চার কার্গো এলএনএজি ক্রয়ে ব্যয় সাশ্রয় হবে ৮৩২ কোটি টাকা

যুক্তরাষ্ট্রের ২ কোম্পানি থেকে ৪ কার্গো এলএনজি কেনা হচ্ছে

সৈয়দ সামসুজ্জামান নীপু
Printed Edition

আগস্টে কিনলে ব্যয় সাশ্রয় আরো বেশি হতো

ভাসমান এলএনজি টার্মিনেলের (এফএসআরইউ) জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দুই কোম্পানির কাছ থেকে চার কার্গো এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) কিনছে সরকার। এই চার কার্গো এলএনজি সরবরাহ করবে যুক্তরাষ্ট্রের ‘দারাব ইনকোরপেশন’ ও ‘ মাইন্ড মিঙ্গেল এলএলসি’। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে দুই কার্গো করে এলএনজি সরবরাহের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। দারাবের এলএনজি দর চূড়ান্ত করা হয়েছে এমএমবিটিইউ ১৭.০০ মার্কিন ডলার। অন্য দিকে মাইন্ড মিঙ্গেল এলএনজি দাম হবে প্রতি এমএমবিটিইউ ১৯ মার্কিন ডলার। জ্বালানি মন্ত্রণালয় থেকে দাবি করা হয়েছে এই চার কার্গো এলএনজি কেনায় তাদের মোট ব্যয় সাশ্রয় হবে ৮৩২ কোটি টাকা। দারাব সরবরাহকৃত দুই কার্গো এলএনজি ব্যয় সাশ্রয় হবে ৪৪০ কোটি টাকা এবং মিঙ্গেল থেকে কেনায় দুই কার্গো ব্যয় কমবে ৩৯২ কোটি টাকা। এলএনজি কেনার এই প্রস্তাবটি গত রোববার ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভার কমিটিতে অনুমোদন করা হয়েছে বলে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপত্বিতে ভার্চুয়ালি এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছে।

জ্বালানি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং এর প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজার অস্থির হয়ে ওঠার প্রেক্ষাপটে দেশের বিদ্যুৎ, শিল্প ও সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখা নিয়ে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। গত কিছু দিনে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ চেইনে বিঘœ ঘটায় ২০২৬ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে অন্তত ৫৮টি এলএনজি কার্গোর ক্ষেত্রে ‘ফোর্স মেজর’ (ঋড়ৎপব গধলবঁৎব) বা অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিজনিত অক্ষমতা ঘোষণা করেছে। এ অবস্থায় জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সম্ভাব্য বড় ধরনের ঘাটতি এড়াতে জরুরি রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে সরাসরি ক্রয় প্রক্রিয়ায় চার কার্গো এলএনজি আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

সঙ্কটের পটভূমি ও আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ

জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে দেশে উৎপাদিত গ্যাসের পাশাপাশি কক্সবাজারের মহেশখালীতে স্থাপিত দৈনিক ১,১০০ এমএমসিএফডি রি-গ্যাসিফিকেশন ক্ষমতাসম্পন্ন দু’টি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের (ঋঝজট) মাধ্যমে আমদানিকৃত গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ হয়। এ দু’টি টার্মিনালের ব্যবহারযোগ্য সম্মিলিত ক্ষমতা ৯৩৫ এমএমসিএফডি, যা বছরে প্রায় ১১৫ কার্গো এলএনজি আমদানির সমতুল্য। দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তি এবং স্পট মার্কেট থেকে আমদানিকৃত এলএনজি দিয়ে এই চাহিদা মেটানো হয়।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধ পরিস্থিতি বৈশ্বিক জ্বালানি খাতের ওপর চরম অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। চুক্তিবদ্ধ ৫৮টি এলএনজি কার্গো সময়মতো সরবরাহ না পাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ায় দেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তা সুরক্ষায় বিকল্প উৎস সন্ধান অপরিহার্য হয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে দর প্রতিনিয়ত দ্রুত ওঠানামা করছে। এ অবস্থায় সাধারণ প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় ব্যয় করলে জরুরি মুহূর্তে গ্যাস পাওয়ার সুযোগ হাতছাড়া হতে পারে। তাই দ্রুত এলএনজি কেনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

দারাব ইনকরপোরেশনের প্রস্তাব ও নেগোসিয়েশন

পরিস্থিতি সামাল দিতে গত ৮ আগস্ট মার্কিন প্রতিষ্ঠান দারাব সরকারের কাছে স্বল্প মেয়াদে এলএনজি সরবরাহের প্রস্তাব জমা দেয়। প্রাথমিক প্রস্তাবে তারা প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ১২.৭৫ মার্কিন ডলার নির্ধারণ করে ১২ কার্গো গ্যাস সরবরাহের কথা জানিয়েছিল। সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে এ প্রস্তাব প্রক্রিয়াকরণের জন্য গত ১২ আগস্ট অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি থেকে নীতিগত অনুমোদন নেয়া হয়।

পরে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে সাত সদস্যবিশিষ্ট একটি নেগোসিয়েশন ও মূল্যায়ন কমিটি গঠিত হয়। কমিটি সার্বিক জোগান পরিস্থিতি, বর্তমান চাহিদা ও বিশ্ববাজারের দর বিচার-বিশ্লেষণ করে আগামী অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর সময়ে তিন মাসের জন্য দুই কার্গো এলএনজি গ্রহণের সুপারিশ করে। সার্বিক নেগোসিয়েশন শেষে চূড়ান্ত দর নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি এমএমবিটিইউ ১৭.০০ মার্কিন ডলার।

৪৪০ কোটি টাকা সাশ্রয়ের আশা

পেট্রো বাংলার ভাষ্য, যদিও প্রাথমিক প্রস্তাবিত দরের চেয়ে নেগোসিয়েটেড দর বেশি মনে হতে পারে, তবে আন্তর্জাতিক বাজারের বর্তমান মূল্যের তুলনায় এটি অত্যন্ত সুবিধাজনক বলে জানিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। সরকারি তথ্যানুযায়ী, গত ১১ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক বাজারে এশীয় অঞ্চলের স্পট দর বা জেকেএম সূচক ছিল প্রতি এমএমবিটিইউ ২৮.৮১২ মার্কিন ডলার।

বর্তমান স্পট মার্কেটের চড়া মূল্যের তুলনায় ১৭ ডলারের নেগোসিয়েটেড মূল্যে দুই কার্গো এলএনজি আমদানির ফলে সরকারের প্রায় ৪৪০ কোটি টাকা সাশ্রয় হতে পারে। একই সাথে সীমিত পরিসরে দুই কার্গো এলএনজি কেনার ফলে দেশের ওপর বড় ধরনের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় তৈরি হবে না এবং স্বল্পমেয়াদি সরবরাহ ঘাটতিও সফলভাবে মোকাবেলা করা সম্ভব হবে।

কার্গো খালাসে কঠোর শর্তাবলি

কম দরে গ্যাস নিশ্চিত করা হলেও কার্গো গ্রহণের ক্ষেত্রে যাতে কোনো ধরনের কারিগরি বা আর্থিক ঝুঁকি তৈরি না হয়, সে বিষয়ে পেট্রোবাংলা ও সংশ্লিষ্ট এফএসআরইউ কর্তৃপক্ষকে কঠোর সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

এলএনজি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার আগে বেশ কিছু বিষয় শতভাগ নিশ্চিত করার পরই কেবল কার্গো গ্রহণ করা হবে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো :

১. মনোনীত জাহাজের প্রাক-সমীক্ষা সম্পন্ন করা।

২. সরবরাহিত এলএনজির উৎস এবং কারিগরি বিষয়াবলি পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই করা।

৩. ভাসমান টার্মিনালের সাথে সরবরাহকারী জাহাজের সামঞ্জস্যতা নিশ্চিতকরণ।

৪. জাহাজের বৈধ সনদ ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বজায় রাখা।

৫. কার্গোর সঠিক পরিমাণ, গুণগত মান ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা যাচাই।

৬. এসবিএলসির ক্ষেত্রে যথাযথ ব্যাংকিং নিশ্চায়ন, বীমা সুবিধা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে খালাস প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা।

২ কার্গো জরুরি এলএনজি কিনছে সরকার, সাশ্রয় ৩৯২ কোটি টাকা

এ দিকে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান তীব্র সঙ্ঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে দেখা দেয়া বড় ধরনের সরবরাহ ঘাটতি ও চরম অস্থিরতা মোকাবেলায় জরুরি ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের ‘মাইন্ড মিঙ্গেল এলএলসি’ থেকে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে দুই কার্গো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ক্রয়ও অনুমোদন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারদরের চেয়ে কম মূল্যে নেগোসিয়েশন করায় এতে সরকারের প্রায় ৩৯২ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান মাইন্ড মিঙ্গেল এলএলসি গত আগস্টে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজি ১৯.৭৭ মার্কিন ডলারে সরবরাহের প্রস্তাব দেয়। তবে পরবর্তীতে পেট্রোবাংলার গঠিত নেগোসিয়েশন ও মূল্যায়ন কমিটির দরকষাকষির মাধ্যমে দাম কমিয়ে প্রতি এমএমবিটিইউ ১৯.০০ মার্কিন ডলারে নির্ধারণ করা হয়।

স্বল্প মেয়াদে আগামী অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে এই দুই কার্গো এলএনজি দেশে এসে পৌঁছাবে। ফলে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার কারখানা ও শিল্প-কারখানার সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে।

তবে এলএনজি কার্গো আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণের আগে জাহাজের সামঞ্জস্যতা, কারিগরি সক্ষমতা, নিরাপত্তা সনদ এবং এলএনজির মান পেট্রোবাংলা ও এফএসআরইউ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

তবে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেছেন, গত আগস্ট মাসে এই কোম্পানি দু’টি থেকে এলএনজি কেনা হলে কমপক্ষে এক হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় সাশ্রয় করা সম্ভব ছিল। এখন আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে তাল মিলিয়ে কোম্পানি দু’টি এলএনজি দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। তবুও তা অন্যান্য কোম্পানি থেকে কিছুটা কম দামে কেনা হচ্ছে। কারণ সেপ্টেম্বরের যত এলএনজি কেনার সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা প্রতি এমএমবিটিইউ ২৪ থেকে ২৮ ডলারের মধ্যে ছিল।