ইসরাইলের পছন্দকে গুরুত্ব না দিয়ে ইরানের সাথে চুক্তিতে এগোচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সম্পাদিত হতে যাওয়া সম্ভাব্য শান্তি চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের জন্য একটি বিরাট বড় জয় বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, এই চুক্তি ইসরাইলের পছন্দ হোক কিংবা না হোক, তাতে কিছু যায় আসে না। গতকাল মঙ্গলবার ফক্স নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স এই মন্তব্য করেন।

ফক্স নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে জেডি ভ্যান্স স্বীকার করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের অনেক যৌথ বা অংশীদারত্বমূলক স্বার্থ রয়েছে, তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমাদের স্বার্থের ভিন্নতাও রয়েছে। ভ্যান্স বলেন, আমার মনে হয় প্রেসিডেন্ট এখানে অত্যন্ত স্পষ্ট। ইসরাইলের অবশ্যই নিজস্ব কিছু লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য রয়েছে, তবে ইরানের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য হলো, ইরান যাতে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে তা নিশ্চিত করা। তিনি দাবি করেন, ট্রাম্প পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর থেকে হোয়াইট হাউজ একটি নতুন পারমাণবিক চুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষেত্র সৃষ্টি করেছে, যা ২০১৫ সালে ততকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার করা চুক্তির চেয়ে অনেক বেশি উন্নত ও কার্যকর হবে।

জেডি ভ্যান্স আরো বলেন, এখন, ইসরাইল এটি পছন্দ করতেও পারে, আবার নাও করতে পারে। তবে মৌলিকভাবে আমরা মনে করি, এটি যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্বার্থের অনুকূলে যাবে। তিনি বলেন, ইরানিরাও চায় না এই যুদ্ধ চলুক, কারণ এটি তাদের নিজেদের স্বার্থেরও পরিপন্থী। আর সে কারণেই আমি মনে করি তারা আলোচনার টেবিলে আসছে এবং কিছু প্রস্তাব রাখছে।

‘চুক্তির’ দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানোর আবারো দাবি ট্রাম্পের

এ দিকে ইরানের সাথে যুদ্ধ শেষ করতে শিগগিরই একটি চুক্তির কথা জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কয়েক দিনের মধ্যেই এমনকি দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে এই চুক্তি হতে পারে। গতকাল মঙ্গলবার ট্রাম্প এমন কথা বলেছেন বলে সংবাদ প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি। ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, আলোচনা এখন শেষ পর্যায়ে আছে এবং দুই বা তিন দিনের মধ্যেই একটি চুক্তি হতে পারে। তিনি দাবি করেন, চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে হরমুজ প্রণালী সাথে সাথেই আবার খুলে দেয়া হবে। তবে ইরান বলেছে, দীর্ঘমেয়াদি কোনো সমঝোতা হতে হলে লেবাননে ইসরাইলি হামলা বন্ধ করতে হবে এবং হামলা চলতে থাকলে তারা আবার সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার বলেছেন, ইরানের সাথে যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে চলমান আলোচনা প্রায় শেষ পর্যায়ে এবং কয়েক দিনের মধ্যেই চূড়ান্ত চুক্তি হতে পারে।

সিএনএন জানায়, ইরানের সাথে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেয়ার পর দুই মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। কিন্তু সেই সময় যে চুক্তিকে খুব কাছাকাছি বলে আখ্যা দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, সেটি এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। তা সত্ত্বেও গত দুই মাস ধরে তিনি ধারাবাহিকভাবে দাবি করে আসছেন, দুই পক্ষ সমঝোতার খুব কাছাকাছি।

গত ৭ এপ্রিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লিখেছিলেন, ইরানের সাথে আলোচনা ‘খুবই অগ্রসর পর্যায়ে’ রয়েছে। তবে চুক্তিটি ‘চূড়ান্ত ও সম্পন্ন’ করতে আরো দুই সপ্তাহ প্রয়োজন। তিনি তখন লিখেছিলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদি এই সমস্যাটি সমাধানের এত কাছে পৌঁছতে পারা একটি গৌরবের বিষয়।’ কিন্তু সেই দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে অনেক আগেই। দুই মাসেরও বেশি সময় অতিক্রম হলেও কোনো চুক্তি হয়নি। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যুদ্ধবিরতির আগের সময়সহ মার্চের শেষ দিক থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩৭ বার ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেছেন যে একটি চুক্তি আসন্ন, অথবা দাবি করেছেন যে ইরান মরিয়া হয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে চাইছে। তবে বর্তমানে এমন কোনো দৃশ্যমান ইঙ্গিত নেই। সমালোচকদের মতে, ট্রাম্প হয়তো আর্থিক বাজারকে আশ্বস্ত করতে চাইছেন, অথবা ধারাবাহিকভাবে একই দাবি করে রাজনৈতিক বার্তা দিতে চাইছেন। তবে তার বক্তব্যগুলোকে এখন আর গুরুত্বের সাথে নেয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

গত ২৩ মার্চ, যুদ্ধ শুরুর এক মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই, এয়ার ফোর্স ওয়ানের বাইরে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প কথিত শান্তি আলোচনা নিয়ে আশাবাদী মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে সমঝোতা হয়েছে, বলা যায় প্রায় সব বিষয়েই সমঝোতা হয়েছে।’ তবে বাস্তবে ইরান তখন কোনো ধরনের আলোচনার অস্তিত্বই অস্বীকার করে। পরদিন ২৪ মার্চ ট্রাম্প বলেন, ইরান চুক্তি করতে মরিয়া। একই সাথে তিনি যোগ করেন, ‘আমার মনে হয় আমরা এটা শেষ করতে যাচ্ছি। তবে আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি না।’ ২৫ মার্চ তিনি বলেন, ইরান ‘মনেপ্রাণে’ একটি চুক্তি করতে চাইছে। ২৬ মার্চ মন্ত্রিসভার বৈঠকে ট্রাম্পের দাবি ছিল, ইরান ‘চুক্তি ভিক্ষা চাইছে।’

এরপর ২৯ মার্চ এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, তিনি কি আগামী সপ্তাহে কোনো চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন? জবাবে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, আমি ইরানের ক্ষেত্রে একটি চুক্তি দেখতে পাচ্ছি।’

এরপর, ৬ এপ্রিল ট্রাম্প দাবি করেন, একটি বাধা আসার আগে দুই পক্ষ চুক্তির ‘খুব কাছাকাছি’ ছিল। এর পরদিন ৭ এপ্রিল তিনি যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। সেই সময় ধারণা দেয়া হয়েছিল, যুদ্ধবিরতির দুই সপ্তাহের মধ্যেই দুই পক্ষ একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তিতে পৌঁছে যাবে। তারপর, গত ১৫ এপ্রিল ফক্স বিজনেসকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমার মনে হয় বিষয়টি প্রায় শেষ। আমি এটাকে প্রায় শেষ হয়ে যাওয়ার খুব কাছাকাছি বলে দেখি।’ একই সাক্ষাৎকারে তিনি আরো বলেন, ‘আমার মনে হয় তারা খুব খারাপভাবে একটি চুক্তি করতে চায়।’ গত ১৬ এপ্রিল সাংবাদিকদের সামনে ট্রাম্প বলেন, ‘দেখে মনে হচ্ছে, আমরা ইরানের সাথে একটি চুক্তি করতে যাচ্ছি, এবং এটি একটি ভালো চুক্তি হবে।’

একদিন পরে, ১৭ এপ্রিল তিনি তিনটি পৃথক অনুষ্ঠানে আরো জোরালো দাবি করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান ‘সবকিছুতে সম্মত হয়েছে’, ‘আমার মনে হয় আমরা এক-দুই দিনের মধ্যেই একটি চুক্তি পেয়ে যাব’ এবং ‘আমার মনে হয় না খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ মতপার্থক্য বাকি আছে।’ ২০ এপ্রিল ট্রুথ সোস্যালে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, ‘সবকিছু তুলনামূলক দ্রুতই ঘটবে!’

চুক্তি না হলেও ৩০ এপ্রিল ট্রাম্প আবার দাবি করেন, ইরান এখনো ‘চুক্তি করার জন্য মরিয়া।’ ১ মে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘যখন যুদ্ধ শেষ হবে, যা খুব বেশি দেরি হওয়া উচিত নয়...।’ এরপর কিছুুদিন তিনি তুলনামূলক কম মন্তব্য করেন। কিন্তু ১৮ মে আবারও নতুন সময়সীমা সামনে আনেন। তিনি জানান, মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের অনুরোধে তিনি সামরিক হামলা ‘দুই বা তিন দিনের’ জন্য স্থগিত রেখেছেন, কারণ তারা মনে করছে যে চুক্তি হওয়ার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। এ সময় ট্রাম্প স্বীকারও করেন যে এর আগেও এমন আশাবাদী মূল্যায়ন ভুল প্রমাণিত হয়েছে। তার ভাষায়, ‘এমন সময় গেছে যখন আমরা ভেবেছিলাম যে আমরা প্রায় একটি চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছে গেছি, কিন্তু তা কাজ করেনি।’ তবে সাথে সাথে তিনি যোগ করেন, ‘কিন্তু এবার ব্যাপারটা একটু ভিন্ন।’

১৯ মে কংগ্রেসের এক পিকনিকে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা খুব দ্রুত এই যুদ্ধের অবসান ঘটাব।’ ২৩ মে তিনি একাধিকবার বলেন যে, প্রশাসন চুক্তির ‘অনেক বেশি কাছাকাছি’ পৌঁছেছে। সেদিন তিনি আরো দাবি করেন, চুক্তিটি ‘মূলত আলোচনার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে, শুধু চূড়ান্ত অনুমোদন বাকি।’ পাশাপাশি জানান, ‘খুব শিগগিরই’ চুক্তির ঘোষণা দেয়া হবে এবং ‘চূড়ান্ত বিষয়গুলো’ নিয়ে আলোচনা চলছে।

এরপর, ২৮ মে পুত্রবধূ লারা ট্রাম্পকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তারা ‘খুব ভালো একটি চুক্তির কাছাকাছি।’

সর্বশেষ গত রোববার ট্রাম্প আবারো বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান ‘একটি চুক্তির খুব কাছাকাছি।’ তবে তার অভিযোগ, ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে চলমান সঙ্ঘাত পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। অ্যাক্সিওসকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমরা ইরানের সাথে একটি চূড়ান্ত চুক্তির খুব কাছাকাছি আছি। এটি একটি ভালো চুক্তি হবে। এখন যা ঘটছে, তার কারণে আমি চাই না এটি নস্যাৎ হয়ে যাক।’

এটি অন্তত তৃতীয়বার ছিল যখন তিনি অ্যাক্সিওসকে বলেছেন যে চুক্তি আসন্ন। এর পরদিন, সাউথ ক্যারোলিনার সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের সমর্থনে আয়োজিত এক টেলি-র‌্যালিতে ট্রাম্প আবার আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে ‘পূর্ণ বিজয়ের’ অর্জনের পূর্বাভাস দেন। তিনি বলেন, ‘আমরা এখন আলোচনা করছি; তারা খুব ভালো একটি চুক্তি করতে চায়।’ শেষে আরো একটি বড় দাবি করেন ট্রাম্প। তার ভাষায়, ‘তারা (ইরান) আমাদের সবকিছু দিতে প্রস্তুত।’ তবে মার্চের শেষ থেকে জুন পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে একই ধরনের দাবি করে এলেও এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কোনো চূড়ান্ত চুক্তি ঘোষণা করা হয়নি। ফলে ট্রাম্পের বারবার দেয়া আশাবাদী পূর্বাভাসের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।