এম আখতারুজ্জামান আজও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির অপেক্ষায়

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার শাহপুর গ্রামের এক জীবন্ত কিংবদন্তি এম. আখতারুজ্জামান। বয়স এখন ৮৪ বছর। যে মানুষটি মহান স্বাধীনতার দাবি তোলায় ১৯৬৯ সালে পাকিস্তান সামরিক আদালতের বিচারে মৃত্যুদণ্ডাদেশ পেয়েছিলেন এবং পরে সেই দণ্ড মাথায় নিয়েই ১৯৭১-এর রণাঙ্গনে শত্রুর মোকাবেলা করেছিলেন, স্বাধীনতার ৫৩ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই লড়াকু মুক্তিযোদ্ধা আজও পাননি সরকারি গেজেটভুক্তির স্বীকৃতি।

এম. আখতারুজ্জামান ১৯৬৬-৬৭ সালে আইয়ুব বিরোধী ঐতিহাসিক ভুট্টা আন্দোলনের পরিচালক হিসেবে প্রায় এক বছর পাবনা কারাগারে অন্তরীণ ছিলেন। এরপর তিনি পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ভিপি নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সালের মহানগর আন্দোলনে বাংলাদেশের স্বাধীনতা চাওয়ার অপরাধে তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতা মামলা করা হয় এবং বিশেষ সামরিক আদালত তাকে ফাঁসির নির্দেশ দেয়। এই রায়ের বিরুদ্ধে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বিশাল গণ-আন্দোলন শুরু হয় এবং মওলানা ভাসানীসহ জাতীয় নেতাদের প্রচেষ্টায় তিন মাস জেল খাটার পর তিনি কারামুক্ত হন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি ঈশ্বরদী কমান্ডারের অধীনে স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষণ নিয়ে সরাসরি রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। যুদ্ধকালীন সময়ে তার পিতা মোহাম্মদ আলী প্রামাণিকসহ পরিবারের তিন চাচা ও এক ভাতিজাকে পাকিস্তানিবাহিনী গুলি করে হত্যা করে এবং তাদের পৈত্রিক ভিটেমাটি জ্বালিয়ে দেয়। তার পিতা মোহাম্মদ আলী একজন স্বীকৃত ‘শহীদ মুক্তিযোদ্ধা’।

বিগত ৫৩ বছর কেন স্বীকৃতির আবেদন করেননি? এমন প্রশ্নের জবাবে এই প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধা এম. আখতারুজ্জামান নয়া দিগন্তকে জানান, তিনি বামপন্থী রাজনীতির আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন বলে সনদ নেয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেননি। এ ছাড়া তার পরিবার একটি শহীদ পরিবার হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু জীবন সায়াহ্নে এসে ইতিহাসের সঠিক সংরক্ষণের তাগিদে এবং প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি ২০২৫ সালে মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন। ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে তার আবেদনটি জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) মহাপরিচালকের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রেরণ করা হয়। জামুকায় তার আবেদনের সিরিয়াল নম্বর ৩০৩৩। তিনি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন জামুকার ডাক বা ইন্টারভিউয়ের জন্য।

পাবনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবং স্থানীয় কমান্ডাররা তার বীরত্বগাথার সত্যতা নিশ্চিত করে সুপারিশপত্র দিয়েছেন। এমনকি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতীয় নেতা ক্যাপ্টেন মনসুর আলীর সাথেও তার রাজনৈতিক ও কারাজীবনের ঘনিষ্ঠ স্মৃতি রয়েছে। এই প্রবীণ সাংবাদিক ও কলামিস্ট বর্তমানে বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভুগছেন। তার একমাত্র চাওয়া, মৃত্যুর আগে যেন তিনি রাষ্ট্রীয় গেজেটে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নিজের নামটি দেখে যেতে পারেন। তিনি বলেন, ‘এটি কেবল ব্যক্তিগত সম্মানের বিষয় নয়; বরং মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণ এবং প্রকৃত অংশগ্রহণকারীদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সাথে জড়িত’।