সুমন আহমেদ মতলব উত্তর (চাঁদপুর)
চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায় দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্পের আওতায় নির্মিত ৬৪ কিলোমিটার দীর্ঘ বেড়িবাঁধ সড়কটি এখন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘ দিনের অবহেলা আর ভারী বর্ষণের ফলে সড়কের বিভিন্ন স্থানে সৃষ্টি হয়েছে ছোট-বড় শতাধিক গর্ত। কোথাও কোথাও নিচের মাটি সরে গিয়ে বড় ধসের সৃষ্টি হওয়ায় প্রতিদিন চরম ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন হাজারো মানুষ।
গতকাল শনিবার ষাটনল থেকে আমিরাবাদ পর্যন্ত ২৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ঘুরে দেখা যায়, বৃষ্টির পানির চাপে মূল বাঁধটিই এখন হুমকির মুখে। ইতোমধ্যে অন্তত ১০-১২টি স্থানে বড় ছিদ্র এবং প্রায় ৪০-৫০টি স্থানে ছোট-বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে আমিরাবাদ, মোহনপুর, ষাটনল, শিকিরচর, এখলাসপুর, জহিরাবাদ ও জনতাবাজার সংলগ্ন এলাকাগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। স্থানীয়রা জানান, প্রতিবার বৃষ্টি হলেই নতুন নতুন গর্ত তৈরি হচ্ছে। অনেক জায়গায় সড়কের পিচ উঠে নিচের মাটি ধসে পড়েছে, এমনকি কোনো কোনো স্থানে সড়কের একাংশ শূন্যে ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, মতলব উত্তর উপজেলার একটি পৌরসভা ও ১৪টি ইউনিয়নের মানুষকে নদীভাঙন ও জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা করতে ১৯৮৭-৮৮ অর্থবছরে এডিবি ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে এই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়। এই প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৩২ হাজার ১১০ একর ফসলি জমি সুরক্ষিত রয়েছে। তবে নির্মাণের পর এ পর্যন্ত অন্তত দুবার বাঁধ ভেঙে কয়েকশ’ কোটি টাকার ফসল, ঘরবাড়ি ও সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল।
বর্তমানে এই বেড়িবাঁধ সড়কটি মতলব উত্তরের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। শুধু স্থানীয় যানবাহনই নয়, ঢাকা, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার যানবাহনও এই সড়ক ব্যবহার করে। কিন্তু বর্তমান জরাজীর্ণ দশা জনদুর্ভোগ ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ট্রাকচালক সোহেল মিয়া বলেন, প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে মালামাল পরিবহন করি। কয়েকটি স্থানে এমন বড় বড় গর্ত হয়েছে যে, সামান্য অসাবধান হলেই গাড়ি উল্টে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। রাতের বেলা চলাচল করা আরো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। সিএনজি অটোরিকশাচালক আল-আমিন বলেন, যাত্রী নিয়ে দিনে কয়েকবার এই রাস্তায় যাতায়াত করতে হয়। গর্ত এড়াতে গিয়ে প্রায়ই দুর্ঘটনায় পড়তে হয়। বর্ষার কারণে গর্তগুলো আরো বড় হচ্ছে। দ্রুত মেরামত করা দরকার।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বারবার ঝুঁকির বিষয়টি জানানো হলেও স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বর্তমানে স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রশাসনের উদ্যোগে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে বালুর বস্তা, মাটি ও ইট ফেলে সাময়িক টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে, যা দীর্ঘমেয়াদে কোনো সমাধান নয়। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাঁদপুর সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের কর্মকর্তাদের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পাওয়া যায়নি।
মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী সেলিম সাহেদ বলেন, বেড়িবাঁধ সড়কের ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলো আমরা গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করছি। ইতোমধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত মেরামতের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে যাতে জনদুর্ভোগ ও দুর্ঘটনা না বাড়ে, সে লক্ষ্যে কাজ চলছে। ইউএনও মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, বেড়িবাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোর বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। এ বিষয়ে সেচ প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলীর সাথে কথা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলো দ্রুত মেরামতের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রশাসন বিষয়টি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছে।



