ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ একাধিক শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা ও সাবেক সেনাকর্মকর্তাদের সাথে গ্রেফতারকৃত সাবেক সেনাকর্মকর্তা মোজাফফর হোসেনের সরাসরি যোগাযোগের চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। শুধু তা-ই নয়, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার ভারতে পালিয়ে যাওয়ার আগে ও পরে ধানমন্ডি ও রাওয়া ক্লাবে অনুষ্ঠিত বেশ কিছু গোপন মিটিং এবং ভারতের একাধিক নম্বরে যোগাযোগের ভৌগোলিক অবস্থান ও সিডিআর (কল ডেটা রেকর্ড) উন্মোচিত হয়েছে তদন্তে।
পুরো ডিজিটাল নেটওয়ার্ক ও মুছে ফেলা কথোপকথন উদ্ধারে ইতোমধ্যে ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান ‘মেটা’-র কাছে চিঠি পাঠিয়েছে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিম।
নয়া দিগন্তকে বিষয়টি নিশ্চিত করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ও আইটি বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা জানান, মোজাফফর হোসেনের ফেসবুক আইডি ও মেসেঞ্জার থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতার নামে পরিচালিত ভেরিফাইড আইডির সাথে সংবেদনশীল কথোপকথনের প্রমাণ মিলেছে। ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স বা ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোজাফফরের সাথে যোগাযোগ রাখা আইডিগুলোর কেউ কেউ আওয়ামী লীগের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজের এডিটর ও মডারেটর রোলে যুক্ত ছিলেন।
তিনি আরো জানান, আমরা মেটা কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি এবং ‘ডেটা প্রিজারভেশন’ রিকোয়েস্ট সেন্ড করেছি। প্রচলিত ‘এমএলএটি’ চুক্তির আওতায় আদালতের নির্দেশনাসহ ইউআরএল পাঠানো হয়েছে। মেটা সাধারণত ১৫ দিন সময় নেয়। আমরা আশা করছি আগামী ১৫ দিনের মধ্যে মুছে ফেলা চ্যাট, আইপি অ্যাড্রেস, জিও-লোকেশান এবং ব্যবহার করা ফোন নম্বরসহ পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাব।
১৯৮১ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত মোজাফফর হোসেন ৪৫ বছর ধরে ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন। গত ১৬ জুলাই তাকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) গ্রেফতার করে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করে। গত ২৩ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানোর আদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। বর্তমানে আদালতের আদেশে তাকে সেনা হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্ত প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে জানান, মোজাফফর ২০০৭ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব এবং বর্তমানে মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার আসামি লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। তিনি গত ১৬ বছর ধরে মাসুদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন এবং পলাতক থাকা অবস্থায় বারবার প্রতিবেশী দেশ ভারতে যাতায়াত করেছেন। মাসুদ ও মোজাফফর উভয়কেই একই মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে সেনা হেফাজতে রাখা হয়েছে।
যেভাবে গ্রেফতার হন মোজাফফর
মোজাফফর কীভাবে শনাক্ত হলেন, সে বিষয়ে তানভীর হাসান জোহা বলেন, মাসুদ উদ্দিনের সাথে একাধিক মোবাইলফোন নম্বর দিয়ে কথা বলেছিলেন এক ব্যক্তি। তিনি ম্যাসেজও পাঠিয়েছিলেন। এই সূত্র ধরেই শেষ পর্যন্ত মোজাফফর শনাক্ত ও গ্রেফতার হন পুলিশের হাতে। ফেনী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মাসুদ উদ্দিনকে মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় গত ৭ মে গ্রেফতার দেখানোর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-২। একই সাথে এই মামলায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদেরও অনুমতি দেয়া হয়।
তানভীর জোহা বলেন, মামলা তদন্তের অংশ হিসেবে মাসুদ উদ্দিনের মোবাইল ফরেনসিক করে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। তার মোবাইলফোনের সিডিআর (কল ডিটেইল রেকর্ড) নেয়া হয়। অর্থাৎ মাসুদ উদ্দিনের মোবাইলফোন থেকে যাদের সাথে যোগাযোগ হয়েছে, তাদের সবার বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হয়। সিডিআরে ২০২৩ সাল থেকে রাজধানীর বনানী ও মিরপুর ডিওএইচএসের একই অবস্থান থেকে একাধিক নম্বরে মাসুদ উদ্দিনের সাথে মোবাইলফোনে এক ব্যক্তির কথা বলা, এসএমএস আদান-প্রদানের তথ্য পাওয়া যায়। ফোনালাপগুলোর সময়কাল ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত। পরে দেখা যায়, সিমগুলো ভুয়া নামে নিবন্ধিত।
সন্দেহজনক নম্বরগুলো ব্যবহার করে কে বা কারা ব্যক্তি মাসুদ উদ্দিনের সাথে যোগাযোগ করেছেন, তা ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা কিংবা প্রসিকিউশন (রাষ্ট্রপক্ষ) চিহ্নিত করতে পারছিল না বলে উল্লেখ করেন তানভীর হাসান জোহা। তিনি বলেন, এ কারণে নম্বরগুলো পুলিশ সদর দফতরে পাঠায় ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। এ ব্যাপারে পরবর্তী সময়ে পুলিশ নিজেদের মতো কাজ করে। উদ্ঘাটিত হয় মাসুদ উদ্দিনের সাথে একাধিক নম্বর থেকে যোগাযোগ করা এই ব্যক্তি হলেন জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ৪৫ বছর ধরে পলাতক থাকা সাবেক সেনাকর্মকর্তা মোজাফফর।
১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোররাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে একদল বিপথগামী সেনাকর্মকর্তা তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে নৃশংসভাবে হত্যা করেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান আগের দিন চট্টগ্রামে গিয়েছিলেন দলের স্থানীয় বিরোধ মেটাতে। জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনা, বয়ান বা বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে যাওয়া সশস্ত্র সেনাকর্মকর্তাদের একজন ছিলেন মোজাফফর। জিয়াকে হত্যার মুহূর্তে তার কাছেই ছিলেন তিনি। জিয়াউর রহমান হত্যার পর মোজাফফর পালিয়ে যান। তাকে ধরিয়ে দেয়ার জন্য তখন পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল।
তানভীর জোহা বলেন, ‘সত্যিকার অর্থে আসল কাজটা (মোজাফফরকে শনাক্ত) কিন্তু পুলিশই করেছে। আমরা শুধু সন্দেহজনক নম্বর নিয়ে বসে ছিলাম।’



