১৭২ কোটি টাকায় নির্মিত হচ্ছে র‌্যাব ফোর্সেস সদর দফতর

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition
  • ভবনের ভূগর্ভস্থ ৩টি বেসমেন্ট ও গ্রাউন্ড ফ্লোরে থাকছে আধুনিক ও বৃহৎ পার্কিং ব্যবস্থা
  • কাজ পাচ্ছে ‘জামাল অ্যান্ড কোম্পানি’

অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামোগত কাঠামো পেতে যাচ্ছে পুলিশের এলিট ফোর্স র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন ‘র‌্যাব ফোর্সেস সদর দফতর নির্মাণ’ মেগা প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বড় পূর্ত কাজ বাস্তবায়নের জন্য ‘এম জামাল অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড’ নামক প্রথম সারির একটি নির্মাণ সংস্থাকে চূড়ান্ত সুপারিশ করেছে সরকারি দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি। ১৭১ কোটি ৯০ লাখ ৭ হাজার ৭৬৪ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে এই প্রকল্পের আওতায় নির্মিত হতে যাচ্ছে ১৫তলা ভিত্তির ১১ তলাবিশিষ্ট আধুনিক সদর দফতর ভবনসহ একাধিক পেরিফেরাল অবকাঠামো।

কাল বুধবার অনুষ্ঠিতব্য সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিপরিষদ কমিটির বৈঠকে প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য উত্থাপন করা হবে বলে জানা গেছে। সচিবালয়ে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই বৈঠকের সভাপতিত্ব করবেন। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এই মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন গণপূর্ত অধিদফতর ‘ডেলিগেটেড ওয়ার্কস’ হিসেবে এ নির্মাণকাজ পরিচালনা করছে। সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির চূড়ান্ত অনুমোদন মিললেই আনুষ্ঠানিকভাবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে এবং অবকাঠামোগত কাজ শুরু হবে।

প্রকল্পের ব্যাকগ্রাউন্ড ও দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা : র‌্যাব ফোর্সেসের প্রশাসনিক ও অপারেশনাল সক্ষমতা বহুগুণ বাড়াতে ২০১৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি একনেক সভায় প্রথম ৪৯৫.৭২ কোটি টাকা ব্যয়ে এ মেগা প্রকল্পটির অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। প্রাথমিক লক্ষ্য অনুযায়ী কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়ায় এবং পরিধি বৃদ্ধি পাওয়ায় ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর প্রকল্পটির ১ম সংশোধিত প্রস্তাব অনুমোদন দেয় সরকার।

সংশোধিত প্রস্তাবনায় প্রকল্পের মোট ব্যয় বাড়িয়ে ৫৪৫.৬৫ কোটি টাকা করা হয় এবং বাস্তবায়নের নতুন সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে জানুয়ারি ২০১৮ থেকে জুন ২০২৮ পর্যন্ত। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে এই কাজের জন্য ইতোমধ্যে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

দরপত্র প্রক্রিয়া ও তীব্র প্রতিযোগিতা

গণপূর্ত অধিদফতরের মহাখালী গণপূর্ত বিভাগ কর্তৃক উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়ায় গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দরপত্র আহ্বান করা হয়। দরপত্র আহ্বানের পর দেশী-বিদেশী অভিজ্ঞ ১০টি প্রথম সারির কনস্ট্রাকশন প্রতিষ্ঠান এতে অংশ নেয়।

গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়,গত ১৫ এপ্রিল আয়োজিত দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির ১ম সভায় প্রাপ্ত কাগজপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা ও আর্থিক সংগতির শর্ত পূরণ করতে না পারায় ৪টি প্রতিষ্ঠান শুরুতেই কারিগরিভাবে অযোগ্য ঘোষিত হয়। পরবর্তীতে যোগ্য ঘোষিত ৬টি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রস্তাব উন্মুক্ত করা হলে দেখা যায়, দাফতরিক প্রাক্কলিত ব্যয় ১৯১.৭২ কোটি টাকার বিপরীতে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে ১৭১.৯০ কোটি টাকা দর দেয় ‘এম জামাল অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড’। এই দর সরকারের দাফতরিক হিসাব অপেক্ষা ১৯.৮২ কোটি টাকা (প্রায় ১০.৩৩%) কম।

প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা ছিল ‘ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশন লিমিটেড’ (১৭৬.০১ কোটি টাকা) এবং তৃতীয় স্থানে ছিল ‘দ্য সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড’ (১৮৯.১১ কোটি টাকা)।

প্রকল্পে যা যা থাকছে : মেগা অবকাঠামোর বিবরণ

অনুমোদিত প্যাকেজের অধীনে র‌্যাব সদর দফতরে আধুনিক সামরিক ও অপারেশনাল চাহিদার কথা মাথায় রেখে একাধিক বিশেষায়িত স্থাপনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে:

প্রধান প্রশাসনিক ভবন : ১৫তলা শক্ত ভিত্তির ওপর নির্মিত হবে ১১ তলা আধুনিক ভবন, যেখানে মহাপরিচালকের প্রধান কার্যালয়সহ প্রশাসনিক সব শাখা স্থানান্তর করা হবে।

বিশাল কার পার্কিং : ভবনের ভূগর্ভস্থ ৩টি বেসমেন্ট ও গ্রাউন্ড ফ্লোরে থাকছে আধুনিক ও বৃহৎ পার্কিং ব্যবস্থা।

সাব-স্টেশন ও গান হাউজ : ৩ তলা বিশিষ্ট পৃথক সাব-স্টেশন ভবন এবং অস্ত্র ও গোলাবারুদ সুরক্ষায় অত্যন্ত নিরাপদ ৩ তলা বিশিষ্ট ম্যাগাজিন/কোট ভবন।

পরিবেশবান্ধব সুবিধা : বৃষ্টির পানি সংরক্ষণে ‘রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং’ সিস্টেম, গভীর নলকূপ, ওয়াটার রিভার্সড ট্যাংক এবং স্বয়ংক্রিয় ‘কার ওয়াশ’ জোন।

উচ্চপ্রযুক্তি ও সিকিউরিটি : ভবনের ভেতরে ৬টি উচ্চগতির লিফট, সেন্ট্রাল এয়ার কন্ডিশনিং সিস্টেম, আধুনিক লোকাল এরিয়া নেটওয়ার্ক (খঅঘ) সংযোগ এবং সেন্ট্রাল ফোর্স ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা।

অন্যান্য : কুচকাওয়াজ ও আনুষ্ঠানিকতার জন্য সুসজ্জিত স্যালুটিং ডায়াস এবং অভ্যন্তরীণ সুপরিসর সংযোগ সড়ক।

কাজের মান নিশ্চিতে কঠোর শর্ত ও জামানত

দরপত্র পর্যালোচনা করতে গিয়ে মূল্যায়ন কমিটি দেখতে পায়, বিজয়ী প্রতিষ্ঠান এম জামাল অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের দরপত্রে কিছু সুনির্দিষ্ট আইটেমে প্রায় ৮.৭৫% ‘ফ্রন্ট লোডিং’ রয়েছে। পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস অনুযায়ী অতিরিক্ত ফ্রন্ট লোডিংয়ের ক্ষেত্রে কাজ অসম্পূর্ণ রাখার ঝুঁকি থাকে।

তাই কাজের গুণগত মান ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সাধারণ ৫% রিটেনশন মানির সাথে অতিরিক্ত ৯% যোগ করে সর্বমোট ১৪% রিটেনশন মানি আরোপ করা হয়েছে। এর সাথে চুক্তি অনুযায়ী ৫% পারফরম্যান্স সিকিউরিটি যুক্ত হয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে সর্বমোট ১৯% নিরাপত্তা জামানত জমা দিতে হবে বলে সূত্র জানায়।

সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, এই কঠোর জামানতের ফলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট মান বজায় রেখে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ করতে বাধ্য থাকবে। অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করে চলতি বছরের মধ্যেই মাঠপর্যায়ে মূল কাজ শুরু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে গণপূর্ত অধিদফতর।]