ক্রীড়া ডেস্ক
আর্জেন্টিনার বিপে বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে শেষ মুহূর্তের ২-১ গোলের পরাজয়কে ইংল্যান্ডের ফুটবল ইতিহাসের গত ৬০ বছরের সবচেয়ে বেদনাদায়ক হার হিসেবে দেখা হচ্ছে। ১৯৬৬ সালের পর প্রথমবারের মতো পুরুষদের বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন থেকে মাত্র কয়েক মিনিট দূরে দাঁড়িয়েও সেই সুযোগ হাতছাড়া করায় হতাশা আরো গভীর হয়েছে।
আটলান্টার সেমিফাইনালে ৫৫ মিনিটে মরগান রজার্সের ক্রস থেকে অ্যান্থনি গর্ডনের গোলে এগিয়ে যায় ইংল্যান্ড। তখন ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল থমাস টুখেলের দলের হাতেই। কিন্তু শেষ দিকে কৌশলগত পরিবর্তনের পর ধীরে ধীরে ম্যাচের দখল নিয়ে নেয় আর্জেন্টিনা। ৮৫ মিনিটে এনসো ফার্নান্দেস সমতা ফেরান। এরপর যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে লাউতারো মার্টিনেসের হেডে জয়সূচক গোল করে বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের ফাইনালে পৌঁছে দেন।
এই হারের পর সবচেয়ে বেশি সমালোচনার মুখে পড়েছেন ইংল্যান্ডের প্রধান কোচ থমাস টুখেল। ইউরো ২০২৪-এর পর গ্যারেথ সাউথগেটের উত্তরসূরি হিসেবে তাকে নিয়োগ দেয়ার মূল কারণ ছিল বড় ম্যাচে ইংল্যান্ডকে সাফল্য এনে দেয়া। ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বিশ্বাস করেছিল, সাউথগেটের মতো রণাত্মক মানসিকতার পরিবর্তে টুখেল সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে দলকে বিশ্বকাপ জেতাতে পারবেন।
কিন্তু সেমিফাইনালে ঠিক উল্টো চিত্রই দেখা যায়। গর্ডনের গোলের পর আক্রমণাত্মক ফুটবল ধরে রাখার বদলে দলকে রণাত্মক কৌশলে নিয়ে যান টুখেল। ম্যাচের ৭২ মিনিটে গোলদাতা গর্ডনকে তুলে ডিফেন্ডার এজরি কনসাকে নামিয়ে পাঁচ ডিফেন্ডারের রণ সাজান। পরে নিকো ও’রাইলি ও ড্যান বার্নকে মাঠে নামিয়ে আরো রণভাগ শক্তিশালী করার চেষ্টা করেন। তবে এই পরিবর্তনের পরই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি হারিয়ে ফেলে ইংল্যান্ড। পরিসংখ্যানও টুখেলের পরিকল্পনার ব্যর্থতার প্রমাণ দেয়। গর্ডনের গোলের পর থেকে লাউতারো মার্টিনেসের জয়সূচক গোল পর্যন্ত প্রায় ৪০ মিনিটে ইংল্যান্ডের বল দখলের হার ছিল মাত্র ১২ শতাংশ। লিওনেল মেসির নেতৃত্বে একের পর এক আক্রমণ চালিয়ে যায় আর্জেন্টিনা এবং শেষ পর্যন্ত সেই চাপই ইংল্যান্ডের পতনের কারণ হয়।
টুখেলের আরেকটি সিদ্ধান্তও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। পুরো টুর্নামেন্টে সুযোগ না পাওয়া স্ট্রাইকার আইভান টোনিকে তিনি যোগ করা সময়ের ষষ্ঠ মিনিটে মাঠে নামান। অনেকের মতে, পেনাল্টি শুটআউটের কথা মাথায় রেখেই তাকে দলে রাখা হয়েছিল, কিন্তু ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে গড়ানোর আগেই ইংল্যান্ড হেরে যায়। দল নির্বাচন নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ইনজুরিপ্রবণ রিস জেমসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, ট্রেন্ট আলেকজান্ডার-আর্নল্ডকে উপো করা এবং কোল পামার, ফিল ফোডেন কিংবা মরগান গিবস-হোয়াইটের মতো সৃজনশীল ফুটবলারদের যথাযথভাবে ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত সমালোচিত হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই হার শুধু আর্জেন্টিনার বিপে হওয়ার কারণে নয়, বরং ম্যাচের পরিস্থিতির কারণেও এত কষ্টদায়ক। মাত্র কয়েক মিনিট ধরে রাখতে পারলেই ১৯৬৬ সালের পর প্রথম বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠার ইতিহাস গড়তে পারত ইংল্যান্ড। অথচ সেই স্বপ্ন শেষ মুহূর্তে ভেঙে যায়। তবে হতাশার মধ্যেও ইতিবাচক কিছু দিক রয়েছে। শেষ ষোলোতে স্বাগতিক মেক্সিকোকে ৩-২ গোলে হারানো এবং কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়েকে ২-১ গোলে পরাজিত করার মতো লড়াকু পারফরম্যান্স ভবিষ্যতের জন্য আশা জাগায়। জুড বেলিংহ্যাম, ডেকলান রাইস, এলিয়ট অ্যান্ডারসন, বুকায়ো সাকা, কোল পামার, ফিল ফোডেন ও অ্যাডাম ওয়ার্টনের মতো ফুটবলারদের পাশাপাশি তরুণ রিও এনগুমোহা ও ম্যাক্স ডাউম্যানকে ইংল্যান্ডের আগামী দিনের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্বকাপের আগে টুখেলের সাথে ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের চুক্তির মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৮ ইউরো পর্যন্ত করা হয়েছে। ফলে এই ব্যর্থতার পরও তার ওপর আস্থা রাখছে সংস্থাটি। তবে আর্জেন্টিনার বিপে সেমিফাইনালের এই পরাজয় এবং ম্যাচ পরিচালনার কৌশল নিয়ে সমালোচনা খুব দ্রুত থামছে না। বরং ১৯৬৬ সালের পর আরেকটি অপূর্ণ স্বপ্নের গল্প হিসেবে এই হার দীর্ঘদিন ইংল্যান্ডের ফুটবল ইতিহাসে আলোচিত হয়ে থাকবে।



