধাজ্ঞা আরও শিথিল করা হতে পারে। তবে বিদেশে আটকে থাকা ইরানের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সম্পদ নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়ে গেছে। খসড়া নথিতে এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা রয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, প্রাথমিক চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই তাদের কিছু অর্থ মুক্ত করতে হবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হলো, চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতির ভিত্তিতে ধাপে ধাপে অর্থ ছাড়া হবে। প্রশাসনের বাইরে থাকা এক মার্কিন সূত্রের আশঙ্কা, এই অর্থের বিষয়টি হয়তো কোনো গোপন পার্শ্বচুক্তির মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হতে পারে। যদিও এক মার্কিন কর্মকর্তা সম্প্রতি এ ধরনের সম্ভাবনা নাকচ করেছেন। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও কাতার সাম্প্রতিক দিনগুলোতে এমন একটি ব্যবস্থার বিষয়ে আলোচনা করেছে, যার মাধ্যমে কাতারে আটকে থাকা ইরানের কিছু অর্থ মানবিক পণ্য কেনার জন্য ব্যবহারের সুযোগ দেয়া হবে।
কাতার ও পাকিস্তানের যৌথ মধ্যস্থতায় হওয়া এই চুক্তির নাম রাখা হয়েছে ‘ইসলামাবাদ চুক্তি’। তবে সেটি কার্যকর হবে কেবল তখনই, যখন উভয় পক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে এতে স্বাক্ষর করবে। মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর এক কূটনীতিক বলেছেন, চুক্তির শেষ মুহূর্তের বিষয়গুলো চূড়ান্ত করা এবং স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের তারিখ নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সাথে কাজ চলছে।
তবে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সামরিক ও কূটনৈতিক টানাপড়েন নতুন এক মোড় নিতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। উভয় পক্ষের অবস্থানে কিছুটা নমনীয়তার লক্ষণ দেখা গেলেও এখনো স্থায়ী সমঝোতার পথ স্পষ্ট নয়। এই পরিস্থিতিতে সঙ্ঘাত থেকে বেরিয়ে আসার জন্য একটি ‘সম্মানজনক সমাধান’ খুঁজছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কোনো টেকসই সমঝোতায় পৌঁছাতে হলে উভয় পক্ষকেই রাজনৈতিক অবস্থান থেকে কিছুটা সরে এসে মধ্যপন্থা গ্রহণ করতে হবে। না হলে এই সঙ্ঘাত দীর্ঘায়িত হয়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের স্থিতিশীলতার ওপর আরো চাপ সৃষ্টি করতে পারে। সবমিলিয়ে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক এখন এক জটিল কূটনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সম্ভাব্য সমঝোতার দরজা যেমন খোলা রয়েছে, তেমনি অনিশ্চয়তার ঝুঁকিও আগের মতোই প্রবল।



