পরবর্তী সংসদ অধিবেশনে আনা হচ্ছে মানবাধিকার আইন

Printed Edition

আলমগীর কবির

দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ও আইনি কাঠামোর আমূল সংস্কারের অংশ হিসেবে আগামী সংসদ অধিবেশনেই নতুন ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন’ বিল আকারে উত্থাপনের চূড়ান্ত লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার। একই সাথে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারে একটি সম্পূর্ণ নতুন, স্বাধীন ও স্থায়ী আইন প্রণয়নের কাজও শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

জাতীয় সংসদ ভবনে বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, মিশন প্রধান, উন্নয়ন সহযোগী এবং বিভিন্ন বাহিনীর প্রধানদের উপস্থিতিতে প্রস্তাবিত ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’-এর খসড়া পর্যালোচনার লক্ষ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় গত ৬ জুলাই। এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের বিষয়ে গত ৯ জুলাই আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান তার কার্যালয়ে সরকারের এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা জানান।

আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানান, সরকার এরই মধ্যে ভুক্তভোগী পরিবার, মানবাধিকার সংগঠন, কূটনৈতিক ও অংশীজনদের সাথে মানবাধিকার ও গুমসংক্রান্ত আইনের খসড়া নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনা করছে এবং এ পর্যন্ত তিনটি আনুষ্ঠানিক পাবলিক কনসালটেশন সম্পন্ন হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, জন-আকাক্সক্ষার যে সনদ অর্থাৎ জুলাই চার্টারকে সামনে রেখেই এই আইনি সংস্কারগুলো করা হচ্ছে। সব আইনি প্রক্রিয়া এবং পাবলিক কনসালটেশন শেষ করে আগামী সংসদ অধিবেশনেই মানবাধিকার কমিশন আইনটি পাসের জন্য সংসদে তোলার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে। সরকার কোনো আইন একা চাপিয়ে দিতে চায় না বলেই সব মহলের মতামত নিয়ে চূড়ান্ত বিল সংসদে পাঠানো হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।

তবে এই নতুন আইনের খসড়াটি গভীরভাবে অনুসন্ধান করতে গিয়ে মিলেছে এক চমকপ্রদ তথ্য, যেখানে সরকারের দাবি এবং আইনের বাস্তব রূপের মধ্যে বড় ধরনের আইনি মারপ্যাঁচ লুকিয়ে আছে। ২০২৫ সালে জারি করা পূর্ববর্তী গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় গুমকে গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে এই স্থায়ী আইনটি করা হচ্ছে। নতুন আইনের খসড়ায় মূলত চারটি বিষয়কে গুমের সুনির্দিষ্ট অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে বলপূর্বক গুম, গুমের কারণে মৃত্যু, গুমের আলামত নষ্ট করা এবং গোপন আটকখানা তৈরি ও পরিচালনা।

এই আইনে গুমের অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে ‘মৃত্যুদণ্ড’ বহাল রাখা হয়েছে এবং কারাদণ্ডের বিধানে পরিবর্তন এনে সর্বনিম্ন সাজা ‘১০ বছর কারাদণ্ড’ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সাথে গুমের ঘটনার তদন্ত বাধ্যতামূলকভাবে ৯০ দিনের মধ্যে শেষ করা এবং মামলার বিচারকাজ ১২০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করার আইনি বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। এ ছাড়া কোনো ব্যক্তি টানা পাঁচ বছর নিখোঁজ থাকলে তার পরিবার আদালত থেকে একটি ‘গুম সনদ’ পাবে, যার মাধ্যমে উত্তরাধিকারীরা সম্পত্তি হস্তান্তর ও ব্যাংকিং লেনদেনের আইনি অধিকার পাবেন।

কিন্তু এই আইনের সবচেয়ে বড় এবং বিতর্কিত রদবদলটি ঘটেছে তদন্তের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে, যেখানে ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে গুমের ঘটনা তদন্তের প্রাথমিক দায়িত্ব জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে দেয়ার প্রস্তাব করা হলেও, ২০২৬ সালের নতুন খসড়ায় কমিশনকে এই প্রক্রিয়া থেকে সম্পূর্ণ বাদ দেয়া হয়েছে। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী তদন্তের দায়িত্বকে দু’টি ভাগে ভাগ করে সরকারি কোনো সংস্থার মাধ্যমে বিস্তৃত, পরিকল্পিত ও পদ্ধতিগত গুমের তদন্ত ও বিচারের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে (আইসিটি)। অন্য দিকে সরকারি বাহিনীর সম্পৃক্ততাহীন বিচ্ছিন্ন কোনো সাধারণ গুমের তদন্তভার দেয়া হয়েছে পুলিশের ওপর, যার বিচার হবে সাধারণ জেলা ও দায়রা জজ আদালতে।

সরকার যখন এই নতুন আইনকে সাজার মেয়াদ বৃদ্ধি ও তদন্তের পরিধি বাড়িয়ে অধিকতর শক্তিশালী দাবি করছে, ঠিক তখনই এই খসড়ার ভেতরে থাকা গভীর বৈপরীত্য ও নীতিগত দ্বন্দ্বটি ফাঁস করে দিয়েছেন বিদায়ী পাঁচজন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনার মো: নূর খান, বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, ইলিরা দেওয়ান, অধ্যাপক মো: শরীফুল ইসলাম এবং ড. নাবিলা ইদ্রিস। এক খোলা চিঠিতে সাবেক কমিশনাররা সরকারের অবস্থানকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেখিয়েছেন যে, সংসদে অধ্যাদেশগুলো বাতিলের পক্ষে সরকারের উত্থাপিত প্রধান যুক্তিগুলো আসলে ‘ভুল তথ্য’ ছিল। সংসদে দাবি করা হয়েছিল গুম অধ্যাদেশে সাজা ছিল মাত্র ১০ বছর এবং এতে তদন্তের সময়সীমা ছিল না; যা বাস্তবে সম্পূর্ণ অসত্য। কারণ, ২০২৫ সালের মূল অধ্যাদেশের ৪(১)-(২) ধারা অনুযায়ী অপরাধের মাত্রাভেদে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড আগের অধ্যাদেশেই স্পষ্ট ছিল, সরকার মূলত সর্বনিম্ন সাজা ১০ বছর করার নতুন প্রস্তাব এনেছে। সাবেক কমিশনাররা উল্টো সতর্ক করে বলেছেন, সংসদ কর্তৃক পূর্বের অধ্যাদেশটি বাতিল করার কারণে গত ১১ এপ্রিল থেকে দেশে কোনো নতুন গুম হলে, সেটি এখন প্রচলিত ফৌজদারি আইনে অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িতই নয়, যার ফলে এক ভয়াবহ আইনি শূন্যতা তৈরি হয়েছে।

সাবেক কমিশনারদের গভীর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সরকারের মূল নীতিগত লক্ষ্য হলো মানবাধিকার কমিশনের আইনগত স্বাধীনতা খর্ব করা, একে পুনরায় আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে ফিরিয়ে নেয়া এবং নিরাপত্তা বাহিনীর তদন্তে সরকারের পূর্বানুমতির কালো আইন বহাল রাখা। সংসদ কর্তৃক পুনর্বহালকৃত ২০০৯ সালের মূল আইনে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্ত করার কোনো ক্ষমতাই কমিশনের নেই। ফলে নতুন খসড়ায় তদন্তের দায়িত্ব পুনরায় পুলিশের হাতে দেয়া মানে ‘যেই লাউ সেই কদু’ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। বিগত ১৫ বছরে গুমের অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে, সেই বাহিনীর সদস্যরা নিজেদের অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত করবে; এমন আশা করা অবাস্তব। এর ফলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অগ্রগামী যোদ্ধারাই ভবিষ্যতে চরম রাজনৈতিক ঝুঁকিতে পড়বেন, কারণ কোন মৃত্যু রাজনৈতিক প্রতিরোধ আর কোনটি বিশৃঙ্খলার সুযোগে হত্যা, তা নির্ধারণের ক্ষমতা স্বাধীন কমিশনের হাত থেকে এখন পুলিশের কাছে চলে গেছে।

এ ছাড়া নতুন খসড়া থেকে আন্তর্জাতিক সনদের উদ্ধৃতি সচেতনভাবে বাদ দেয়া হয়েছে, যা বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থানকে দুর্বল করবে।

এই খসড়াটি হুবহু পাস হলে তা মূলত বাহিনীর কমান্ডার বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এক ধরনের পরোক্ষ দায়মুক্তির রাস্তা তৈরি করতে পারে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মো: তাজুল ইসলাম, অন্তর্বর্তী সরকারের গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সদস্য মো: সাজ্জাদ হোসেন এবং মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটনও এই রিপোর্টারের কাছে একই ধরনের গুরুতর আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, প্রারম্ভিক অনুসন্ধান সংস্থা না থাকায়, প্রভাবশালী কোনো অভিযুক্ত প্রথম শুনানিতেই মামলাটিকে আইসিটির এখতিয়ারভুক্ত দাবি করে সাধারণ আদালতের বিচারপ্রক্রিয়া বছরের পর বছর স্থবির করে দিতে পারেন।

ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠিত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিগত ১৫ বছরে অন্তত এক হাজারেরও বেশি নাগরিক গুমের শিকার হয়েছেন। বিদায়ী কমিশনাররা তাদের চিঠির শেষে যে অমোঘ প্রশ্নটি রেখেছেন, সেটিই এখন পুরো দেশের মানুষের প্রশ্ন যে পরিবারগুলো এখনো দরজায় কান পেতে আছে, তারা বহু অমূলক আশ্বাস শুনেছে; ‘এখন আমাদের কি হবে?’ এই প্রশ্নের জবাব মুখের কথায় নয়, দিতে হবে আন্তর্জাতিক মানের শক্তিশালী ও কার্যকর আইন প্রণয়নের মাধ্যমে। আইনমন্ত্রীর দেয়া আশ্বাসের বাস্তব প্রতিফলন এবং নতুন আইনের চূড়ান্ত বিলে বিশেষজ্ঞদের এই তীব্র উদ্বেগগুলো সরকার কতটা আমলে নেয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া নয়া দিগন্তকে বলেন, কেবল মানবাধিকার কমিশন, গুম প্রতিরোধ নয়, দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলোও যদি একই পরিণতি বরণ করে, তবে তা হবে দেশের শাসনকাঠামো সংস্কারের ক্ষেত্রে এক বড় পশ্চাদপসরণ। ক্ষমতার পৃথকীকরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠার যে বিপুল কর্মযজ্ঞ ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানের পর হাতে নেয়া হয়েছিল, তা শুরুতেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। কারণ ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতাই পারে একটি গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন করতে।