সীমিত সম্পদে সমতা ও টেকসই উন্নয়ন রূপরেখা

Printed Edition
জামায়াতের ছায়া বাজেট ২০২৬-২৭ পেশ করছেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান
জামায়াতের ছায়া বাজেট ২০২৬-২৭ পেশ করছেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান

বিশেষ সংবাদদাতা

  • আয় ৬.৭১ লাখ কোটি
  • ব্যয় ৮.৪০ লাখ কোটি টাকা
  • ঘাটতি ১.৬৮ লাখ কোটি

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী একটি বিকল্প বা ‘ছায়া বাজেট’ প্রস্তাব করেছে। এই বাজেটে মোট আয় ধরা হয়েছে ছয় লাখ ৭১ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা, বিপরীতে মোট ব্যয়ের প্রাক্কলন আট লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা। ফলে সামগ্রিক বাজেট ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে এক লাখ ৬৮ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২ দশমিক ৪৩ শতাংশ।

প্রস্তাবিত ছায়া বাজেট অনুযায়ী, সরকারের মোট রাজস্ব প্রাপ্তি হবে ছয় লাখ ৬৫ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নিয়ন্ত্রিত কর রাজস্ব থেকে আসবে পাঁচ লাখ ৭৩ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির ৮ দশমিক ৩০ শতাংশ। এনবিআর বহির্ভূত কর রাজস্ব ধরা হয়েছে ২২ হাজার কোটি টাকা এবং করবহির্ভূত প্রাপ্তি ৭০ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া বৈদেশিক অনুদান হিসেবে পাঁচ হাজার ২৫০ কোটি টাকা পাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাজেটের আকার বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতি ১০০ টাকা জিডিপির বিপরীতে সরকার রাজস্ব সংগ্রহ করতে চায় প্রায় ৯ দশমিক ৭০ টাকা, কিন্তু ব্যয় করতে চায় ১২ দশমিক ১৪ টাকা। এ ব্যবধানই বাজেট ঘাটতির প্রধান কারণ। ব্যয়ের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ পরিচালন ব্যয়, যার পরিমাণ পাঁচ লাখ ৮৯ হাজার ৭১২ কোটি টাকা। উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে দুই লাখ ৪১ হাজার ৫১ কোটি টাকা। এ ছাড়া ঋণ ও অগ্রিম খাতে নিট ৯ হাজার ৬২ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে।

জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এই বাজেট উপস্থাপনা শুরু করেন। গতকাল রাজধানীর মগবাজার আল ফালাহ মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ বাজেট উপস্থাপন করা হয়। জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলাম খান মিলন বাজেট উপস্থাপন করেন। এ সময় বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান, সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ দলটির শীর্ষ নেতারা এবং ১১ দলের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

একটি কল্যাণমুখী বিকল্প দলিল হিসাবে উপস্থাপন

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ছায়া বাজেট এবং মধ্যমেয়াদি অর্থনৈতিক রূপরেখাটি গভীর কাঠামোগত সংস্কারের ওপর ভিত্তি করে রচিত। এর ইতিবাচক দিক হলো- জনপ্রশাসন বা আমলাতান্ত্রিক ব্যয় প্রায় চার ভাগের এক ভাগে নামিয়ে এনে শিক্ষা (১৪.৯৬ শতাংশ) এবং স্বাস্থ্য (৫.৩৯ শতাংশ) খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাবটি একটি আদর্শ কল্যাণ রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক দর্শনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। এ ছাড়া বাজেট ঘাটতিকে জিডিপির ৩ শতাংশের নিচে (২.৪৩ শতাংশ) ধরে রাখার আর্থিক পরিকল্পনাটি সামষ্টিক অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত ইতিবাচক। করের হার না বাড়িয়ে করজাল সম্প্রসারণ এবং কর রেয়াত ১০ শতাংশ কমিয়ে রাজস্ব বৃদ্ধির কৌশলটি অর্থনৈতিকভাবে টেকসই।

অন্যদিকে চ্যালেঞ্জের দিক হলো-পূর্ববর্তী ঋণগুলোর সুদ পরিশোধের বিশাল দায় (১৫.১৯ শতাংশ), যা বাজেটের নমনীয়তাকে সীমিত করে ফেলে। এছাড়া, ঘাটতি অর্থায়নে ব্যাংকিং খাত থেকে ৮১,৩২৯ কোটি টাকার ঋণ নেয়ার পরিকল্পনা বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহকে কিছুটা চাপে ফেলতে পারে এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশকে শ্লথ করতে পারে। তবে জামায়াতের দাবি, যদি পাচারকৃত অর্থ পুনরুদ্ধার করা যায় এবং সরকারি অপচয় সাশ্রয় করা যায়, তবে ব্যাংকিং খাতের ওপর এই নির্ভরতা অনেক কমে আসবে।

পরিচালনা ও উন্নয়ন ব্যয়

ছায়া বাজেটে পরিচালন ব্যয়ের ভেতরে সুদ পরিশোধ অন্যতম বড় চাপ হিসেবে দেখা দিয়েছে। আগামী অর্থবছরে শুধু সুদ পরিশোধেই ব্যয় হবে এক লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ বাবদ এক লাখ পাঁচ হাজার কোটি এবং বৈদেশিক ঋণের সুদ বাবদ ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে। অর্থনীতিবিদদের মতে, সুদ ব্যয়ের ক্রমবর্ধমান চাপ সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।

উন্নয়ন ব্যয়ের মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে বরাদ্দ রাখা হয়েছে দুই লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া এডিপি বহির্ভূত বিশেষ প্রকল্পে আট হাজার ৩৬৭ কোটি, বিভিন্ন স্কিমে চার হাজার ৯৩৮ কোটি এবং খাদ্য কর্মসূচি ও স্থানান্তর খাতে দুই হাজার ৭৪৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে অনুদানসহ সামগ্রিক ঘাটতি ধরা হয়েছে এক লাখ ৬৮ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা বা জিডিপির ২ দশমিক ৪৩ শতাংশ। অনুদান বাদ দিলে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় এক লাখ ৭৩ হাজার ৫৭৯ কোটি টাকা, যা জিডিপির ২ দশমিক ৫১ শতাংশ।

এই ঘাটতি পূরণে সরকার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করছে। বাজেট অনুযায়ী, নিট বৈদেশিক ঋণ নেয়া হবে ৬৭ হাজার কোটি টাকা। এজন্য মোট এক লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ করা হলেও ৪১ হাজার কোটি টাকা ঋণ পরিশোধ করতে হবে।

অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নিট ১ লাখ ১ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে আসবে ৮১ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা এবং জাতীয় সঞ্চয়পত্র থেকে সংগ্রহ করা হবে ২০ হাজার কোটি টাকা। অন্যান্য উৎস থেকে আরো ১২ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

জিডিপির সম্ভাব্য আকার

ছায়া বাজেটের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের জিডিপির আকার দাঁড়াবে ৬৯ লাখ ১৭ হাজার ১০০ কোটি টাকা। সেই বিবেচনায় বাজেটটি তুলনামূলকভাবে সংযত ঘাটতির হলেও রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, ঋণনির্ভরতা নিয়ন্ত্রণ এবং সুদ ব্যয়ের চাপ সামাল দেয়া আগামী অর্থবছরের প্রধান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হবে। বিশেষ করে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশের নিচে থাকা এবং ঋণের সুদ পরিশোধে বিপুল ব্যয় অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে।

দলটির পক্ষ থেকে উপস্থাপিত এই বাজেটে দেশের জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন) ধরা হয়েছে ৬৯,১৭,১০০ কোটি টাকা। প্রচলিত আমলাতান্ত্রিক ও ভোগ-চালিত অর্থনৈতিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় সঙ্কোচন, শিক্ষা-স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার এবং অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে একটি সুষম, উৎপাদন ও রফতানি-চালিত মডেল দাঁড় করানোর প্রয়াস দেখা গেছে এই প্রস্তাবে।

সামগ্রিক ছায়া বাজেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এখানে একদিকে যেমন জনকল্যাণমুখী ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে, অন্যদিকে তেমনি প্রশাসনিক ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা হয়েছে। দলটির মতে, সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে কর ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, রফতানি বহুমুখীকরণ এবং একটি ভারসাম্যপূর্ণ মুদ্রানীতি অপরিহার্য, যা দেশের উৎপাদনশীলতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুজ্জীবিত করতে সক্ষম হবে।

করজালের বিস্তার ও আত্মনির্ভরশীলতা

জামায়াতের ছায়া বাজেটে মোট রাজস্ব প্রাপ্তি ও বৈদেশিক অনুদান মিলিয়ে প্রাক্কলন করা হয়েছে ৬,৭১,১৭৬ কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির ৯.৭০ শতাংশ। এর মধ্যে মূল রাজস্ব প্রাপ্তি ধরা হয়েছে ৬,৬৫,৯২৬ কোটি টাকা (জিডিপির ৯.৬৩ শতাংশ)। এটি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রাক্কলিত সরকারি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১ লাখ ০১ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা বেশি। দীর্ঘমেয়াদে দলটির লক্ষ্য রাজস্ব-জিডিপি অনুপাতকে ১৪ শতাংশে উন্নীত করা।

রাজস্ব আয়ের উৎসগুলোকে যেভাবে বিন্যস্ত করা হয়েছে: কর রাজস্ব: মোট ৫,৯৫,৯২৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নিয়ন্ত্রিত কর থেকে আসবে ৫,৭৩,৯২৬ কোটি টাকা এবং এনবিআর-বহির্ভূত কর থেকে আসবে ২২,০০০ কোটি টাকা। কর ব্যতীত প্রাপ্তি: ৭০,০০০ কোটি টাকা (জিডিপির ১.০১ শতাংশ)।

বৈদেশিক অনুদান: অনুদান খাতের ওপর পরনির্ভরশীলতা কমিয়ে মাত্র ৫,২৫০ কোটি টাকা (জিডিপির ০.০৮ শতাংশ) প্রাপ্তির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতির ইঙ্গিতবাহী। বাজেটে প্রস্তাবিত মোট রাজস্ব প্রাপ্তি হবে: ৬,৬৫,৯২৬ কোটি টাকা।

এনবিআর সংস্কার ও মেধাভিত্তিক রাজস্ব কৌশল

বাংলাদেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বিশ্বের অন্যতম সর্বনি¤œ (৬.৮ শতাংশ থেকে ৭ শতাংশ)। জামায়াত মনে করে, এটি কেবল কর হারের সমস্যা নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার অভাব। রাজস্ব বৃদ্ধিতে তাদের মূল কৌশলসমূহ নি¤œরূপ:

১. করদাতার পরিধি সম্প্রসারণ: বর্তমানে ১ কোটি ২০ লাখ টিআইএনধারীর মধ্যে রিটার্ন দেন ৪০ লাখের কম। জামায়াতের প্রস্তাব-সব এনআইডি নম্বরকে পর্যায়ক্রমে টিআইএন-এ রূপান্তর এবং ব্যবসায়িক বিআইএন সর্বজনীন করা।

২. করমুক্ত আয়ের সীমা বৃদ্ধি: সাধারণ মানুষের স্বস্তির জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা বর্তমান ৩.৫ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪.৫ লাখ টাকা করা (পরবর্তী বছরে ৫ লাখ)। সর্বনি¤œ ব্যক্তিগত করহার ৫ শতাংশ অপরিবর্তিত রাখার কথা বলা হয়।

৩. ট্যাক্স এক্সপেন্ডিচার (কর রেয়াত) হ্রাস: ঢালাও কর ছাড়ের সংস্কৃতি সংস্কার করে অন্তত ১০ শতাংশ কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে, যা থেকে ৮ শতাংশ অতিরিক্ত রাজস্ব আসবে।

৪. করপোরেট কর যৌক্তিকীকরণ: সর্বোচ্চ ৩৭.৫ শতাংশ করপোরেট কর দক্ষিণ এশিয়ায় অন্যতম বেশি, যা কর ফাঁকি বাড়ায়। এটি পর্যায়ক্রমে কমিয়ে কমপ্লায়েন্স বাড়ানো হবে।

৫. এনবিআর আধুনিকীকরণ: দেশব্যাপী ভ্যাট ও ট্যাক্স আদায়ে অটোমেশন, স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি নম্বর চালু এবং বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে আসা শীর্ষ মেধাবীদের কর নিরীক্ষায় নিয়োজিত করা।

আমলাতন্ত্র ছাঁটাই ও সামাজিক বিনিয়োগ

অর্থবছরের জন্য সর্বমোট ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৮,৩৯,৫০৫ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১২.১৪ শতাংশ। এই ব্যয়কে পরিচালন ও উন্নয়ন, এই দুই ভাগে বিন্যস্ত করা হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতকে এখানে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে।

@ খাতভিত্তিক বরাদ্দের তুলনামূলক সারণি

ক্র. খাতের নাম - প্রস্তাবিত বরাদ্দ (কোটি টাকায়) - মোট বাজেটের শতাংশ (%)

১. সুদ পরিশোধ - ১২৭,৫০০ - ১৫.১৯%

২. শিক্ষা ও প্রযুক্তি - ১২৫,৫৭৫ - ১৪.৯৬%

৩. পরিবহন ও যোগাযোগ - ৬৫,৩৪০ - ৭.৭৮%

৪. কৃষি - ৫১,৬৭০ - ৬.১৫%

৫. সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ - ৪৮,১৫০ - ৫.৭৪%

৬. স্বাস্থ্য - ৪৫,২৪০ - ৫.৩৯%

৭. স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন - ৪৫,২২০ - ৫.৩৯%

৮. জনপ্রশাসন - ৪৫,০৮৩ - ৫.৩৮%

৯. প্রতিরক্ষা - ৪৩,৪৬২ - ৫.১৮%

জনপ্রশাসন খাতে বৈপ্লবিক ছাঁটাই

বাজেটের সবচেয়ে বড় চমক হলো জনপ্রশাসন খাতের ব্যয় সঙ্কোচন। পূর্ববর্তী বাজেটে যা একসময় ২,০২,২৪৫ কোটি টাকা পর্যন্ত উঠেছিল, তা কমিয়ে মাত্র ৪৫,০৮৩ কোটি টাকায় (৫.৩৮ শতাংশ) নামিয়ে আনা হয়েছে। আমলাতান্ত্রিক ও অনুৎপাদনশীল ব্যয় প্রায় চার ভাগের এক ভাগে নামিয়ে এনে সেই অর্থ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক খাতে স্থানান্তর করার একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বার্তা রয়েছে এই সিদ্ধান্তে। অপ্রয়োজনীয় বিদেশ ভ্রমণ, বিলাসবহুল গাড়ি কেনা এবং রক্ষণাবেক্ষণ খাতের দুর্নীতি বন্ধ করে ২৯,৯০৫ কোটি টাকা সাশ্রয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

বাজেট ঘাটতি ও অর্থসংস্থান

জামায়াতের এই ছায়া বাজেটে সামগ্রিক ঘাটতি (অনুদানসহ) প্রাক্কলন করা হয়েছে ১,৬৮,৩২৯ কোটি টাকা, যা জিডিপির ২.৪৩ শতাংশ। অনুদান ব্যতীত এই ঘাটতির পরিমাণ ১,৭৩,৫৭৯ কোটি টাকা (জিডিপির ২.৫১ শতাংশ)। উন্নয়নশীল দেশের প্রেক্ষাপটে জিডিপির ৩ শতাংশের নিচে ঘাটতি রাখা অত্যন্ত ইতিবাচক ও নিয়ন্ত্রিত সামষ্টিক অর্থনীতির লক্ষণ।

এই ১,৬৮,৩২৯ কোটি টাকার ঘাটতি মেটাতে অর্থসংস্থানের পরিকল্পনা: বৈদেশিক উৎস (নিট): বৈদেশিক ঋণ বাবদ ১,০৮,০০০ কোটি টাকা প্রাপ্তির বিপরীতে পূর্বের ঋণ পরিশোধ করা হবে ৪১,০০০ কোটি টাকা। ফলে নিট বৈদেশিক ঋণ দাঁড়াবে ৬৭,০০০ কোটি টাকা (জিডিপির ০.৯৭ শতাংশ)। জামায়াতের কৌশল হলো-ভবিষ্যতে কেবল সহজ শর্তের বৈদেশিক ঋণ ও পিপিপি মডেলে অর্থায়ন নেয়া।

অভ্যন্তরীণ উৎস (নিট): অভ্যন্তরীণ খাত থেকে মোট ১,০১,৩২৯ কোটি টাকা (জিডিপির ১.৪৬ শতাংশ) ঋণ নেয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে: ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে নিট ঋণ: ৮১,৩২৯ কোটি টাকা (দীর্ঘমেয়াদি ৯৩,৩২৯ কোটি টাকা নেয়া হলেও স্বল্পমেয়াদি ঋণ ১২,০০০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হবে)। ব্যাংকবহির্ভূত উৎস (জাতীয় সঞ্চয়পত্র): ২০,০০০ কোটি টাকা। অন্যান্য খাত থেকে নিট প্রাপ্তি: ১২,০০০ কোটি টাকা।

জাতীয় সংস্কার রূপরেখা: ৪টি স্তম্ভের গভীর বিশ্লেষণ

স্তম্ভ ১: শিক্ষা খাতের রূপান্তর (মেধা ও প্রযুক্তির সমন্বয়): জামায়াতে ইসলামী কেবল জিডিপির সংখ্যামূলক প্রবৃদ্ধিকে প্রকৃত উন্নয়ন মনে করে না; তাদের মতে উন্নয়নের মূল মাপকাঠি কর্মসংস্থান ও শিক্ষার গুণগত মান। ইউনেস্কো ও সরকারি গবেষণার বরাতে প্রতিবেদনে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার বেহাল দশা (যেমন প্রাথমিক শেষ করা ৯১ শতাংশ শিক্ষার্থীর গণিতে ন্যূনতম যোগ্যতা না থাকা) তুলে ধরা হয়েছে। এই সঙ্কট উত্তরণে দলটির প্রস্তাবনা:

স্থায়ী শিক্ষা কমিশন ও স্টেম শিক্ষাক্রম: মুখস্থনির্ভরতা বাদ দিয়ে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত স্টেম) শিক্ষাক্রম চালু করা হবে।

শিক্ষক নিয়োগ ও মর্যাদা: শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ১৫:১-এ নামিয়ে আনতে সাধারণ ও মাদরাসা ধারায় ব্যাপক শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হবে। মেধাবীদের আকৃষ্ট করতে সহকারী শিক্ষকদের বেতন ১০ম গ্রেডে উন্নীত করা হবে।

প্রতিষ্ঠান সরকারীকরণ: ২০৩০ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে মাধ্যমিক পর্যন্ত সব প্রতিষ্ঠান সরকারীকরণ করা হবে। আগামী পাঁচ বছরে প্রতি ইউনিয়নে ১টি সরকারি স্কুল এবং প্রতি ২ ইউনিয়নে ১টি সরকারি আলিয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা হবে।

আর্থিক প্রণোদনা: শিক্ষা ব্যয়ে বার্ষিক ৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত কর রেয়াত এবং প্রতিটি নির্ভরশীলের জন্য ৫০,০০০ টাকা ব্যক্তিগত করছাড়ের ব্যবস্থা থাকবে। উচ্চশিক্ষার জন্য এক লাখ মেধাবীকে সুদমুক্ত ‘হাসানা ঋণ’ এবং স্নাতক পর্যন্ত নারীদের অবৈতনিক শিক্ষার সুযোগ দেয়া হবে। আগামী ৫ বছরে শিক্ষা বাজেট জিডিপির ৪ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে।

স্তম্ভ ২: স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার (পকেটবান্ধব ও সর্বজনীন সেবা): বর্তমানে দেশের মানুষকে চিকিৎসায় ৭৪ শতাংশ ব্যয় নিজের পকেট থেকে করতে হয়, যার ফলে প্রতি বছর ৮৬ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হচ্ছে। জামায়াতের রূপরেখায় স্বাস্থ্য খাতকে সুরক্ষার হাতিয়ার করা হয়েছে:

প্রাথমিক ও টারশিয়ারি স্বাস্থ্যসেবা: প্রতিটি ইউনিয়নে কার্যকর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে এবং চিকিৎসকের শূন্যপদ পূরণ করে উপজেলা হাসপাতালগুলোর আধুনিকায়ন নিশ্চিত করা হবে। জেলা হাসপাতালগুলোকে টারশিয়ারি হাসপাতালে রূপান্তর করা হবে।

বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়: প্রতিটি বিভাগে সরকারি ও পিপিপি মডেলে আন্তর্জাতিক মানের বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ করা হবে, যা উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশগমন ঠেকিয়ে বার্ষিক পাঁচ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করবে।

বিনামূল্যে চিকিৎসা ও লক্ষ্যমাত্রা: আগামী ১০ বছরে প্রতি হাজার মানুষের জন্য ১ জন চিকিৎসক ও ১টি শয্যা নিশ্চিত করা হবে। ৫ বছরের কম বয়সী শিশু এবং ৬০ বছরের ঊর্ধ্বের প্রবীণদের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসা ও পৃথক জরা বিজ্ঞান বিভাগ চালু করা হবে।

স্তম্ভ ৩: কর্মসংস্থান, যুবশক্তির জাগরণ ও নতুন বেতন স্কেল: দেশের ৪০ শতাংশ কর্মক্ষম তরুণ বর্তমানে নিষ্ক্রিয়। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে শ্রমবাজারে যুক্ত করতে একটি সমন্বিত ‘যুব উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়’ এবং এর অধীনে ‘কর্মসংস্থান অধিদফতর’ গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

অভিবাসন ব্যয় কমাতে বোয়েসেল-এর মাধ্যমে দালালমুক্ত অনলাইন নিয়োগ এবং উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে দক্ষ কেয়ারগিভার, আইটি ও মেকানিক্যাল কর্মী প্রেরণে আন্তর্জাতিক মানের ভাষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ দেয়ার কথা বলা হয়েছে।

নতুন জাতীয় বেতন স্কেল বাস্তবায়ন প্রস্তাবনা: ২০১৫ সালের পর দীর্ঘ সময় নতুন বেতন স্কেল না হওয়ায় এবং তীব্র মুদ্রাস্ফীতির কারণে নি¤œ গ্রেডের কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান সঙ্কটে পড়েছে। জামায়াত সীমিত রাজস্ব সক্ষমতা বিবেচনায় ধাপে ধাপে বাস্তবসম্মত উপায়ে নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের ছক প্রস্তাব করেছে:

কর্মচারীদের স্তর - ১ জুলাই, ২০২৬ (১ম বছর) - ১ জুলাই, ২০২৭ (২য় বছর) - ১ জুলাই, ২০২৮ (৩য় বছর)

১০ম থেকে ২০তম গ্রেড - ১০০% মূল বেতন কার্যকর - ১০০% বর্ধিত ভাতা কার্যকর ---

১ম থেকে ৯ম গ্রেড - ৫০% মূল বেতন কার্যকর - বাকি ৫০% মূল বেতন কার্যকর - সম্পূর্ণ বর্ধিত ভাতা কার্যকর

নোট: প্রচলিত টিফিন, যাতায়াত, চিকিৎসা ও শিক্ষা ভাতার হার বর্তমান বাজারদরের সাথে সঙ্গতি রেখে যৌক্তিকভাবে বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে।

স্তম্ভ ৪: কৃষির আধুনিকায়ন ও বাজার নিয়ন্ত্রণ: কৃষকদের ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে জামায়াতের সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক পরিকল্পনা রয়েছে: কোল্ড স্টোরেজ ও কৃষক মার্কেট: প্রতি উপজেলায় সোলার পাওয়ারচালিত ‘ফার্মার্স মিনি কোল্ড স্টোরেজ’ এবং বড় শহরগুলোতে সরাসরি ‘কৃষক মার্কেট’ চালু করা হবে, যেখানে কৃষকেরা সরাসরি পণ্য বিক্রি করতে পারবেন। পরিবহন ও চাঁদাবাজি বন্ধ: রেলওয়ের মাধ্যমে সুলভে পণ্য পরিবহনের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি বাজার ও পরিবহনে সব ধরনের চাঁদাবাজি কঠোর হস্তে বন্ধ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

আর্থিক খাত, শেয়ারবাজার ও প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন

জামায়াতে ইসলামীর মতে, বিগত ফ্যাসিবাদের শাসনামলে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এবং সুশাসনের অভাবে ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। এই খাতের পুনরুজ্জীবনে তাদের প্রস্তাবনা:

অর্থ পাচার প্রতিরোধ ও পুনরুদ্ধার: ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশ থেকে প্রায় ২৩.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা, গড়ে প্রতি বছর এক লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা) বিদেশে পাচার হয়েছে। জামায়াত অর্থপাচার প্রতিরোধ আইন দ্রুত আন্তর্জাতিক মানে সংস্কার এবং দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার মাধ্যমে এই অর্থ পুনরুদ্ধারের দাবি জানায়, যা অর্জিত হলে বাজেট ঘাটতি সম্পূর্ণ দূর করা সম্ভব।

ব্যাংকিং ও শেয়ারবাজার সুশাসন: ব্যাংকিং খাতের সম্পদ মূল্যায়ন, অর্থ পাচার রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং শেয়ারবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে শক্তিশালী করে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছে, যাতে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো মূলধন তুলতে পারে এবং ব্যাংকের ওপর চাপ কমে।

স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের সংস্কার: রেল, বিমান, বিআরটিসি এবং পাট ও বস্ত্রকলের মতো লোকসানি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি মুক্ত করে লাভজনক ও প্রতিযোগিতামূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা হবে।

সামগ্রিকভাবে, জামায়াতে ইসলামীর এই ছায়া বাজেটটি কেবল কিছু সংখ্যার মেলা নয়, বরং সুশাসন, দুর্নীতি হ্রাস এবং মেধাভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে একটি স্বনির্ভর ও বৈষম্যহীন কল্যাণ রাষ্ট্রে রূপান্তর করার একটি দূরদর্শী ও বাস্তবসম্মত বিকল্প দলিল।