নিজস্ব প্রতিবেদক
বিরোধী দলের নেতারা ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার ভাষায় কথা বলছেন বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল সোমবার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে জুলাই বিপ্লব শীর্ষক এক আলোচনা সভায় তিনি এই অভিযোগ করেন। মির্জা ফখরুল বলেন, বিরোধী দলের নেতারা কথা বলছেন সরকারকে পাঁচ বছর পূর্ণ করতে দেবো না, এই ভাষায় ওরা (আওয়ামী লীগ) ৯১ সালে যখন বিরোধী ছিল তখন বলেছিল যে, একটা দিনের জন্যও শান্তিতে থাকতে দেব না। আমরা মনে করি গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হলে বিরোধী দলকে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে হবে। অবশ্যই তারা বিরোধিতা করবেন, ভুলগুলো দেখিয়ে দেবেন কিন্তু সেটা গণতান্ত্রিক পরিবেশটা ঠিক রেখে করতে হবে।
বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের যৌথ উদ্যোগে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে এই আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
মির্জা ফখরুল বলেন, দুর্ভাগ্য আমাদের যে, তারা (বিরোধী দল) সেই আগের মতই রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করে জনমত তৈরি করার চেষ্টা করছে। এটাও তো আপত্তি নেই, এটা আপনার গণতান্ত্রিক নীতি। কিন্তু সেটা এমন এক পর্যায়ে যেন না যায় যে পর্যায়ে গিয়ে একটা সঙ্ঘাতের রূপ নেয় এটা অত্যন্ত জরুরি বিষয়। আমরা অবশ্যই নিন্দা জানাই যে সমস্ত জায়গাগুলোতে দুই একটা ঘটনা ঘটেছে এটা নিন্দনীয় এবং এটা অবশ্যই আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে, এটাও আমরা মনে করি।
মির্জা ফখরুল বলেন, জুলাই সনদের কথা বলা হচ্ছে বিএনপি সরে যাচ্ছে, বিএনপি দূরে চলে যাচ্ছে, ইত্যদি কথা বলা হচ্ছে। এখানে ভুল বোঝানো হচ্ছে যে বিএনপি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে চায় না। আসলে সমস্যাটা তো অন্য জায়গায়। তিনি বলেন. চেষ্টা করছি জুলাইয়ের ঘোষণার প্রতিটি অংশ অক্ষর আমরা যে স্বাক্ষর করেছি আমরা সেটা পালন করতে চাই এবং শুরু করেছি কাজ আমরা। ইতোমধ্যে অনেকগুলো কাজ হয়েছে। ইতোমধ্যে পার্লামেন্টে সংবিধান এমেন্ডমেন্টমেন্ট কমিটি করা হয়েছে। এখানে এখন শুরু হয়েছে শব্দ নিয়ে বিভেদ। ওটা সংস্কার হবে নাকি সংশোধন হবে। অলরাইট আপনারা আসুন আলোচনা করি, পার্লামেন্ট আলোচনা করি। আলোচনা করি সিদ্ধান্ত নেই, কথা বলি কোন কোন জায়গায় আলোচনা আছে তখন যদি একমত না হয় বেরিয়ে যাবেন।
১৬/১৭ বছরের একটা জঞ্জাল থেকে বেরিয়ে এসে তারেক রহমানের নেতৃত্বে কাজ হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ১৮ বছর পর দেশে ফিরে তারেক রহমান বলছেন রাষ্ট্র গঠন করবার কথা, আই হ্যাভ এ প্ল্যান। সেই পরিকল্পনার কাজ ইতোমধ্যে তিনি শুরু করেছেন। তার মধ্যে আছে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ধর্মীয় উপাসনালয়ের যারা আছেন মুয়াজ্জিন-ইমাম-পুরোহিহত-পাদ্রী তাদেরকে ভাতা দেয়া, খেলাধুলার বিষয়ে কিশোর-কিশোরদের আকৃষ্ট করা,সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে আবার ছড়িয়ে দেয়া, খাল-খনন কর্মসূচি, ১০ হাজার টাকা কৃষি ঋণসহ সুদ মওকুফ এই বিষয়গুলো অত্যন্ত পজিটিভ কাজগুলো শুরু করেছেন। প্রতিটা মুহূর্ত কাজ করছেন, তিনি দিনে ২৪ ঘন্টার মধ্যে ১৮ ঘন্টা কাজ করেন এই মানুষকে আমাদেরকে সহযোগিতা করতে হবে।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, আজকে মিডিয়ার ওপরে কোনো হস্তক্ষেপ নাই। সাংবাদিকদের নিয়োগের প্রসঙ্গে টেনে বিএনপি মহাসচিব বলেন, কোথায় নিয়োগ হলো না হলো কি নিয়ে ঘটনা হলো এটা আরেকটা বিষয়। তবে আমাকে দুঃখজনকভাবে বলতে হবে সেখানেও আপনাদের সাংবাদিকরাই জড়িত। এই যে একজন বললেন না বিএনপির গ্রুপ। আমি বলতে চাই, সেখানে বিএনপির কোনো গ্রুপই নাই। আপনাদের সাংবাদিকদের মধ্যে গ্রুপ তৈরি করে আপনারাই আপনার আরেকজনকে সরিয়ে দিচ্ছেন, এই বিষয়গুলো তো সত্য কথা।
মিডিয়া হাউজ কারা নিয়ন্ত্রণ করছে প্রশ্ন রেখে মির্জা ফখরুল বলেন, বেশির ভাগ মিডিয়াগুলোই তো তাদের হাউজ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, বিজনেস হাউজ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। বেকার সাংবাদিকদের কর্মসংস্থানের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলোচনা করে সমাধানেরও আশ্বাস দেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী।
মির্জা ফখরুল বলেন, দেশটা আমাদের। এখানে আমরা সারা দিন যদি মারামারি, কাটাকাটি, যুদ্ধ করতে থাকি তাহলে দেশ কোনোদিনই সামনে যাবে না। আপনি চিন্তা করে দেখেন চীন। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হলো। চীনও কিন্তু সেই সময় স্বাধীন হয়েছে। আজকে চীন কোথায় চলে গেছে? আর আমরা কোথায় পড়ে আছি? এর কারণ হচ্ছে এত বেশি দ্বিধা-বিভক্ত আমরা, একটা মনোলিথিক নেশন হিসেবে কিন্তু আমরা দাঁড়াতে পারছিনা। যে কারণে আজকে সমস্যাগুলো তৈরি হচ্ছে। আমি মনে করি যেগুলো আমাদের সবারই চিন্তা করা উচিত।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বলেন, আমরা যদি সহনশীল না থাকি তাহলে আবার এই বিভেদ আরো বাড়বে, কনফেশন বাড়বে। সেটা আরো ক্ষতিকর অবস্থায় নিয়ে যাবে। আমি অনুরোধ করব যে, আপনারা ইতিবাচকভাবে দেখুন সব জিনিসগুলোকে এবং সরকারকে সময় দেন সুযোগ দেন, যাতে সরকার সেই কাজগুলো করতে পারে। মাত্র পাঁচ মাস কয়েকদিন হয়েছে। এর মধ্যেই যদি সবকিছু আমরা সঠিকভাবে চাই এটা সম্ভব না।
ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহীদুল ইসলামের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক খুরশীদ আলমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এলাহী নেওয়াজ খান সাজু, আবদুল হাই শিকদার, মারুফ কামাল খান সোহেল, ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ওবায়দুর রহমান শাহিন, মহাসচিব কাদের গণি চৌধুরী, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ, তথ্য অধিদফতরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমেদ, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের বিএফইউজের সহসভাপতি মুহাম্মদ খায়রুল বাশার, একেএম মহসিন, শহীদ তাহির জামান প্রিয়র মা সামসী আরা জামান প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, অজস্র রক্ত ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে যে সংসদ গঠিত হয়েছে, সেটিকেই দেশের রাজনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু করা উচিত। সম্প্রতি রাজনীতির চর্চাকে কৃত্রিমভাবে সংসদের বাইরে নিয়ে যাওয়ার একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অশালীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত চর্চা নিয়ে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সুশাসন নিশ্চিত করতে সব গণতান্ত্রিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিএফইউজের মহাসচিব কাদের গণি চৌধুরী। তিনি বলেন, দীর্ঘ ১৬ বছরের স্বৈরশাসন, নির্যাতন ও দুর্নীতির অবসান ঘটিয়েছে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান। এখন লক্ষ্য একটি বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক বাংলাদেশ গড়া। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে ভুলবে না, ভুলতে পারবে না। যদিও জুলাইকে ভুলিয়ে দেয়ার একটি তৎপরতা দেখা যায়। কিন্তু যারা এই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, তারা জানে না, জুলাইকে ভুলিয়ে দিতে চাইলে জনগণ তাদেরই ভুলিয়ে দেবে। কাজেই রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত, জুলাইকে ধারণ করে সব দ্বন্দ্ব ভুলে দেশের জন্য কাজ করা।
ডিইউজের সভাপতি মো: শহিদুল ইসলাম বলেন, বিগত ১৫ বছর শেখ হাসিনাকে ফ্যাসিবাদী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে যেসব গণমাধ্যম ভূমিকা রেখেছিল, তারা আবার পুরনো সেই ষড়যন্ত্রে মেতেছে। ষড়যন্ত্রে লিপ্ত গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ বলেন, জুলাই জাতির অহংকার। কিন্তু জুলাই-পরবর্তী বিভিন্ন কোন্দল ও সঙ্কটে জুলাইয়ের পক্ষগুলোর মধ্যে একটি অনৈক্য সৃষ্টি হয়েছে। এটা যেন নতুন সঙ্কট নিয়ে না আসে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
শহীদ তাহির জামান প্রিয়র মা সামসী আরা জামান বলেন, গণতান্ত্রিক স্বার্থে সমালোচনা করতে হবে। কিন্তু সমালোচনা যাতে কাউকে আঘাতের পর্যায়ে নিয়ে না যায়। নতুন বাংলাদেশে এটা সবার প্রত্যাশা।



