চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের ৫ আগস্ট দুপুর। স্ত্রীকে শেষবারের মতো বলেছিলেন, ‘মা খাওন আনছে, এই খাওনই আমরা খাবো। দুপুরে আর রান্না কইরো না।’ তখন কেউ জানতেন না, এটাই হবে তাদের শেষ কথোপকথন। ছোট্ট ছেলেকে ঘুম পাড়িয়ে আসরের নামাজ আদায় করতে বের হয়েছিলেন তিনি। এরপর আন্দোলনরত অবস্থায় উত্তরা আজমপুর এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান ৩২ বছর বয়সী প্রাইভেটকার চালক রানা তালুকদার। তার মৃত্যুতে এক মুহূর্তেই থেমে যায় একটি ছোট্ট সংসারের স্বপ্ন। রেখে যান বৃদ্ধ মা, স্ত্রী ও একমাত্র সন্তানকে। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও পরিবার এখনো অপেক্ষায়, প্রকৃত বিচার কবে পাবে!
বাবা মো: সিরাজুল ইসলাম ও মা রুবি তালুকদারের তিন সন্তানের মধ্যে রানা ছিলেন মেজো। পেশায় তিনি ছিলেন প্রাইভেটকারের চালক। স্ত্রী ও আড়াই বছরের একমাত্র ছেলেকে নিয়েই ছিল তার ছোট্ট সংসার। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, ছেলেকে মানুষ করার পাশাপাশি তাকে হাফেজ বানানোর স্বপ্নও ছিল তার। সংসারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মায়ের প্রতিও ছিলেন অত্যন্ত যতœশীল ও দায়িত্ববান।
৫ আগস্ট : যে দিন ফেরা হয়নি
রানা তালুকদারের মা রুবি তালুকদার জানান, ৫ আগস্ট দুপুরে তিনি বাসায় খাবার নিয়ে আসেন। সবাই মিলে একসাথে খাওয়ার পর রানা ছেলেকে ঘুম পাড়িয়ে আসরের নামাজ আদায় করতে বের হন। এরপর বাসার সামনে একজন ডাকলে তার সাথে চলে যান। কিছুক্ষণ পর পরিবারের সদস্যরা ফোন করলেও কোনো সাড়া পাননি। রানার স্ত্রী শাশুড়িকে বলেন, ‘আম্মা, একটু দেখেন না, কোথায় গেল? কল ধরতেছে না। খুব ভয় করছে।’
এরপর পরিবারের সদস্যরা তাকে খুঁঁজতে বের হন। আজমপুর থানার পেছনে পৌঁছতেই গুলির তাণ্ডবে আর সামনে এগোতে পারেননি। সেখান থেকে তিনি বড় ছেলেকে ফোন দেন। কিছুক্ষণ পর বড় ছেলে এসে শুধু একটি বাক্যই বলতে পেরেছিল- মা, আমাগো ভাই আর নাই। সেই মুহূর্তের স্মৃতি এখনো তাড়া করে রুবি তালুকদারকে। তিনি বলেন, আমি দৌড়াইয়া গিয়া ছেলেরে কোলে তুলি। আমার কাপড়চোপড় রক্তে ভাইসা গেছিল। একজনের কাছ থেইকা গামছা নিয়া মাথা বাঁইধা রিকশায় কইরা বাংলাদেশ মেডিক্যালে নিলাম। কিন্তু বাঁচাইতে পারলাম না। হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে দক্ষিণখান চালাবন মাজার রোডের গণকবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়।
বিচারের অপেক্ষায় পরিবার
বর্তমানে রুবি তালুকদার তার পুত্রবধূ ও নাতিকে নিয়ে দিন গুনছেন। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, সময় পেরিয়ে গেলেও তাদের শোকের ভার কমেনি; বরং প্রতিটি দিন তাদের মনে করিয়ে দেয় হারিয়ে যাওয়া একজন সন্তানের, একজন স্বামীর এবং একজন বাবার অনুপস্থিতির কথা।
বিচারের বিষয়ে রুবি তালুকদার বলেন, ‘কোর্টে ডাইকা নিয়া হাজিরা নিছে। আমরা শুধু চাই, যারা এই ঘটনা করছে, আগে তাদের ধরুক।’ তার একটাই আবেদন, যারা তার ছেলেকে হত্যা করেছে, তাদের আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করা হোক। একই সাথে তিনি বলেন, যে উদ্দেশ্যে তার ছেলে জীবন দিয়েছে, তা যেন বাস্তবায়ন করা হয়। সেই প্রত্যাশা নিয়েই এখনো অপেক্ষা করে আছে রানা তালুকদারের পরিবার।



