নয়া দিগন্ত প্রতিবেদন
অনিয়ম আর ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগের পরও নির্দিষ্ট একটি পরিবারের মালিকানাধীন চারটি প্রতিষ্ঠানের কাছেই জিম্মি হয়ে পড়েছে দেশের সরকারি পাঠ্যবইয়ের মান যাচাইয়ের কাজ। কালো তালিকার এই চারটি প্রতিষ্ঠান আগামী বছরেও প্রয়োজনে বিনামূল্যে কাজ করতে রাজি বলে জানা গেছে। সূত্র জানায়, যেকোনো মূল্যে কাজ পেয়ে তারা পাঠ্যবই মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে ফাঁদে ফেলে কোটি টাকা লোপাট করে। বিগত দিনে এমন অনেক অভিযোগও ছিল তাদের বিরুদ্ধে।
এ দিকে চলতি ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যের পাঠ্যবইয়ের মান যাচাইয়ের কাজে ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের কাছে থেকে লাখ লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে খারাপ বইকেও ভালো বলে সার্টিফিকেট দেয় এই প্রতিষ্ঠানগুলো। একইসাথে চাহিদামতো ঘুষ না পেলে ভালো ও মানসম্পন্ন বইও তারা খারাপ বলে আটকে দেয়। আর এমনই এক অভিযোগে ২০২৫ সালে হাইটেক নামের একটি পরিদর্শন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একাধিক মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে (এনসিটিবি) লিখিত অভিযোগও করেছিল। পরে প্রতিষ্ঠানটিকে সতর্ক করা হয়েছিল।
সূত্র জানায়, এই পরিবারের সবাই আগে থেকেই আওয়ামী লীগ সরকারের আনুকূল্য পেয়ে একচেটিয়াভাবে এনসিটিবির পাঠ্যবইয়ের মান যাচাইয়ের কাজ করে আসছে। তবে ২০২৪ সালে হাসিনা সরকারের পলায়নের পর এখন ভোল পাল্টিয়ে তারা কৌশলে কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে বইয়ের মান যাচাই তথা ইন্সপেকশনের কাজ ভাগিয়ে নিয়েছে।
সূত্র আরো জানায় প্রেসপাড়ায় দক্ষিণ বঙ্গের শেখ পরিবার হিসেবে পরিচিত বিশাল এক সিন্ডিকেটে বন্দী প্রি-ডেলিভারি ইন্সপেকশন (পিডিআই) এবং পোস্ট ল্যান্ডিং ইন্সপেকশন (পিএলআই))। তাদের ভিন্ন ভিন্ন নামে চার প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বিগত কয়েক বছরের তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায় পিডিআই ও পিএলআইর কাজ পাচ্ছে একটি সিন্ডিকেট। এর মধ্যে এক পরিবারের তিন ভাই ও ভগ্নিপতি মিলে চারটি তদারকি প্রতিষ্ঠান খুলেছেন। তারা নানাভাবে এসব অনিয়ম করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।
সূত্র জানায়, এর মধ্যে শেখ ট্রেডিংয়ের মালিক শেখ রাফি মাহমুদ বিপ্লব, ইনডিপেনডেন্টের মালিক শেখ বেলাল হোসেন ও কন্ট্রোল ইউনিয়ন বিডির শেখ বদরুল আপন তিন ভাই। তাদের ভগ্নিপতি সালাম মোল্লা হাইটেকের মালিক। তথ্যমতে, এক সময় কন্টিনেন্টাল বিডি নামে একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন শেখ বেলাল হোসেন। পরে সেখান থেকে বের হয়ে ইনডিপেনডেন্ট ইন্সপেকশনের লাইসেন্স নেন; তারপর অন্য ভাইদেরও নামান এ ব্যবসায়। বর্ণশোভা নামে তাদের একটি প্রেসও রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে শেখ রাফি মাহমুদ বিপ্লব গতকাল নয়া দিগন্তকে জানান, আমাদের কাজের বিষয়ে কোনো অভিযোগ নেই। কেননা আমরা বিএসটিআই থেকে কাজের ছাড়পত্র নিয়েই পরিদর্শন করি। বিনামূল্যে বা টেন্ডারের প্রাক্কলিত দরের চেয়ে কমে কাজ করার বিষয়ে তিনি বলেন, আগেতো আরো কম দামে কাজ করা হয়েছে। আমরা মাত্র দুই লাখ কমে এবার কাজ করেছি। একই পরিবারের একাধিক প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের মালিকানা ভিন্ন ভিন্ন; লাইসেন্সও আলাদা।
এনসিটিবি সূত্র জানায়, বিনামূল্যের পাঠ্যবই ছাপার কাগজ কেনা থেকে শুরু করে মুদ্রণ, বাঁধাই হয়ে শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে দফায় দফায় যাচাই করা হয়। তার পরও প্রতি বছর কোটি কোটি বইয়ের মান নিয়ে ওঠে প্রশ্ন। কিন্তু কেন এই ছাপার মান খারাপ হচ্ছে সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখা যায় এনসিটিবি বইয়ের প্রি-ডেলিভারি ইন্সপেকশন (পিডিআই) ও পোস্ট ল্যান্ডিং ইন্সপেকশনের (পিএলআই) জন্য যে দুই প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেয়, তারাই জড়িত এই কারসাজিতে। অর্থাৎ এনসিটিবির তদারকি প্রতিষ্ঠানই ‘সর্ষের মধ্যে ভূত’ হয়ে বসে আছে। প্রতিষ্ঠান দু’টি প্রেস মালিকদের সাথে আঁতাত করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিম্নমানের বইয়ের বৈধতা দেয়। ফলে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের হাতে ওঠে নিম্নœমানের বই। এ ছাড়া অস্তিত্বহীন প্রেসও নিম্নœমানের বই ছাপিয়ে হাতিয়ে নেয় কোটি কোটি টাকা।
এ দিকে পরিদর্শক প্রতিষ্ঠানের এই অনিয়ম আর দুর্নীতির বিষয়ে এনসিটিবি জানিয়েছে শুধু পরিদর্শন কোম্পানির ওপরেই নির্ভর করা হবে না। এখন থেকে এনসিটিবি নিজেও বইয়ের মান যাচাইয়ের কাজ করবে। যাতে নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠান অনিয়ম ঘুষ-দুর্নীতিতে জড়িয়ে না পড়তে পারে। একইসাথে এই কারসাজির ফাঁদ থেকে রক্ষা পেতে তৃতীয় পক্ষকে দিয়ে পিএলআই না করে নিজেরাই বই সংগ্রহ করে মান যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এনসিটিবি।



