জাতীয় সংসদে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কারের পদ্ধতি নিয়ে ক্ষমতাসীন বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধ এবং মনস্তাত্ত্বিক লড়াই এখন ক্রমেই প্রাতিষ্ঠানিক সঙ্ঘাতে রূপ নিচ্ছে। সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে সরকারের গঠিত বিশেষ কমিটি বর্জন এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ বণ্টন-এই দুই ইস্যুতে সংসদের ভেতরে-বাইরে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে দুই পক্ষ।
একতরফাভাবে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের অভিযোগ তুলে বিরোধী দলগুলোর সংসদ থেকে ওয়াকআউট এবং ক্ষমতাসীনদের শর্তযুক্ত অবস্থান- দুইয়ে মিলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের কার্যকারিতা ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা ও রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রণীত ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে বিরোধ এখন আর কেবল সংসদীয় কৌশলের বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের চরিত্র নির্ধারণের প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
সংস্কারের ঐকমত্য, বাস্তবায়নে বিভাজন
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রীয় কাঠামো পুনর্গঠন ও সংস্কারের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ছয়টি প্রধান সংস্কার কমিশন গঠন করে। এসব কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা ও ঐকমত্যের মাধ্যমে তৈরি হয় জুলাই জাতীয় সনদ। সনদে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সীমাবদ্ধতা, সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে বিরোধী দলের আনুপাতিক ক্ষমতায়ন এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতাসহ রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্গঠনের নানা অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত হয়।
পরবর্তী সময়ে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে। অন্যদিকে সংসদে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) ১১টি দলের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে শক্তিশালী বিরোধী জোট।
কিন্তু সংসদের কার্যক্রম শুরুর পর থেকেই জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আইনি প্রক্রিয়া, সংবিধান সংশোধনের পদ্ধতি এবং সংসদীয় সংস্কারের বাস্তবায়ন নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে গভীর ধারণাগত ও কৌশলগত পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বিশেষ কমিটি নিয়েই প্রথম বড় সঙ্ঘাত
এই বিরোধের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রকাশ ঘটেছে সংবিধান সংশোধনের জন্য গঠিত বিশেষ কমিটি নিয়ে। সংসদীয় কার্যপ্রণালি বিধির ২২৬ বিধির অধীনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের ‘বিশেষ সংবিধান সংস্কার কমিটি’ গঠন করেছে সরকার। এতে বিরোধী দলের জন্য পাঁচটি সদস্যপদ রাখা হলেও জামায়াত ও এনসিপিসহ ১১ দলীয় বিরোধী জোট কমিটিতে যোগ না দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
বিরোধী জোটের অভিযোগ, সরকার জুলাই সনদের মূল চেতনা এবং গণভোটের রায়কে পাশ কাটিয়ে নিজেদের সুবিধামতো প্রক্রিয়ায় সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সরকার একতরফাভাবে সংস্কারের কাঠামো নির্ধারণ করলে জুলাই সনদের রাজনৈতিক ঐকমত্যের চরিত্রই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সরকারের যুক্তি অবশ্য ভিন্ন। তাদের বক্তব্য, সংবিধান সংশোধনের মতো মৌলিক বিষয়ে সাংবিধানিক ও সংসদীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের অংশগ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে; ফলে বিরোধীরা বাইরে থেকে আপত্তি না তুলে সংসদের ভেতরে এসে নিজেদের মতামত ও ভিন্নমত নথিবদ্ধ করতে পারে।
স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদেও অচলাবস্থা
দ্বিতীয় বড় বিরোধ তৈরি হয়েছে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ বণ্টন নিয়ে। জাতীয় সংসদে ১১টি বিষয়ভিত্তিক এবং ৩৯টি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি রয়েছে। জুলাই সনদের অঙ্গীকার অনুযায়ী, বিরোধী দলকে তাদের আসনসংখ্যার অনুপাতে-প্রায় ২৬ শতাংশ-স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ দেয়ার কথা। এর মধ্যে সরকারি হিসাব, বিশেষ অধিকার, অনুমিত হিসাব ও সরকারি প্রতিষ্ঠানসহ চারটি গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদও রয়েছে। সব মিলিয়ে বিরোধী দলের জন্য ১৪টি সভাপতির পদ নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।
কিন্তু সরকার এই পদ বণ্টনের বিষয়টিকে সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের অংশগ্রহণের সাথে কার্যত যুক্ত করেছে। ফলে বিষয়টি এখন রাজনৈতিক দরকষাকষির কেন্দ্রে চলে এসেছে। এ পর্যন্ত গঠিত ১৫টি কমিটির মধ্যে কেবল সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতির পদ বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরকে দেয়া হয়েছে। বাকি সভাপতির পদগুলো এখনো অনিষ্পন্ন রয়েছে।
বিরোধীদের অভিযোগ, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ কোনো সরকারি অনুগ্রহ নয়; এটি সংসদে বিরোধী দলের কার্যকর ভূমিকা ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক-রাজনৈতিক উপায়। অন্যদিকে সরকারের বক্তব্য, সংসদীয় সংস্কারের মূল প্রক্রিয়ায় অংশ না নিয়ে বিরোধী দল একই সাথে কমিটির নেতৃত্ব দাবি করতে পারে না।
গণভোটের রায় বনাম সংসদীয় প্রক্রিয়া
বিরোধী জোটের আরেকটি বড় অভিযোগ হলো সাধারণ নির্বাচনের পাশাপাশি ভোটাররা বিপুল ব্যবধানে গণভোটে জুলাই সনদ অনুমোদন করলেও সরকার সাধারণ আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া এবং সংসদীয় বিধিবিধানের দোহাই দিয়ে এর বাস্তবায়ন বিলম্বিত করছে।
বিরোধীদের যুক্তি, গণভোটে জনগণের দেয়া ম্যান্ডেটকে কোনো সাধারণ সংসদীয় প্রক্রিয়ার অধীন করে দেখার সুযোগ নেই। জনগণের রায়ের রাজনৈতিক তাৎপর্যকে স্বীকৃতি দিয়েই এর বাস্তবায়নের পথ নির্ধারণ করতে হবে।
অন্যদিকে সরকার মনে করে, গণভোটে অনুমোদন পেলেও সংবিধানে কোনো পরিবর্তন আনতে হলে বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামো ও সংসদীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করা অপরিহার্য। তাদের মতে, আইনি ধারাবাহিকতা উপেক্ষা করে সংস্কার বাস্তবায়নের চেষ্টা ভবিষ্যতে নতুন সাংবিধানিক জটিলতা তৈরি করতে পারে।
সরকারের অবস্থান
ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে প্রধান কৌশলী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, সরকার জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ। উদারতা দেখিয়েই বিরোধী দলকে সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে যোগ দেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে এবং তাদের জন্য পাঁচটি আসন রাখা হয়েছে।
তার বক্তব্যের সারকথা- বিরোধী দল বিশেষ কমিটিতে এসে নিজেদের ভিন্নমত বা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিতে পারে। এতে জাতির সামনে তাদের অবস্থানও স্পষ্ট হবে। কিন্তু সংস্কারের মূল প্রক্রিয়ায় অংশ না নিয়ে বাইরে থেকে দাবি তোলা পরস্পরবিরোধী অবস্থান।
সালাহউদ্দিন আহমদের মতে, সংস্কার প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা না করে স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ দাবি করা ন্যায়সঙ্গত নয়।
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি নয়া দিগন্তকে বলেন, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদের বণ্টন একটি রাজনৈতিক ও সংসদীয় সমঝোতার বিষয়। সরকার আলোচনার দরজা বন্ধ করেনি। তবে বিরোধী দলকে ‘ব্ল্যাকমেইলিংয়ের রাজনীতি’ পরিহার করে সংসদীয় কার্যক্রমে যুক্ত হতে হবে।
বিরোধী জোটের পাল্টা অবস্থান
সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান সরকারের অবস্থানকে ‘স্বৈরাচারী মানসিকতার পুনরাবৃত্তি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
সংসদ থেকে ওয়াকআউটের পর দেয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, বিরোধী জোট সংবিধান সংস্কার ও জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন চায়। কিন্তু সরকারের তৈরি করা কোনো ‘পকেট কমিটিতে’ অংশ নিয়ে এই সনদকে বিতর্কিত করতে তারা রাজি নয়।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়; সংসদে আসনসংখ্যার অনুপাতে এটি বিরোধী দলের অধিকার। একটি সাধারণ কমিটিতে যোগ দেয়ার শর্তে এই অধিকার আটকে রাখা গণতান্ত্রিক সংসদীয় চর্চার পরিপন্থী।
বিরোধীদলীয় উপনেতা ও জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি নির্ধারণের জন্য সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন নেই। সরকার চাইলে সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুসরণ করেই এখনই তা বাস্তবায়ন করতে পারে।
তার অভিযোগ, শর্ত আরোপের মাধ্যমে সরকার মূলত সংসদে একদলীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করছে।
আইনজ্ঞদের চোখে সঙ্কট
এই রাজনৈতিক অচলাবস্থা ক্রমে প্রাতিষ্ঠানিক সঙ্ঘাতে রূপ নেয়ায় দেশের আইন বিশেষজ্ঞ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সুশীলসমাজের প্রতিনিধিরাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শাহদীন মালিকের মতে, সঙ্কটের কেন্দ্রে রয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার ঘাটতি।
তার ভাষায়, জুলাই সনদ ছিল একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক চুক্তি বা ‘পলিটিক্যাল সেটেলমেন্ট’। সরকার সংসদীয় নিয়ম ও বিধি- যেমন ২২৬ বিধি-অনুসরণ করে এগোতে চাইছে, যা আইনি দিক থেকে যুক্তিসঙ্গত হতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে এই প্রক্রিয়া কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক, সেটিই বড় প্রশ্ন।
অন্যদিকে বিরোধী দল প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে সন্দিহান। তার মতে, স্থায়ী কমিটির নেতৃত্বে বিরোধী দলকে যথাযথ ভূমিকা না দিলে সংসদ নির্বাহী বিভাগের ‘রাবার স্ট্যাম্পে’ পরিণত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে- যা অতীতেও দেখা গেছে।
এই আস্থার সঙ্কট দূর করতে দুই পক্ষকেই শর্তহীন সংলাপে বসার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
এটি কি কেবল পদ-পদবির লড়াই?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. তাসনীম সিদ্দিকীর মতে, বর্তমান সঙ্ঘাতকে শুধু সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ নিয়ে বিরোধ হিসেবে দেখলে এর গভীরতা বোঝা যাবে না।
তার মতে, এটি মূলত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের লড়াই। তিনি বলেন, জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম শিক্ষা ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। জুলাই সনদে স্থায়ী কমিটিতে বিরোধী দলের আনুপাতিক ক্ষমতায়নের যে ধারণা রাখা হয়েছে, তার লক্ষ্য ছিল সংসদের ভেতরে একটি কার্যকর ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ তৈরি করা।
সরকার যদি শর্তের বেড়াজালে এই অধিকার সীমিত করে, তাহলে তা জুলাই অভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষার সাথে সাংঘর্ষিক হবে। তবে একই সাথে বিরোধী দলকেও সংসদের ভেতরে থেকে প্রতিবাদ ও দরকষাকষির সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। বিশেষ কমিটিতে যুক্ত হয়ে নিজেদের দাবি ও আপত্তি লিখিতভাবে নথিবদ্ধ করাও রাজনৈতিকভাবে কার্যকর হতে পারে।
সংসদ বর্জনের ঝুঁকি
সুশাসনের জন্য নাগরিক- সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, বর্তমান সঙ্ঘাত দ্রুত নিরসন না হলে ত্রয়োদশ সংসদ তার বৈধতা ও কার্যকারিতা- দুই ক্ষেত্রেই সঙ্কটে পড়তে পারে। তার মতে, সংসদে কার্যকর বিরোধী দল না থাকা কিংবা বিরোধী দলের ধারাবাহিক সংসদ বর্জন ও ওয়াকআউট সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য অশনিসঙ্কেত।
তিনি বলেন, জুলাই সনদ কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়; এটি জাতীয় ঐকমত্যের দলিল। ফলে সরকার ও বিরোধী জোট উভয়ের অনমনীয় অবস্থান দীর্ঘায়িত হলে রাজপথে নতুন করে সঙ্ঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। আর সেটি দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সংবিধান সংশোধনের আগেই কি বাস্তবায়ন সম্ভব?
জুলাই সনদের রাজনৈতিক বন্দোবস্তের ব্যাখ্যা দিয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ বণ্টনের বিষয়টি বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংশোধন পর্যন্ত অপেক্ষা করার প্রয়োজন নাও থাকতে পারে।
তাদের যুক্তি, সংসদীয় কমিটির সভাপতি কোন দল থেকে নির্বাচিত হতে হবে- এমন বাধ্যতামূলক বিধান সংবিধান বা সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতে নির্দিষ্ট করে দেয়া নেই। ফলে রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে সরকার চাইলে এখনই আসনসংখ্যার অনুপাতে কমিটির সভাপতি পদ বণ্টন করতে পারে।
এক্ষেত্রে বিরোধী দলকে বিশেষ কমিটিতে যোগদানের শর্ত জুড়ে দেয়া হলে সংসদীয় সংস্কার একটি পারস্পরিক আস্থার প্রক্রিয়ার পরিবর্তে রাজনৈতিক দরকষাকষির হাতিয়ারে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
একতরফা সংস্কারের ঝুঁকি
সংশ্লিষ্টদের মতে, সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে একতরফাভাবে সংবিধান সংশোধন করা হলে তার স্থায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন থাকবে। ভবিষ্যতে রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল হলে নতুন সংখ্যাগরিষ্ঠতা আবার এসব সংশোধনী বাতিল বা পরিবর্তন করতে পারে।
তাই জুলাই সনদের সংস্কারগুলোকে টেকসই করতে হলে কেবল সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন রাজনৈতিক ঐকমত্য। এ অবস্থায় সরকার ও বিরোধী জোটের সামনে কয়েকটি তাৎক্ষণিক করণীয় রয়েছে। প্রথমত, কোনো শর্ত ছাড়াই আসনের অনুপাতে স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ বণ্টনের বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছানো। দ্বিতীয়ত, সংসদ বর্জন ও ধারাবাহিক ওয়াকআউটের পরিবর্তে সংসদের ভেতরে রাজনৈতিক দরকষাকষির পথ খোলা রাখা। তৃতীয়ত, বিশেষ সংবিধান সংস্কার কমিটির কার্যক্রমে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে আস্থার পরিবেশ তৈরি করা।
প্রয়োজনে স্পিকারের মধ্যস্থতায় সংসদীয় পরিসরেই উভয় পক্ষের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে জরুরি গোলটেবিল বৈঠক আয়োজন করা যেতে পারে।
নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের অগ্নিপরীক্ষা
মূলত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে বর্তমান বিরোধ কেবল আইনি ব্যাখ্যা, সংসদীয় বিধি কিংবা কমিটির সভাপতি পদ নিয়ে দ্বন্দ্ব নয়। এর গভীরে রয়েছে- গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রের ক্ষমতার কাঠামো কিভাবে পুনর্বিন্যাস হবে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতার সরকার ও শক্তিশালী বিরোধী পক্ষের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য কিভাবে নিশ্চিত করা হবে- সেই মৌলিক প্রশ্ন।
ক্ষমতাসীন দলের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও জাতীয় ঐকমত্য ছাড়া দীর্ঘস্থায়ী সাংবিধানিক সংস্কার কঠিন। আবার বিরোধী জোটও যদি সংসদের ভেতরের প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগগুলো ব্যবহার না করে কেবল বর্জন ও রাজপথের আন্দোলনের ওপর নির্ভর করে, তাহলে তাদের কাক্সিক্ষত সংস্কারের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
ফলে সামনে মূল পরীক্ষা দুই পক্ষেরই। সরকারকে প্রমাণ করতে হবে, সংখ্যাগরিষ্ঠতা মানেই একতরফা সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার নয়। আর বিরোধী জোটকে দেখাতে হবে, প্রতিবাদ মানেই প্রতিষ্ঠান অকার্যকর করে দেয়া নয়।
জুলাই সনদের প্রকৃত সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে- সংখ্যাগরিষ্ঠতার শক্তি ও গণ-ঐকমত্যের শক্তিকে দুই পক্ষ কতটা সমন্বিত করতে পারে তার ওপর। সেই অর্থে সংসদীয় সংস্কার নিয়ে বর্তমান সঙ্ঘাত বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের প্রথম বড় প্রাতিষ্ঠানিক অগ্নিপরীক্ষা।



