আযাদ আলাউদ্দীন
‘বধু বরণের নামে দাঁড়িয়েছে মহা মাতৃকূল, গাঙের ঢেউয়ের মতো বলো কন্যা কবুল, কবুল’ (সোনালি কাবিন)
আজ ১১ জুলাই বাংলা সাহিত্যের খ্যাতিমান কবি আল মাহমুদের ৯০তম জন্মবার্ষিকী। তাঁর পুরো নাম মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদ। তবে আল মাহমুদ নামেই তিনি অধিক পরিচিত। আল মাহমুদ একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, ছোটগল্প লেখক, শিশুসাহিত্যিক এবং সাংবাদিক ছিলেন। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়াংশে সক্রিয় থেকে তিনি আধুনিক বাংলা কবিতাকে নতুন আঙ্গিকে, চেতনায় ও বাক্ভঙ্গিতে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করেছেন।
১৯৫০-এর দশকে যে কয়েকজন লেখক বাংলা ভাষা আন্দোলন, জাতীয়তাবাদ, রাজনীতি, অর্থনৈতিক নিপীড়ন এবং সরকারবিরোধী আন্দোলন নিয়ে লিখেছেন তাদের মধ্যে আল মাহমুদ অন্যতম। লোক লোকান্তর (১৯৬৩), কালের কলস (১৯৬৬), সোনালী কাবিন (১৯৭৩), মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো ইত্যাদি তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। কবি আল মাহমুদ তার অনবদ্য গল্প ও উপন্যাসের জন্যও খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।
আল মাহমুদ ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মোড়াইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মীর আবদুর রব ও মাতা রওশন আরা মীর। আল মাহমুদ বেড়ে উঠেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। তিনি মধ্যযুগীয় প্রণয়োপাখ্যান, বৈষ্ণব পদাবলি, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল প্রমুখের সাহিত্য পাঠ করে ঢাকায় আসার পর কাব্য সাধনা শুরু করেন এবং ষাটের দশকেই স্বীকৃতি ও পাঠকপ্রিয়তা লাভ করেন।
সংবাদপত্রে লেখালেখির সূত্র ধরে ১৯৫৪ সালে আল মাহমুদ ঢাকা আগমন করেন। সমকালীন বাংলা সাপ্তাহিক পত্র/পত্রিকার মধ্যে কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী সম্পাদিত ও নাজমুল হক প্রকাশিত সাপ্তাহিক কাফেলা পত্রিকায় লেখালেখি শুরু করেন। পাশাপাশি তিনি দৈনিক মিল্লাত পত্রিকায় প্রুফ রিডার হিসেবে সাংবাদিকতা জগতে পদচারণা শুরু করেন। ১৯৫৫ সাল কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী ‘কাফেলা’ পত্রিকার চাকরি ছেড়ে দিলে তিনি সেখানে সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। দৈনিক ইত্তেফাকে মফস্বল বার্তা সম্পাদক হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেন আল মাহমুদ।
১৯৭১ সালে তিনি মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। যুদ্ধের পরে দৈনিক গণকণ্ঠে প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। সম্পাদক থাকাকালে সরকারের বিরুদ্ধে লেখার কারণে এক বছরের জন্য কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়।
১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি গল্প লেখার দিকে মনোযোগী হন। ১৯৭৫ সালে তার প্রথম ছোটগল্প গ্রন্থ ‘পানকৌড়ির রক্ত’ প্রকাশিত হয়। একই সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের সহপরিচালক পদে নিয়োগ পান তিনি। দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের পর তিনি শিল্পকলার পরিচালক হন এবং ১৯৯৩ সালে অবসর গ্রহণ করেন।
ঢাকা থেকে প্রকাশিত সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত ‘সমকাল’ পত্রিকা এবং কলকাতার নতুন সাহিত্য, চতুষ্কোণ, ময়ূখ ও কৃত্তিবাস ও বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকায় লেখালেখির সুবাদে ঢাকা-কলকাতার পাঠকদের কাছে তার নাম পরিচিত হয়ে ওঠে। কাব্যগ্রন্থ লোক লোকান্তর (১৯৬৩) সর্বপ্রথম তাকে স্বনামধন্য কবিদের সারিতে জায়গা করে দেয়। ১৯৯৩ সালে বের হয় তার প্রথম উপন্যাস ‘কবি ও কোলাহল’।
তিনি আধুনিক বাংলা কবিতার নগরকেন্দ্রিক প্রেক্ষাপটে ভাটি বাংলার জনজীবন, গ্রামীণ আবহ, নদীনির্ভর জনপদ, চরাঞ্চলের জীবনপ্রবাহ এবং নরনারীর চিরন্তন প্রেম-বিরহকে তার কবিতায় অবলম্বন করেন।
১৯৬৮ সালে ‘লোক লোকান্তর’ ও ‘কালের কলস’ নামে দু’টি কাব্যগ্রন্থের জন্য তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। তার সবচেয়ে সাড়া জাগানো সাহিত্যকর্ম ‘সোনালি কাবিন’।
উল্লেখযোগ্য প্রকাশিত গ্রন্থ
লোক লোকান্তর (১৯৬৩), কালের কলস (১৯৬৬), সোনালি কাবিন (১৯৭৩), মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো (১৯৭৬), আরব্য রজনীর রাজহাঁস, বখতিয়ারের ঘোড়া, অদৃশ্যবাদীদের রান্নাবান্না, ঝবষবপঃবফ চড়বসং - অষ গধযসঁফ (১৯৮১), দিনযাপন, দ্বিতীয় ভাঙন, একটি পাখি লেজ ঝোলা, পাখির কাছে ফুলের কাছে, আল মাহমুদের গল্প, গল্পসমগ্র, প্রেমের গল্প, যেভাবে বেড়ে উঠি (আত্মজীবনী), কিশোর সমগ্র, কবির আত্মবিশ্বাস, কবিতাসমগ্র, কবিতাসমগ্র-২, পানকৌড়ির রক্ত (গল্পগ্রন্থ), সৌরভের কাছে পরাজিত, গন্ধ বণিক, ময়ূরীর মুখ, না কোনো শূন্যতা মানি না, নদীর ভেতরের নদী, প্রেম ও ভালোবাসার কবিতা, প্রেম প্রকৃতির দ্রোহ আর প্রার্থনা কবিতা, প্রেমের কবিতা সমগ্র, উপমহাদেশ, বিচূর্ণ আয়নায় কবির মুখ, কবিতার জন্য সাত সমুদ্র, উপন্যাস সমগ্র-১, উপন্যাস সমগ্র-২, উপন্যাস সমগ্র-৩, তোমার গন্ধে ফুল ফুটেছে (২০১৫) ছায়ায় ঢাকা মায়ার পাহাড় (রূপকথা), ত্রিশেরা, উড়াল কাব্য। কবি আল মাহমুদের একমাত্র মহাকাব্য ‘এ গল্পের শেষ নেই শুরুও ছিল না’। বইটি প্রকাশ করেছে সরলরেখা প্রকাশনা সংস্থা।
পুরস্কার ও সম্মাননা
বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৮), জয় বাংলা পুরস্কার (১৯৭২), হুমায়ূন কবীর স্মৃতি পুরস্কার (১৯৭২), জীবনানন্দ স্মৃতি পুরস্কার (১৯৭২), কাজী মোতাহার হোসেন সাহিত্য পুরস্কার (১৯৭৬), কবি জসীমউদদীন পুরস্কার, ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৬), একুশে পদক (১৯৮৬), নাসির উদ্দিন স্বর্ণপদক (১৯৯০), ভানুসিংহ সম্মাননা পদক (২০০৪), লালন পুরস্কার (২০১১) বাসাসপ কাব্যরতœ (২০১৭) প্রভৃতি।
‘কবি আল মাহমুদ ইনস্টিটিউট ও কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠার দাবি’
ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি জানান, কবি আল মাহমুদের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তিন দিনব্যাপী আল মাহমুদ স্মরণোৎসব চলছে। গত বৃহস্পতিবার কবির কবর জিয়ারত ও ফাতেহা পাঠের মধ্য দিয়ে কর্মসূচির সূচনা হয়। পরে শহরের নিয়াজ মুহাম্মদ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে স্মরণোৎসবের উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক মো: আবু সাঈদ।
স্মরণোৎসবের দ্বিতীয় দিন গতকাল শুক্রবার সকালে কবিতা পাঠ, স্কুল-কলেজ পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ এবং বিকেল ও রাতে যথাক্রমে ‘গদ্য সাহিত্যে আল মাহমুদ’ ও ‘কবিতায় আল মাহমুদ’ শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
আজ সমাপনী দিন (শনিবার) বিকেলে কবিতা পাঠ, আলোচনা সভা এবং স্কুল পর্যায়ের কুইজ প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠিত হবে। সন্ধ্যা ৬টায় বাংলা সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক কবি আব্দুল হাই সিকদারের হাতে ‘সোনালী কাবিন পদক-২০২৬’ তুলে দেয়া হবে। পরে অনুষ্ঠিত হবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
এ ছাড়া আজ কবি আল মাহমুদ স্মৃতি সংসদের উদ্যোগে কবির কবর জিয়ারত ও শহরের কাউতলি এলাকায় পৃথক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।
এ দিকে, কবির জন্মবার্ষিকীতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে যথাযথ কর্মসূচি না থাকায় আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন কবিভক্ত, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা। তাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন নানা কারণে অবহেলিত হলেও সময়ই আল মাহমুদের সাহিত্যিক মহিমাকে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় তার বহু কবিতার পঙ্ক্তি রাজপথ, দেয়াললিখন, গ্রাফিতি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে উচ্চারিত হয়, যা নতুন প্রজন্মের কাছে তার কবিতার প্রাসঙ্গিকতাকে আরো উজ্জ্বল করে তোলে।
তারা বলেন, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে আল মাহমুদের অবদান সংরক্ষণ এবং তার সাহিত্য নিয়ে উচ্চতর গবেষণার স্বার্থে রাষ্ট্রীয়ভাবে ঢাকায় ‘কবি আল মাহমুদ ইনস্টিটিউট’ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আল মাহমুদ কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠা, তার রচনাবলি পাঠ্যক্রমে যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করা এবং জাতীয়ভাবে তার জন্মবার্ষিকী পালনের উদ্যোগ নেয়া সময়ের দাবি।



