হামিদুল ইসলাম সরকার
দেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ এক্সেস কন্ট্রোলড মহাসড়ক ‘জয়দেবপুর-দেবগ্রাম-ভুলতা-মদনপুর সড়ক (ঢাকা বাইপাস)’ পিপিপি প্রকল্পের কাজ দীর্ঘসূত্রতায় আটকা পড়েছে। মাত্র চার বছর চার মাসে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সহায়তার (সাপোর্ট) এই প্রকল্পটির কাজ একের পর এক মেয়াদ বাড়িয়ে এখন গড়াচ্ছে প্রায় ১২ বছরে। আর সময় বাড়ার অজুহাতে লাগামহীনভাবে বাড়ছে খরচের বাজেটও। মূল অনুমোদিত ২৩৬ কোটি ৫০ লাখ টাকার প্রকল্পটির খরচ এখন বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ৭৩১ কোটি ৪৫ লাখ ৭১ হাজার টাকায়। অর্থাৎ মূল খরচের তুলনায় প্রকল্পটির ব্যয় প্রায় তিন গুণ বাড়ছে। এই অসামঞ্জস্য ও সংশোধিত প্রস্তাবনা নিয়ে আজ সোমবার মূল্যায়ন কমিটির সভা ডেকেছে পরিকল্পনা কমিশন।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীন সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের (সওজ) প্রকল্প দলিল সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের মূল সময়সীমা ছিল ১ মার্চ ২০১৬ থেকে ৩০ জুন ২০২০ পর্যন্ত। প্রথম সংশোধনীতে চার বছর বাড়িয়ে তা করা হয় ৩০ জুন ২০২৪। এরপর ব্যয় না বাড়িয়ে দুই দফায় মেয়াদ বাড়ানো হয় যথাক্রমে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ এবং ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত। এখন দ্বিতীয় সংশোধিত ডিপিপিতে (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) আরো এক বছর বাড়িয়ে মেয়াদ ৩১ ডিসেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত করার প্রস্তাব আনা হয়েছে। ফলে চার বছর চার মাসের প্রকল্পের কাজ শেষ হতে সময় লাগছে মূল পরিকল্পনার চেয়ে প্রায় তিন গুণ বা সাড়ে সাত বছর বেশি।
একইভাবে প্রকল্পে খরচের অঙ্ক লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ানো হচ্ছে। প্রথমে প্রথম সংশোধনীতে ব্যয় বাড়িয়ে করা হয়েছিল ৬৭৪ কোটি ৭৩ লাখ ৯৬ হাজার টাকা। দ্বিতীয় সংশোধনীতে নতুন করে আরো ৫৬ কোটি ৭১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা বা ৮ দশমিক ৪১ শতাংশ বাড়িয়ে মোট ৭৩১ কোটি ৪৫ লাখ ৭১ হাজার টাকা নির্ধারণের আবেদন করা হয়েছে। সার্বিকভাবে প্রাথমিক বাজেটের চেয়ে এখন মোট ব্যয় বাড়ছে ৪৯৫ কোটি টাকা।
প্রকল্পের গতি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০১৬ সালে শুরু হওয়া এই সাপোর্ট প্রজেক্টটির ১০ বছর পার হলেও বাস্তবায়ন অগ্রগতি ঝুলে আছে। তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত প্রকল্পের বাস্তব ও আর্থিক উভয় অগ্রগতিই মাত্র ৭৩ দশমিক ২৬ শতাংশ। মূল চুক্তি বা পিপিপি মডেল চালুর অনেক দিন পরও বেশির ভাগ কাজ কেন বাকি, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন।
খরচের নতুন অজুহাত
প্রকল্পের পেছনে বিপুল পরিমাণ বাড়তি খরচের বড় অংশই যাচ্ছে পরামর্শক ও অবকাঠামো বা ইউটিলিটি সরানোর নামে। দ্বিতীয় সংশোধনী প্রস্তাবে স্বতন্ত্র প্রকৌশলী পরামর্শক সেবা খাতে নতুন করে ২৭ কোটি ১৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। আগে এ খাতে জনমাস ছিল এক হাজার ২৭৮ এবং বরাদ্দ ছিল ৪১ কোটি ১৯ লাখ টাকা। নতুন প্রস্তাবে জনমাস দুই হাজার ১৩১-এ উন্নীত করে বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে ৬৮ কোটি ৩২ লাখ ৮০ হাজার টাকা।
পরিকল্পনা কমিশন আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে নিয়োগকৃত এই স্বতন্ত্র প্রকৌশলীর অতিরিক্ত ব্যয়, জনমাস ও প্রক্কলন পুনর্মূল্যায়নের সুপারিশ করেছে। সবচেয়ে বড় অনিয়ম হলো, প্রকল্পের ডিপিপিতে বৈদেশিক মুদ্রার অনুমোদন না থাকা সত্ত্বেও চুক্তিতে মার্কিন ডলারে বিল পরিশোধের শর্ত রাখা হয়েছিল। অনুমোদনের বাইরে গিয়ে ইতোমধ্যে প্রায় ১৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা সমমূল্যের মার্কিন ডলারে উক্ত বিল পরিশোধ করা নিয়ে কমিশন তীব্র আপত্তি ও কারণ দর্শানোর নির্দেশ দিয়েছে।
ইউটিলিটি বা বিভিন্ন বিদ্যুৎ লাইন স্থানান্তরের ক্ষেত্রেও খরচের প্রস্তাব বাড়ানো হয়েছে অর্ধেকেরও বেশি। প্রাথমিক ডিপিপিতে থোক বরাদ্দ ৪০ কোটি টাকা থাকলেও বর্তমানে তা দ্বিগুণ করে ৮৫ কোটি ৯৬ লাখ ৪৭ হাজার টাকা চাওয়া হয়েছে। মূলত নারায়ণগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ১ ও ২ এর আওতায় বৈদ্যুতিক খুঁটি অপসারণের কথা বলা হলেও ঠিক কতটি খুঁটি সরানো হয়েছে এবং উদ্ধারকৃত উপাদানের (স্যালভেজ) মূল্য কত ধরা হয়েছে- সেসব স্বচ্ছ ও নিখুঁত হিসাব ছাড়া বরাদ্দ অনুমোদন না দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
পুনর্বাসন পরামর্শক ও জমি অধিগ্রহণ
কেবল সময়ক্ষেপণ করে বাজেট বানানোর অপর উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে পুনর্বাসন পরামর্শক খাত। মূল ডিপিপিতে ৮৫৬ জনমাসের জন্য পাঁচ কোটি ৯১ লাখ টাকা দেয়া হলেও এখন জনমাস ৯৪০ করে ছয় কোটি ৭০ লাখ টাকা ফান্ডের প্রস্তাব উঠেছে। তবে বিগত এক দশকে ঠিক কতজনকে সফলভাবে পুনর্বাসন করা সম্ভব হয়েছে এবং আগামী দিনের সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা কী- তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন।
প্রকল্পটি পিছিয়ে পড়ার পেছনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ভূমি অধিগ্রহণ। প্রায় ১০ বছর পার হলেও গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ জেলার ১৫ দশমিক ২২ হেক্টর জমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। জেলা প্রশাসনের সাথে কার্যকর সমন্বয় না থাকায় প্রকল্প বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ কারণে গাজীপুর জেলা প্রশাসনের সাথে বৈঠক করে দ্রুত সময়ের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমাবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা নিশ্চিত করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের মূল্যায়ন বিভাগ স্পষ্ট জানিয়েছে, মূল নির্মাণকাজের গতিহীনতার খেসারত দিতে গিয়ে সরকারের সাপোর্ট প্রকল্পের মেয়াদ দফায় দফায় বাড়াতে হচ্ছে। আর এতে চাপ বাড়ছে পরামর্শক ফি, জনবল কাঠামো এবং আনুষঙ্গিক খরচে। ফলে পুরো প্রকল্পে সময় ও ব্যয়ের কোনো নিয়ন্ত্রণই বজায় থাকছে না। মেয়াদের এক দশক পার করার পর কেন এখনো কাজ অসমাপ্ত রয়ে গেল, প্রকল্প পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে আজ সোমবারের বৈঠকে তার সঠিক জবাব নিশ্চিত করতে হবে।



