কারফিউতে থমকে ছিল জীবন, তবু থামেনি আন্দোলনের প্রতিধ্বনি

ফিরে দেখা জুলাই’২৪

Printed Edition
কারফিউতে থমকে ছিল জীবন, তবু থামেনি আন্দোলনের প্রতিধ্বনি
কারফিউতে থমকে ছিল জীবন, তবু থামেনি আন্দোলনের প্রতিধ্বনি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

২২ জুলাই ২০২৪, সোমবার। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিক্ষোভেকে ঘিরে টানা কয়েক দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর দেশজুড়ে ছিল এক অস্বাভাবিক নীরবতা। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বেশির ভাগ শহরে কারফিউ কার্যকর ছিল, সেনাবাহিনী ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহলে রাস্তাঘাট প্রায় জনশূন্য। মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড দুই ধরনের ইন্টারনেটই কার্যত বন্ধ থাকায় বাংলাদেশ তখন বিশ্বের সাথে প্রায় বিচ্ছিন্ন। যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাংকিং, গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন যাত্রা এক নজিরবিহীন স্থবিরতার মধ্যে পড়ে।

এর আগের কয়েক দিনের সংঘর্ষে বহু মানুষের প্রাণহানি ও সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দেশজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। মেট্রোরেল, বিটিভি ভবন, সেতু ভবন, টোল প্লাজাসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির চিত্র সামনে আসতে থাকে। এসব ঘটনার পর নিরাপত্তাব্যবস্থা আরো কঠোর করা হয় এবং কারফিউ বহাল রেখে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চালায় সরকার।

এ দিনও দেশের অধিকাংশ মানুষ ঘরেই অবস্থান করেন। রাস্তায় কেবল সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি ও র‌্যাবের টহল চোখে পড়ে। দূরপাল্লার পরিবহন বন্ধ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ এবং সরকারি কার্যক্রম সীমিত থাকায় রাজধানীসহ দেশের বড় শহরগুলো যেন এক অচেনা রূপ ধারণ করে। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় পরিবার-পরিজনের সাথে যোগাযোগেও ভোগান্তি সৃষ্টি হয়। বিদেশে থাকা বাংলাদেশীরাও দেশের প্রকৃত পরিস্থিতি জানতে হিমশিম খেতে থাকেন।

এমন পরিস্থিতিতেই আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম ৪৮ ঘণ্টার জন্য ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি স্থগিতের ঘোষণা দেন। তিনি জানান, সরকারকে দাবি বাস্তবায়নের জন্য সময় দেয়া হচ্ছে। একই সাথে শিক্ষার্থীদের চার দফা দাবি বাস্তবায়নের আলটিমেটামও দেয়া হয়। যদিও আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণা এলেও পরিস্থিতি তখনো উত্তেজনাপূর্ণ ছিল এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে ধরপাকড় ও নিরাপত্তা অভিযান চলতে থাকে।

২২ জুলাই সরকারের পক্ষ থেকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায় অনুযায়ী সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের চাকরিতে ৯৩ শতাংশ পদ মেধার ভিত্তিতে এবং ৭ শতাংশ পদ কোটার ভিত্তিতে পূরণের প্রজ্ঞাপন অনুমোদন করা হয়। কোটা সংস্কার আন্দোলনের মূল দাবির প্রেক্ষাপটে এটি ছিল একটি তাৎপর্যপূর্ণ প্রশাসনিক পদক্ষেপ। তবে সেই মুহূর্তে আন্দোলনকারীদের একটি বড় অংশের দাবি শুধু কোটা ইস্যুতে সীমাবদ্ধ ছিল না; সহিংসতার বিচার, গ্রেফতার বন্ধ এবং স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনার দাবিও সমান গুরুত্ব পায়।

দেশজুড়ে তখনো সাধারণ ছুটি বহাল ছিল। ব্যাংক, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানার কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে। রফতানি খাত, তৈরী পোশাক শিল্প এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব দেখা দেয়। ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন থাকায় অনলাইন লেনদেন, মোবাইল ব্যাংকিং এবং তথ্য আদান-প্রদানও ব্যাহত হয়। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেন, দীর্ঘ সময় যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল থাকলে অর্থনীতির ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব আরো গভীর হতে পারে।

রাজনৈতিক অঙ্গনেও উত্তেজনা অব্যাহত ছিল। বিভিন্ন বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযান এবং গ্রেফতারের খবর আসতে থাকে। অন্য দিকে মানবাধিকার সংগঠনগুলো সংঘর্ষে হতাহতদের প্রকৃত সংখ্যা প্রকাশ, চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং বল প্রয়োগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানায়। সংবাদমাধ্যমগুলোও সীমিত সক্ষমতায় পরিস্থিতির খবর সংগ্রহের চেষ্টা চালায়, কিন্তু ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন থাকায় তথ্য আদান-প্রদানে বড় বাধার মুখে পড়ে।

২২ জুলাইয়ের বাংলাদেশ ছিল এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের প্রতিচ্ছবি। একদিকে রাস্তায় ছিল নীরবতা, অন্যদিকে মানুষের মনে ছিল উদ্বেগ, ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা। কারফিউ এবং ইন্টারনেট বন্ধ থাকলেও আন্দোলনের অভিঘাত থেমে যায়নি। বরং এ দিনের সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং আন্দোলনের কৌশলগত বিরতি পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের ভিত্তি তৈরি করে। পরদিন ২৩ জুলাই সীমিত আকারে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট চালুর উদ্যোগ নেয়া হয় এবং কোটা সংস্কারসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি হয়। কিন্তু জুলাইয়ের সেই অস্থির সময়ের স্মৃতিতে ২২ জুলাই রয়ে গেছে একটি ‘অবরুদ্ধ বাংলাদেশ’-এর প্রতীক হিসেবে যে দিন পুরো দেশ অপেক্ষা করছিল পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে, সেই অনিশ্চিত উত্তরটির জন্য।