শাহজালাল থার্ড টার্মিনালে দরকার ৯০২ কোটি টাকা

সংসদে বিমানমন্ত্রী

Printed Edition

সংসদ প্রতিবেদক

  • ১৪৯৮টি স্পট নিয়ে চূড়ান্ত হচ্ছে সমন্বিত পর্যটন মহাপরিকল্পনা

হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল নির্মাণে অতিরিক্ত ৯০০ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দের যৌক্তিকতা জাতীয় সংসদে তুলে ধরেছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। গতকাল রোববার সংসদে বিরোধীদলের সদস্য হান্নান মাসউদ প্রশ্ন করেন, থার্ড টার্মিনালের প্রাক্কলিত ব্যয় ১৩ হাজার কোটি টাকা থেকে কয়েক দফা বৃদ্ধি পেয়ে ২১ হাজার ৩০০ কোটি টাকায় পৌঁছায়। সেখানে মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) দফতর তদন্ত করে প্রায় ৪ হাজার ৪৬৯ কোটি টাকার অনিয়ম শনাক্ত করেছে এবং ঠিকাদারের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের সুপারিশ করা সত্ত্বেও কাজের প্রায় ৯৯.৯১ শতাংশ শেষ হওয়ার পর শেষ মুহূর্তে পুনরায় ৯০২ কোটি টাকা বৃদ্ধি করা ঠিকাদারকে দুর্নীতির সুযোগ করে দেয়ার শামিল কিনা?

জবাবে বিমানমন্ত্রী বলেন, বিগত সরকারের আমলে শুধু ভবন উদ্বোধন করেই কাজ শেষ বলে চালিয়ে দেয়ার একটা প্রবণতা ছিল। কিন্তু বাস্তবে থার্ড টার্মিনালের মেশিনারিজ ও প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সঙ্কেত বা সংযোজন সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো অসম্পূর্ণ অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছিল। টার্মিনালে প্রায় ২.১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের রাষ্ট্রীয় সম্পদ পড়ে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। এর ফলে সরকার এক দিকে এটি ব্যবহার করতে পারছিল না, অন্য দিকে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকার কাছ থেকে নেয়া ঋণের বড় অঙ্কের কিস্তি ইতোমধ্যে পরিশোধ করা শুরু হলেও অবকাঠামো সচল না থাকায় কোনো আয় হচ্ছিল না।

মন্ত্রী জানান, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর সার্বিক হিসাব-নিকাশ পর্যালোচনা করে দেখেছে যে কাজ চূড়ান্তভাবে সম্পন্ন করা, ঠিকাদারের পূর্বে থাকা কিছু বকেয়া পরিশোধ এবং অন্যান্য সংস্থার বকেয়া মিটিয়ে অবকাঠামো চালুর জন্য স্বচ্ছতার ভিত্তিতেই ৯০২ কোটি টাকার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। এই অর্থ অনুমোদন দেয়া না হলে সুবিশাল টার্মিনালটি পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়ে থাকত, যা জাতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হতো। অতিরিক্ত এই বরাদ্দ অনুমোদন হলে খুব দ্রুতই টার্মিনালটি চালু করা সম্ভব হবে এবং বর্তমান ১.২ মিলিয়ন যাত্রীর জায়গায় দ্বিগুণ যাত্রী সেবা দেয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে, যা থেকে প্রাপ্ত আয় দিয়ে জাইকার ঋণ সহজেই পরিশোধ করা যাবে।

অপর এক সম্পূরক প্রশ্নে বিমানের অতিরিক্ত ভাড়া ও টিকিট কালোবাজারি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সদস্য মুজিবুর রহমান বলেন, অভ্যন্তরীণ রুটে বিমান ভাড়া হঠাৎ ৬ হাজার টাকা থেকে লাফিয়ে দ্বিগুণ বা ১২ হাজার টাকায় পৌঁছে যায়, যা যাত্রীসাধারণের জন্য মারাত্মক অসহনীয় ও অস্বাভাবিক। জবাবে বিমানমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে কিছুটা ভুল বোঝাবুঝি রয়েছে, কারণ কোনো সাধারণ ওয়ান-ওয়ে টিকিটের দাম কখনো ১২ হাজার টাকা স্পর্শ করেনি। সাধারণত রিটার্ন টিকিটের দাম বা বিশেষ ট্যাক্সসহ খরচ হিসাব করলে এটি সাময়িকভাবে বেড়ে যায়। কোনো কোনো সময় টিকিটের কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করে শেষ মুহূর্তে একশ্রেণীর অসাধু চক্র টিকিট কালোবাজারির অপচেষ্টা চালায়। কালোবাজারি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে সরকার দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিচ্ছে এবং যাত্রীরা ভবিষ্যতে কখনই নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে টিকিট কিনবেন না।

টিকিট সিন্ডিকেট বন্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ : এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, বিমান টিকিটের অনিয়ম, কৃত্রিম সঙ্কট এবং সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে সরকার। প্রবাসী কর্মীদের জন্য বিমানভাড়া সহনীয় রাখতে ট্রাভেল এজেন্সি আইন ও বেসামরিক বিমান চলাচল আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। একই সাথে টিকিটের কালোবাজারি রুখতে এখন থেকে বিমানে যাত্রার টিকিটে সংশ্লিষ্ট ট্রাভেল এজেন্সির নাম, লাইসেন্স নম্বর ও প্রকৃত বিক্রয়মূল্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। মন্ত্রী জানান, যাত্রীদের স্বার্থ রক্ষা ও টিকিট বিক্রিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সরকার ইতোমধ্যে ১০ দফা সম্বলিত একটি পরিপত্র জারি করেছে। এর নির্দেশনা অনুযায়ী, সব ট্রাভেল এজেন্সিকে বিমান টিকিটে তাদের নাম, লাইসেন্স নম্বর এবং টিকিটের বিক্রয়মূল্য স্পষ্টাক্ষরে লিখতে হবে।

হজের বিমানভাড়া আরো কমানোর চিন্তাভাবনা চলছে : হজযাত্রীদের বিমান ভাড়া আরো কমানোর বিষয়ে চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। সংসদ সদস্য হেলেন জেরিন খানের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান।

মন্ত্রী বলেন, ‘হজের জন্য বিমান ভাড়া প্রায় দুই লাখ টাকা ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার প্রথম অবস্থায় সেটি কমিয়ে এক লাখ ৬৫ হাজার টাকা করেছিল। আমরা গতবার প্রথম হজ পেয়েছি। তখন হিসাব করে এক লাখ ৫৪ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া নির্ধারণ করতে পেরেছিলাম।’ তিনি বলেন, ‘এবার ডাইনামিক প্রাইসিংয়ের মাধ্যমে হিসাব করে হজের বিমান ভাড়া এক লাখ ৩০ হাজার টাকা করা হয়েছে। আগামী দিনে আরো কমানোর জন্য চিন্তাভাবনা করব।’ মন্ত্রী বলেন, বিমান কেনার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। পাশাপাশি বিমানের রুটগুলো সম্পূর্ণভাবে চালু হলে আয়ও বাড়বে। তখন হজযাত্রীদের বিমান ভাড়া আরো কমানোর বিষয়ে চিন্তা করা হবে।

১৪৯৮টি স্পট নিয়ে চূড়ান্ত হচ্ছে সমন্বিত পর্যটন মহাপরিকল্পনা : সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য শওকত আরা আক্তারের প্রশ্নের জবাবে বেসামরিক বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত জানিয়েছেন, দেশী-বিদেশী পর্যটকদের আকর্ষণ করতে এবং দেশের সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্রগুলোকে সুপরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে ব্যাপক কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। ইতোমধ্যে ‘জাতীয় পর্যটন নীতিমালা ২০২৬’ প্রণয়নের আনুষ্ঠানিক কাজ শুরু হয়েছে। একই সাথে সারা দেশের সম্ভাব্য প্রায় ১৪৯৮টি পর্যটন স্থান চিহ্নিত করে একটি যুগোপযোগী ও সমন্বিত পর্যটন মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত করার কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

‘ইন্টেরিম সাত দিনে পারে, আমাদের সরকার ছয় মাসে পারে না কেন’ : ‘ইন্টেরিম গভর্নমেন্ট যদি একদিন বা সাত দিনে পারে, তাহলে আমাদের সরকারের ছয় মাস অতিবাহিত হচ্ছে, একটি প্রক্রিয়া সহজীকরণ করতে আর কতদিন লাগবে?’ এমন প্রশ্ন তুলেছেন বগুড়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো: মোশারফ হোসেন। শিক্ষিত বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে ই-টেন্ডার প্রক্রিয়া সহজীকরণের দাবি জানিয়ে ৭১বিধিতে দেয়া নোটিশে তিনি জানতে চান, সরকার এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে আর কত সময় নেবে? জবাবে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী আবদুল মঈন খান বলেন, জনগণের স্বার্থে বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। তবে আইন ও বিধি অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।

এ সময় স্পিকারের দায়িত্বে থাকা ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ‘মাননীয় মন্ত্রী, ছয় মাস চলে গেল, আর কয় মাস লাগবে?’

সম্পূরক প্রশ্ন করার সুযোগ পেয়ে মো: মোশারফ হোসেন বলেন, গত ১৭ থেকে ২০ বছরে অনেক শিক্ষিত যুবক বেকার হয়ে পড়েছেন। তাদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। এই প্রক্রিয়া সহজীকরণ করা উচিত বলে আমি মনে করি।

পরে সরকারদলীয় চিফ হুইপ স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আইনমন্ত্রীকে নোটিশের বিষয়ে আরো বলার সুযোগ চান। জবাবে আইনমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান বলেন, ‘ভালো কাজ করতে গেলে অনেক সময় একটু সময় লাগে। আইন অনুসরণ করতে হয়, নিয়ম-কানুনের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। তাড়াহুড়ো করে আমরা যদি কোনো আইনের ব্যত্যয় করি, তাহলে কিন্তু আমরা এই দেশবাসীর কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকব।’ আইনমন্ত্রী বলেন, ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলসকে যুগোপযোগী করে এই সমস্ত সিন্ডিকেট এবং সিন্ডিকেটের যে ব্যারিকেড দেয়া আছে, সব ভাঙার জন্য’ কাজ করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীকে নিয়ে কয়েক দফা বৈঠক করে একটি খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। অচিরেই সেইটা পার্লামেন্টের সামনে আসবে। আসলে আমরা ডিউ প্রসেসে এই সিন্ডিকেট ভাঙার ব্যবস্থা করব বলে আশা করছি, ইনশাআল্লাহ। আমরা খুব অতি দ্রুতই ওই সিন্ডিকেট ভাঙার যে আইন, আইনি প্রক্রিয়ায় আমরা এটা মোকাবেলা করব।’

ই-কমার্সে গ্রাহকের পাওনা হাজার হাজার কোটি টাকা : দেশের ই-কমার্স খাত ধারণার চেয়েও দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি গ্রাহক প্রতারণা ও অনিয়মের পরিমাণ ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। এই অবস্থায় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর জালিয়াতি বন্ধ করতে এবং সমস্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে একটি জবাবদিহিমূলক আইনি কাঠামোর আওতায় আনতে তিন ধাপের নীতিগত পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। গতকাল কার্যপ্রণালী বিধির ৭১ বিধি অনুসারে জন-গুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে সংসদ সদস্য মো: রাশেদুল ইসলাম রাশেদ উত্থাপিত এক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এ তথ্য জানান। মন্ত্রী জানান, ই-কমার্স খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে জাতীয় ডিজিটাল কমার্স নীতিমালা প্রণয়ন, ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা এবং ডিজিটাল বিজনেস আইডেন্টিটি নিবন্ধন নির্দেশিকা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন শুরু করেছে। বিগত সময়ে দেশের বিভিন্ন বহুল আলোচিত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের সাথে বিপুল অঙ্কের আর্থিক কেলেঙ্কারি ঘটায়। এর মধ্যে ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ, কিউকম, ধামাকা শপিং ও আলেশা মার্টসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরে বিপুল সংখ্যক অভিযোগ জমা পড়েছে।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের পরিসংখ্যান তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, প্রতারিত গ্রাহকরা বিভিন্ন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অধিদফতরে এ পর্যন্ত সর্বমোট ৫৮ হাজার ৭২০টি অভিযোগ দাখিল করেছেন। ভুক্তভোগী গ্রাহক ও বিক্রেতাদের দাখিলকৃত এসব লিখিত অভিযোগের বিপরীতে দাবিকৃত মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় তিন হাজার ৮৬৯ কোটি টাকা। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ডিজিটাল বাণিজ্য সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং গ্রাহকদের পাওনা অর্থ উদ্ধারের প্রক্রিয়া তদারকি করতে কাজ করে যাচ্ছে।