বিশ্ব বাণিজ্যে আবারো সুরক্ষাবাদী অবস্থান জোরদার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের নতুন শুল্ক কাঠামো এবং ‘রিসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ (পারস্পরিক শুল্ক) নীতির কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের রফতানি খাতে। দেশের সবচেয়ে বড় একক রফতানি বাজার যুক্তরাষ্ট্র হওয়ায় তৈরী পোশাক (আরএমজি), চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, কৃষিপণ্য এবং অন্যান্য রফতানিমুখী শিল্প নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিষয়টি শুধু অতিরিক্ত শুল্কের নয়; বরং বৈশ্বিক বাণিজ্যের নিয়ম ও প্রতিযোগিতার নতুন বাস্তবতার সাথে খাপ খাইয়ে নেয়ার চ্যালেঞ্জ। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে যেমন যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ধরে রাখতে হবে, তেমনি প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর সাথে আরো কঠিন প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হবে।
তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসন ২০২৬ সালে নতুন করে ‘রিসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ নীতি কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নতুন সিদ্ধান্তের আলোকে বাংলাদেশী পণ্যের ওপর অতিরিক্ত আরো ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের করে। এই নীতির উদ্দেশ্য হলো, যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর বেশি শুল্ক আরোপ করে অথবা যাদের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বড় বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে, তাদের পণ্যের ওপরও সমপরিমাণ বা উচ্চ হারে আমদানি শুল্ক আরোপ করা। নতুন নীতির আওতায় বিভিন্ন দেশের জন্য পৃথক শুল্কহার নির্ধারণ করা হয়েছে। এমন সিদ্ধান্তের কারণে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি হওয়া অধিকাংশ পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। এমন নীতির ফলে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশী পণ্যের রফতানি ব্যয় বেড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে তৈরী পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, কৃষিপণ্য এবং অন্যান্য শ্রমঘন রফতানি খাতে। বাণিজ্য বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, অতিরিক্ত ব্যয় এড়াতে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা তুলনামূলক কম শুল্কের দেশ থেকে পণ্য সংগ্রহে আগ্রহী হতে পারেন।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট পণ্য রফতানি হয়েছে প্রায় ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ৩৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার এসেছে তৈরি পোশাক খাত থেকে, যা দেশের মোট রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি। তবে সামগ্রিক রফতানি আগের অর্থবছরের তুলনায় সামান্য কমেছে, যা বৈশ্বিক চাহিদা হ্রাস ও বাণিজ্য অনিশ্চয়তার প্রতিফলন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশের তৈরী পোশাকের অন্যতম বৃহৎ বাজার যুক্তরাষ্ট্র। প্রতি বছর দেশটিতে সাত থেকে আট বিলিয়ন ডলারের পোশাক রফতানি হয়। নতুন শুল্ক কাঠামো কার্যকর হলে বাংলাদেশী পণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে। ফলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা তুলনামূলক কম ব্যয়ের বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকিতে পড়েন।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মোহিউদ্দিন রুবেল নয়া দিগন্তকে বলেন, শুধু শুল্ক বৃদ্ধি নয়, যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা ও বাজারের অনিশ্চয়তাও রফতানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশের এখন কম দামে পোশাক উৎপাদনের প্রতিযোগিতা থেকে বেরিয়ে উচ্চমূল্যের ফ্যাশন পোশাক, প্রযুক্তিনির্ভর ও মূল্য সংযোজিত পণ্য উৎপাদনে জোর দিতে হবে।
তিনি বলেন, একটি বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা সব সময় ঝুঁকিপূর্ণ। তাই ইউরোপ, জাপান, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় নতুন বাজার সম্প্রসারণে আরো গুরুত্ব দিতে হবে।
অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, শুল্ক বেড়ে গেলে প্রথম ধাক্কায় রফতানিকারকদের মুনাফা কমে যেতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, ব্যবসার ব্যয় কমানো এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের বিকল্প নেই।
তিনি আরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে বেশি শুল্কের মুখে অনেক দেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে আরো বেশি মনোযোগ দেবে। এতে ইউরোপেও মূল্য প্রতিযোগিতা তীব্র হবে এবং বাংলাদেশী রফতানিকারকদের আরো কম দামে পণ্য বিক্রি করতে হতে পারে।
শুধু পোশাক নয়, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানিও ঝুঁকির মুখে রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাত থেকে প্রায় ১ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলার রফতানি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রে শুল্ক বৃদ্ধি সেই গতি বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
চামড়া খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এখন উৎপাদন ব্যয় কমাতে বিকল্প উৎস খুঁজছেন। ফলে শুল্ক বাড়লে বাংলাদেশের রফতানি আদেশ অন্য দেশে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন নিশ্চিত করা এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহ এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
একই ধরনের উদ্বেগ রয়েছে কৃষিপণ্য রফতানিকারকদের মধ্যেও। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে আম, কাঁঠাল, আলু, হিমায়িত মাছ, সবজি, মসলা এবং বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি হয়। অতিরিক্ত শুল্কের কারণে এসব পণ্যের প্রতিযোগিতা কমে গেলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম নয়া দিগন্তকে বলেন, উৎপাদন ব্যয় কমানো, বন্দর ব্যবস্থার উন্নয়ন, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং দ্রুত কাস্টমস সেবা নিশ্চিত করা না গেলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সামনে এখন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ করণীয় রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কূটনৈতিক পর্যায়ে শুল্ক নিয়ে আলোচনা জোরদার করা, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) ও অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা সম্প্রসারণ এবং পোশাকের বাইরে ওষুধ, আইটি, প্রকৌশল পণ্য, হোম টেক্সটাইল ও কৃষিভিত্তিক শিল্পে রফতানি বৈচিত্র্য আনা।
তিনি আরো বলেন, বিশ্বে পরিবেশবান্ধব পোশাক কারখানার সংখ্যায় বাংলাদেশ শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। এই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে ‘টেকসই উৎপাদনের ব্র্যান্ড’ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান আরো সুদৃঢ় করা সম্ভব।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতি বাংলাদেশের জন্য যেমন বড় সতর্কবার্তা, তেমনি এটি নতুন বাজার অনুসন্ধান, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং রফতানি বহুমুখীকরণের সুযোগও তৈরি করেছে।
তারা বলছেন, বাংলাদেশের রফতানি খাত এখনো শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকলেও পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাণিজ্য বাস্তবতায় দ্রুত নীতিগত সংস্কার, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর বাণিজ্য কূটনীতির বিকল্প নেই। অন্যথায় যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক কাঠামোর প্রভাব আগামী দিনে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান উৎসগুলোর ওপর আরো গভীরভাবে পড়তে পারে।



