প্রাথমিকে পরীক্ষার খরচ যাচ্ছে অভিভাবকের ঘাড়ে

বিনামূল্যের শিক্ষা সঙ্কুচিত করে উচ্চশিক্ষায় ছাড় দিচ্ছে সরকার!

শাহেদ মতিউর রহমান
Printed Edition

প্রাথমিকে বিনামূল্যের শিক্ষার সব খরচ দেবে না বর্তমান সরকার। স্কুলের তিনটি পরীক্ষার ফি আদায়ের নামে নির্দিষ্ট একটি খরচ এখন থেকে দিতে হবে গরিব অভিভাবকদের। যদিও নতুন বাজেটে সরকার উচ্চশিক্ষায় স্নাতক পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা অবৈতনিক করার ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু জাতীয় সংসদে ঘোষণার দুই দিন পরেই গতকাল শনিবার একটি অনুষ্ঠানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব জানিয়েছেন এখন থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত তৃতীয় চতুর্থ এবং পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের ফি দিয়ে পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে। যদিও শুরু থেকেই প্রাথমিকের সব শিক্ষার্থীই বিনামূল্যে পড়াশোনা করার সুযোগ পেত এবং পরীক্ষায় অংশ নিতেও অভিভাবকদের কোনো ধরনের ফি দেয়া লাগত না। এখন নতুন করে পরীক্ষা ফি আদায়ের ঘোষণা দেয়ায় গ্রামের দরিদ্র ও অসহায় অনেক পরিবারে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষায় ঝরেপড়া রোধ করতে প্রতিটি সরকারই নানা সময়ে তাদের পলিসিমতো পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করে আসছে। কিন্তু বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার মাত্র চার মাসের মধ্যেই প্রাথমিক শিক্ষায় এভাবে লাগাম টানবে এটা কারো কাছেই কাম্য ছিল না। বিষয়টি পুনর্বিবেচনার দাবিও জানিয়েছেন অনেকে। গতকাল ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব জানিয়েছেন এখন থেকে প্রাথমিকের বিনামূল্যে শিক্ষার সব খরচ সরকার বহন করবে না। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পরীক্ষা পরিচালনার ব্যয় মেটাতে শ্রেণিভেদে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নির্ধারিত হারে ফি নেয়ার জন্য সরকারের নির্দেশনার কথা জানিয়েছেন তিনি। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, বর্তমানে প্রধান শিক্ষককে স্লিপ বরাদ্দ (বিদ্যালয়ের উন্নয়নের কাজের জন্য সীমিত পরিসরে বরাদ্দ) দেয়া হয়। তা দিয়ে অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষা আয়োজন করা কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক সময় শিক্ষকদের পকেট থেকে টাকা খরচ করতে হয়। তাই শিক্ষকদের ব্যক্তিগত অর্থ ব্যয় না করে (শিক্ষার্থীদের থেকে) নির্ধারিত সীমার পরীক্ষার ফির জন্য এই অর্থ নেয়া যেতে পারে।

গতকাল বাংলাদেশ গার্ল গাইডস অ্যাসোসিয়েশনের জাতীয় কার্যালয়ে এক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। গার্ল গাইডস হলদে পাখি সম্প্রসারণে পাখি ও প্রাথমিক শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে এ সম্মেলন হয়। সচিব জানান, তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের জন্য ৩০ টাকা, চতুর্থ শ্রেণীর জন্য ৪০ টাকা ও পঞ্চম শ্রেণীর জন্য ৫০ টাকা করে পরীক্ষা ফি নেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এটি কোনো অন্যায় কাজ নয়, কারণ শিক্ষকদের ব্যক্তিগত অর্থ ব্যয় করে পরীক্ষা নেয়া বাস্তবসম্মত নয়। তিনি বলেন, বর্তমানে স্লিপের বরাদ্দ সীমিত হলেও ভবিষ্যতের জন্য এই বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে এবং আগামী অর্থবছরে বিদ্যালয়গুলো তুলনামূলক বেশি অর্থ পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

পরীক্ষা ফি নিয়ে অনেকের মধ্যেই প্রশ্ন উঠতে পারে উল্লেখ করে প্রাথমিক গণশিক্ষা সচিব বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে প্রয়োজন হলে আমি নিজেই ব্যাখ্যা দেবো। বিভিন্ন ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এর চেয়ে বেশি হারে পরীক্ষা ফি নেয়ার উদাহরণ রয়েছে। শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ না দিয়ে পরীক্ষার মতো কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বাস্তবভিত্তিক ব্যবস্থা নেয়াই আমাদের লক্ষ্য।

বিষয়টি গতকাল বিভিন্ন অনলাইনে প্রকাশিত হওয়ার পরপরই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অভিভাবকদের মধ্যেও তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। অনেক অভিভাবক মনে করছেন সরকারের এমন সিদ্ধান্ত বিনামূল্যের প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে জনমনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে। গ্রামের বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে যারা আর্থিকভাবে কিছুটা অসচ্ছল তারাই মূলত সন্তানদের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠান। আর অপেক্ষাকৃত সচ্ছল তারা তো নামীদামি স্কুল বা কিন্ডারগার্টেনে তাদের সন্তানদের পড়াশোনার জন্য ভর্তি করিয়ে থাকেন। এখন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও যদি কিন্ডারগার্টেন স্কুলের মতো পরীক্ষার ফি আদায় করার নির্দেশনা দেয়া হয় তাহলে প্রাথমিক শিক্ষায় ঝরে পড়ার হার আগের তুলনায় বেড়ে যাবে। দরিদ্র অভিভাবরা তাদের সন্তানদের স্কুলমুখী করবেন না।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (পরিকল্পনা) মো: ছাইফুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেছেন দেশের প্রাথমিক শিক্ষায় দুই কোটিরও বেশি শিক্ষার্থী রয়েছে যাদের মধ্যে মেয়েদের সংখ্যাই বেশি। অনেক বিদ্যালয়ে মেয়েদের উপস্থিতি ও ফলাফল ছেলেদের তুলনায় ভালো। তাই মেয়েদের পিছিয়ে রেখে একটি জাতির উন্নয়ন সম্ভব নয়। তিনি বলেন, যে পরিবারে মা শিক্ষিত, সেই পরিবারের সন্তানরাও শিক্ষিত হয়ে ওঠে। সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে নারীর অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে।

ঢাকার সাভার উপজেলায় ১২১টি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনায় ২০২২ সালে শ্রেষ্ঠ সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন মতিউর রহমান। তিনি মনে করেন, প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনায় সরকার থেকে স্লিপ ফান্ডের মাধ্যমে প্রতি বছর দুই দফায় শিক্ষার্থী অনুপাতে অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়। এই অর্থ থেকেই প্রতিটি বিদ্যালয়ের নিয়মিত খরচ মেটানো সম্ভব। অথবা স্থানীয়ভাবে এসএমসির (স্কুল ম্যানেজিং কমিটি) সদস্য কিংবা এলাকার শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিদের সহযোগিতায়ও পরীক্ষারসংক্রান্ত ব্যয়ভার বহন করা বা মেটানো সম্ভব। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অভিভাবদের কাছ থেকে ৩০ টাকা ৪০ টাকা কিংবা ৫০ টাকা পরীক্ষার ফি আদায়ের এই নির্দেশনা সরকারের সক্ষমতা বিষয়ে অভিভাবক শিক্ষার্থী এমনকি দেশবাসীর মধ্যেও নেতিবাচক ধারণা তৈরি করবে। কেননা যেখানে সরকার নতুন বাজেটে উচ্চশিক্ষায় মেয়েদের সুবিধা বাড়িয়ে দিয়ে তাদের স্নাতক পর্যন্ত শিক্ষাকে অবৈতনিক করার ঘোষণা দিয়েছে সেখানে শুধু বাংলাদেশ নয় পাকিস্তান এমনকি ব্রিটিশ আমল থেকেও প্রাথমিক শিক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে বিনাবেতনে পড়ালেখার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে সেখানে এখন নতুন করে অভিভাবকদের ঘাড়ে যদি পরীক্ষার ফি চাপিয়ে দেয়া হয় তাহলে এটা শুধু শিক্ষার সুযোগকে সঙ্কুচিত করাই হবে না, বিনামূল্যের প্রাথমিক শিক্ষা থেকে অনেক পরিবারের সন্তানদের বঞ্চিত করারও আশঙ্কা তৈরি করবে।

নয়া দিগন্তকে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকার কয়েকজন অভিভাবক জানান, শিক্ষা বিস্তারে সরকারের নানা খাত উপখাত রয়েছে। সেখানে থেকে যেকোনোভাবে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফির অর্থ সংস্থান করতে পারে। এটা সরকারের জন্য সহজ হবে। কিন্তু দরিদ্র অভিবাবকদের ওপরে যদি পরীক্ষার ফির অর্থ দেয়ার দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়া হয় তাহলে অনেক পরিবার হয়তো সন্তানদের আর স্কুলেই পাঠাবে না।

প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে কাজ করেন এমন একজন জানান, যেখানে প্রাথমিক শিক্ষায় ঝরে পড়ারোধ করতে বিনামূলে পোশাক জুতা এমনকি মিড ডে মিলের জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছে সেখানে মাত্র ৩০-৪০ টাকার জন্য অভিভাবকদের চাপ প্রয়োগ করবে এটা সরকারের দ্বিচারিতা আচরণের মধ্যে পড়ে। এক দিকে শিক্ষার উন্নয়নে নতুন নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করবে, অর্থ ব্যয়ের নতুন প্ল্যান করবে আর শিক্ষার মূল ভিত্তি প্রাথমিক শিক্ষা নিয়েই এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে এটা হিতে বিপরীত হতে বাধ্য। এ ধরেনর জনআকাক্সক্ষার বিপরীতে গিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা কোনোক্রমেই নতুন সরকারের জন্য সুখকর হবে না বলেও মত দিয়েছেন শিক্ষাবিদ অভিভাবক ও সংশ্লিষ্টরা।