প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির পূর্বশর্ত

Printed Edition

কূটনৈতিক প্রতিবেদক

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির পূর্বশর্ত দিয়েছে বাংলাদেশ। আর এই অনুকূল পরিবেশের জন্য শেখ হাসিনাসহ অন্যান্য পলাতক আসামিদের বাংলাদেশের কাছে প্রত্যর্পণ এবং ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শহীদ ওসমান হাদি হত্যাকারীদের বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে হবে। সফরের সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে এসব ব্যাপারে ভারতের প্রতিক্রিয়ার জন্য বাংলাদেশ অপেক্ষা করবে।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের দিন গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা তারেক রহমানের কাছে একটি চিঠি হস্তান্তর করেন। চিঠিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে স্বপরিবারে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানান। পরে ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী এই সফর বাস্তবায়নের জন্য তৎপর হয়ে ওঠেন। সম্প্রতি তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাতের পরদিনই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে বৈঠক করেন। এরপর ভারতীয় মিডিয়া আগামী ২১ ও ২২ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের দিনক্ষণ নিয়ে সংবাদ প্রচার করে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের এই সম্ভাব্য তারিখের মাত্র পাঁচ দিন আগে ‘অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির’ পূর্বশর্ত দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান সার্বিক প্রক্রিয়ায় অনিশ্চয়তার প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে।

গতকাল রোববার দুপুরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম একটি সংক্ষিপ্ত ব্রিফিংয়ে জানান, দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় সফর নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের কর্মকর্তারা গত বেশ কিছু দিন ধরে আলোচনা করছেন। তবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত শেখ হাসিনার গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে প্রকাশ্যে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন এই প্রচেষ্টায় কালো ছায়া ফেলেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে বাংলাদেশের অবস্থান ইতোমধ্যে পরিষ্কার করেছে।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। এর পরিপ্রেক্ষিতে শেখ হাসিনাসহ অন্যান্য পলাতক আসামিদের বাংলাদেশের কাছে প্রত্যর্পণ ত্বরান্বিত করার জন্য আমরা ভারতের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছি। একই সাথে প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় আমরা শহীদ ওসমান হাদি হত্যাকারীদের বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরের আহ্বান জানিয়েছি। এ সব ব্যাপারে ভারতের প্রতিক্রিয়ার জন্য আমরা অপেক্ষা করছি।

মুখপাত্র বলেন, আমরা ‘বাংলাদেশ প্রথম’ নীতি অনুসরণ করে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোসহ অন্যান্য দেশের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ করে যাব। এর ভিত্তি হবে সার্বভৌম সমতা, জাতীয় মর্যাদা, অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করা এবং পারস্পরিক লাভজনক সম্পর্ক।

ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্নের উত্তর দেয়া হয়নি।

সরকার প্রধান পর্যায়ে ভিভিআইপি সফরের আগে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো ধারাবাহিকভাবে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়ে থাকে এবং এ জন্য এক থেকে দেড় মাস আগেই প্রস্তুতি শুরু হয়। এসব পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশের সাথে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার ইস্যুগুলো নির্ধারণ করা এবং বাংলাদেশের কাছে সংশ্লিষ্ট দেশের প্রত্যাশাগুলো সম্পর্কে সরকারের অবস্থান তুলে ধরা। এরপর দুই দেশের পররাষ্ট্র সচিব বা মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে দুই পক্ষের অগ্রাধিকার নিয়ে আলোচনা করে শীর্ষ বৈঠকের আলোচ্যসূচি নির্ধারণ করা। এ ছাড়া সফরের আগে সরকার প্রধানের নিরাপত্তা ও প্রটোকল খতিয়ে দেখতে একটি অগ্রবর্তী দল পাঠানো হয়। কিন্তু এবার প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের আলোচনার মধ্যে এই পদক্ষেপগুলো দৃশ্যমান হয়নি।

অন্য দিকে বাংলাদেশের সরকার গঠনের দিন ভারতের লোকসভার স্পিকার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়ে নরেন্দ্র মোদির একটি চিঠি হস্তান্তর করেছেন ঠিকই, তবে কূটনীতির ক্ষেত্রে এটি সৌজন্যতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কূটনীতির প্রটোকল অনুযায়ী, ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বা মন্ত্রী দেশটির প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে সরকার প্রধানের কাছে পৌঁছে দেবেন। কিন্তু এবার সে ধরনের কোনো প্রটোকল অনুসরণ করা হয়নি। এ ছাড়া আগামী মাসে দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বাংলাদেশের সরকার প্রধান নয়, বরং বিমসটেকের চেয়ারপারসন হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এর কারণে বাংলাদেশ ব্রিকসের আউটরিচ অধিবেশনে মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী পর্যায়ের কোনো প্রতিনিধি পাঠাতে পারে।

গত ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে দুই বছর পূর্তির দিনে ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়া দিল্লির মাথুয়া রোডে অবস্থিত সার মার্ক টালি মিলনায়তনে ‘শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’ শিরোনামে একটি ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। এতে শেখ হাসিনা ছাড়াও তার ছেলে সজিব ওয়াজেদ জয়, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মাহবুবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, সাবেক সংসদ সদস্য ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানসহ অন্যরা বক্তব্য রাখেন। বক্তারা বাংলাদেশকে জঙ্গি রাষ্ট্র হিসেবে এবং বিএনপি সরকারকে মানবাধিকারবিরোধী ও গণতন্ত্রবিরোধী হিসেবে বিদেশীদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। বাংলাদেশ সরকার এই আয়োজন বন্ধে আগে থেকেই ভারত সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানালেও বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটেনি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল শুধু জানিয়েছেন, একটি বেসরকারি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে অনুষ্ঠানটি আয়োজিত হচ্ছে। এতে প্রকাশিত কোনো মতামতের প্রতি দিল্লির সমর্থন নেই।

অনুষ্ঠানের পর বাংলাদেশ সরকার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছিল। বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, এই আয়োজন বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্গঠনের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে- সে বিষয়ে ভারত সরকারকে আগেই উদ্বেগ জানানো হয়েছিল। তা সত্ত্বেও এমন একটি প্রকাশ্য অনুষ্ঠানের অনুমতি দেয়ায় ঢাকা গভীর দুঃখ প্রকাশ করছে। এমন এক দিনে ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনার এই মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হলো, যখন বাংলাদেশের মানুষ জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকী পালন করছে। এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত এবং জুলাই বিপ্লবের শহীদদের প্রতি চরম অবমাননাকর। জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে ধারণ করে এ দেশের মানুষ দৃঢ় অঙ্গীকার করেছে যে, আমাদের জাতি আর কখনোই ফ্যাসিবাদের সেই অন্ধকার দিনে ফিরে যাবে না এবং বাংলাদেশ কখনোই কোনো অনুগত বা আশ্রিত রাষ্ট্র হবে না। দণ্ডপ্রাপ্ত গণহত্যাকারী হাসিনা ও তার মাফিয়া চক্রের কোনো স্থান বাংলাদেশের রাজনীতিতে আর কখনোই হবে না।

হাসিনার প্রত্যর্পণের সিদ্ধান্ত নেবে ভারতের আদালত : ভারতের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস গতকাল এক প্রতিবেদনে লিখেছে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক বা কূটনৈতিকভাবে নেয়া হবে না। ভারতের আদালত প্রত্যর্পণের সিদ্ধান্ত নেবে। আদালতের প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের করা অভিযোগগুলো ভারতের আইনেও অপরাধ হিসেবে বিবেচিত কি না, তা যাচাই করা হবে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে জানিয়েছে, বাংলাদেশের পাঠানো প্রত্যর্পণ অনুরোধের সাথে ২০১৩ সালের ভারত-বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তির বিধান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনি নথিপত্র সংযুক্ত রয়েছে।

ভারত সরকারের আরেক কর্মকর্তা পত্রিকাটিকে বলেছেন, শেখ হাসিনা নিজেই জানিয়েছেন, তিনি চলতি বছরের ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন।

আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্যদের বরাতে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস লিখেছে, দিল্লিতে ভারত সরকারের সেইফ হাউজ থেকে দলের নেতাকর্মীদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন শেখ হাসিনা। মাঝে মধ্যে তিনি সরাসরি বৈঠকও করেছেন।

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ভারতে অবস্থান করছেন শেখ হাসিনা। আন্দোলন দমাতে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনগুলোর কর্মকাণ্ডের ওপর সরকারের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।