বিশেষ সংবাদদাতা
দেশের কুরিয়ার সেবা খাত দ্রুত সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ই-কমার্স, অনলাইন বাণিজ্য, আন্তঃজেলা পণ্য পরিবহন এবং ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তারের ফলে গত দুই অর্থবছরে দেশের কুরিয়ার শিল্পে কর্মসংস্থান, আয়, মূল্য সংযোজন এবং উৎপাদনশীলতায় উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে, দেশের কুরিয়ার খাত শুধু সেবা খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপখাত হিসেবেই নয়; বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক মূল্য সংযোজনের ক্ষেত্রেও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সমীক্ষায় দেশের ১৩৮টি কুরিয়ার সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, দেশের কুরিয়ার শিল্পের মালিকানা কাঠামো, কর্মসংস্থান, ব্যয় ও আয়সহসব সূচকেই ইতিবাচক প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।
সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশের কুরিয়ার শিল্পে ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। মোট প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশ ব্যক্তি মালিকানাধীন, যেখানে প্রায় ৩১ দশমিক ২ শতাংশ প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে।
অন্য দিকে অংশীদারত্ব মালিকানার প্রতিষ্ঠান রয়েছে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ এবং পারিবারিক অংশীদারত্বভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এক শতাংশেরও কম। বিশ্লেষকদের মতে, এই চিত্র থেকে বোঝা যায় যে, দেশের কুরিয়ার শিল্প এখনো মূলত উদ্যোক্তানির্ভর এবং বৃহৎ করপোরেট কাঠামোয় পুরোপুরি রূপান্তরিত হয়নি।
প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যও স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলোর ৯৭ দশমিক ৮ শতাংশ পুরুষদের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে। নারী নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠান মাত্র ২ দশমিক ২ শতাংশ। এ ছাড়া হিজড়া সম্প্রদায়ের নেতৃত্বাধীন কোনো কুরিয়ার প্রতিষ্ঠান সমীক্ষায় পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, সেবা খাতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়লেও উদ্যোক্তা ও ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে তাদের প্রতিনিধিত্ব এখনো অত্যন্ত সীমিত।
দেশের কুরিয়ার খাতে সবচেয়ে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে। ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে কর্মরত জনবল ছিল চার হাজার ৯৭৩ জন, যা একই অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে বেড়ে দাঁড়ায় পাঁচ হাজার ৮২৭ জনে।
পরবর্তী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই প্রবৃদ্ধির ধারা আরো জোরালো হয়েছে। প্রথম প্রান্তিকে কর্মসংস্থান ছিল পাঁচ হাজার ৮০১ জন, যা চতুর্থ প্রান্তিকে বেড়ে ছয় হাজার ৫৮০ জনে পৌঁছেছে। অর্থাৎ দুই বছরে মোট কর্মসংস্থান প্রায় ৩২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
সমীক্ষায় দেখা গেছে, নিয়মিত বেতনভুক কর্মীরাই এ খাতের প্রধান চালিকাশক্তি। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তাদের সংখ্যা ছিল চার হাজার ৬৬৪ জন, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ছয় হাজার ২৫৮ জনে।
অন্য দিকে কর্মরত মালিক, চুক্তিভিত্তিক কর্মী ও অবৈতনিক পারিবারিক কর্মীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। বিদেশী কর্মীর সংখ্যা অত্যন্ত কম।
কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পাশাপাশি বেড়েছে শ্রম ব্যয়ও। ২০২২-২৩ অর্থবছরে কুরিয়ার খাতের মোট কর্মসংস্থান ব্যয় ছিল ৬৪৩ দশমিক ৭৬ মিলিয়ন টাকা। এর প্রায় ৯২ শতাংশ ব্যয় হয়েছে নিয়মিত বেতনভুক কর্মীদের জন্য।
পরবর্তী অর্থবছরে মোট কর্মসংস্থান ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৩৭ দশমিক ৩৬ মিলিয়ন টাকায়, যা প্রায় ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। এ সময় নিয়মিত কর্মীদের পেছনে ব্যয় হয়েছে মোট শ্রম ব্যয়ের ৯৩ শতাংশেরও বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবণতা এক দিকে যেমন কর্মসংস্থানের সম্প্রসারণ নির্দেশ করে, অন্য দিকে দক্ষ মানবসম্পদ ধরে রাখার জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ বৃদ্ধিরও প্রতিফলন ঘটায়।
সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের কুরিয়ার শিল্পের আর্থিক সক্ষমতাও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে খাতটির মোট টার্নওভার ছিল ২১৭ কোটি ৭০ লাখ টাকার সমপরিমাণ (২,১৭৭.০৭ মিলিয়ন টাকা)।
এর মধ্যে ডকুমেন্ট, নন-ডকুমেন্ট এবং পার্সেল সংগ্রহ, পরিবহন ও বিতরণ সেবা থেকে আয় হয়েছে প্রায় ১৯৯ কোটি ৪১ লাখ টাকা, যা মোট আয়ের ৯১ শতাংশেরও বেশি।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে মোট টার্নওভার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩৬ কোটি ৬৯ লাখ টাকায় (২,৩৬৬.৯৬ মিলিয়ন টাকা)। এর মধ্যে প্রায় ২২১ কোটি ৯২ লাখ টাকা এসেছে মূল কুরিয়ার সেবা কার্যক্রম থেকে, যা মোট আয়ের ৯৩ শতাংশেরও বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ই-কমার্সের প্রসার, অনলাইন মার্কেটপ্লেসের সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল বাণিজ্যের বৃদ্ধি এই প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি।
কুরিয়ার সেবার ক্ষেত্রে পরিচালন ব্যয়ের সবচেয়ে বড় খাত হিসেবে উঠে এসেছে জ্বালানি ব্যয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে মোট মধ্যবর্তী ভোগ ব্যয় ছিল প্রায় ৪৭৭ মিলিয়ন টাকা, যার মধ্যে প্রায় ২১৯ মিলিয়ন টাকা ব্যয় হয়েছে পার্সেল পরিবহনের জ্বালানি খাতে।
একই চিত্র দেখা গেছে ২০২৩-২৪ অর্থবছরেও। ওই সময়ে মোট পরিচালন ব্যয় ছিল প্রায় ৪৮২ মিলিয়ন টাকা, যার প্রায় ৪৫ শতাংশই ব্যয় হয়েছে জ্বালানি খাতে।
বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি ব্যয়ের ওপর এই উচ্চ নির্ভরশীলতা ভবিষ্যতে বৈদ্যুতিক যানবাহন ও প্রযুক্তিনির্ভর সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতি খাতটির আগ্রহ বাড়াতে পারে।
দেশের কুরিয়ার খাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো স্থূল মূল্য সংযোজন (জিভিএ)। ২০২২-২৩ অর্থবছরে মোট দুই হাজার ১৭৭ কোটি টাকার উৎপাদন থেকে প্রায় এক হাজার ৭০০ কোটি টাকার মূল্য সংযোজন হয়েছে। সে সময় জিভিএ-টু-আউটপুট অনুপাত ছিল ৭৮ দশমিক ৮ শতাংশ।
পরবর্তী অর্থবছরে এই হার আরো বেড়ে ৭৯ দশমিক ৬৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মোট মূল্য সংযোজন দাঁড়িয়েছে প্রায় এক হাজার ৮৮৫ কোটি টাকায়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই উচ্চ মূল্য সংযোজন হার নির্দেশ করে যে, দেশের কুরিয়ার শিল্প তুলনামূলকভাবে দক্ষ ও উৎপাদনশীল সেবা খাতে পরিণত হচ্ছে।
সমীক্ষায় আরো দেখা গেছে, স্থূল মূল্য সংযোজনে শ্রমের অংশ উভয় অর্থবছরেই তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল। ২০২২-২৩ অর্থবছরে শ্রমের অংশ ছিল ৩২ থেকে ৪১ শতাংশের মধ্যে, আর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা ছিল প্রায় ৩৭ থেকে ৪১ শতাংশের মধ্যে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবণতা ইঙ্গিত করে যে, কুরিয়ার শিল্পে পুঁজি ও শ্রমের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে খাতটির টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য ইতিবাচক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতি ও ই-কমার্স খাতের সম্প্রসারণের সাথে সাথে কুরিয়ার শিল্প আগামী বছরগুলোতে আরো বড় অর্থনৈতিক খাতে পরিণত হতে পারে। তবে এ জন্য প্রযুক্তিনির্ভর সরবরাহ ব্যবস্থা, লজিস্টিক অবকাঠামোর উন্নয়ন, নারী উদ্যোক্তা অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং জ্বালানি দক্ষ পরিবহন ব্যবস্থার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে দেশের কুরিয়ার শিল্প শুধু পণ্য পরিবহন নয়; বরং ডিজিটাল অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত খাত হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।



