ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি
সময়ের সাথে সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) শিক্ষার্থীর সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়লেও তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়েনি জ্ঞানচর্চার প্রধান কেন্দ্র কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সুযোগ-সুবিধা। ১৯২১ সালে মাত্র ৮৭৭ জন শিক্ষার্থী এবং ১৮ হাজার বই নিয়ে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার। অথচ দেশের অন্যতম বৃহৎ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে আসন রয়েছে মাত্র এক হাজার ৪০০টি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, গবেষণা সহায়ক পরিবেশ এবং আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির নিরিখে এই গ্রন্থাগারটি এখন বহুমুখী সঙ্কটে জর্জরিত। বর্তমানে এর সাথে যুক্ত হয়েছে অসহনীয় শব্দদূষণ, বহিরাগতদের অবাধ প্রবেশ, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, নিরাপত্তাহীনতা এবং দীর্ঘ দিনের প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, লাইব্রেরিতে পড়ার পরিবেশ এখন আর গবেষণাবান্ধব নেই; বরং এটি পরিণত হয়েছে কেবল চাকরিপ্রার্থীদের প্রস্তুতির একটি অপর্যাপ্ত কেন্দ্রে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের বিপরীতে ঢাবির চিত্র
ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব লাইব্রেরি অ্যাসোসিয়েশনস অ্যান্ড ইনস্টিটিউশনসের (আইএফএলএ) মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি আদর্শ বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে প্রতি পাঁচ থেকে ১০ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে অন্তত একটি আসন থাকা বাধ্যতামূলক। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ২৮.৫ জন শিক্ষার্থীর জন্য বরাদ্দ রয়েছে মাত্র একটি আসন। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রন্থাগারে আসনের এই তীব্র সঙ্কট শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপের অন্যতম কারণ। আসন পাওয়ার আশায় প্রতিদিন ভোর ৫টা থেকে লাইব্রেরির সামনে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, যা একটি শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও সুস্থ অ্যাকাডেমিক পরিবেশের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
শব্দদূষণ : পড়াশোনার পরিবেশ যখন বিপন্ন
বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারটি রাজু ভাস্কর্য ও টিএসসি-সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় প্রায় প্রতিদিনই সেখানে কোনো না কোনো রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক বা সামাজিক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, পড়াশোনা বা গবেষণার জন্য পরিবেষ্টক শব্দের মাত্রা (এমবিয়েন্ট নয়েজ লেভেল) ৩০ থেকে ৪০ ডেসিবলের মধ্যে থাকা উচিত। কিন্তু ঢাবি গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষে বসেও বাইরের মাইক, স্লোগান, যানবাহনের হর্ন এবং অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনের কারণে শব্দের মাত্রা অনেক সময় ৭০ থেকে ৮০ ডেসিবল ছাড়িয়ে যায়। সম্প্রতি মেট্রোরেল চালুর পর এই শব্দদূষণ আরো ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী উর্মি খাতুন বলেন, ‘কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের ভবনগুলো অত্যন্ত পুরনো হয়ে গেছে। প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থীর তুলনায় সিটিং ক্যাপাসিটি খুবই কম। আন্তর্জাতিক গবেষণা ডেটাবেইসে প্রবেশাধিকার সীমিত, ই-রিসোর্সও পর্যাপ্ত নয়। রিডিং রুমে এয়ার কন্ডিশনিং ব্যবস্থা না থাকায় যেসব এয়ার কুলার ব্যবহার করা হয়, সেগুলো থেকে উচ্চমাত্রার শব্দ সৃষ্টি হয়। একইসাথে ফ্যানও চালিয়ে রাখতে হয়। এতে পাঠকক্ষে শব্দদূষণ যেমন বাড়ে, তেমনি দীর্ঘ সময় স্বাচ্ছন্দ্যে বসে পড়াশোনা করাও কঠিন হয়ে পড়ে।’
শুধু বাইরের শব্দই নয়, গ্রন্থাগারের ভেতরেও অনেক সময় গ্রুপ স্টাডির নামে ফিসফিস আলোচনা, মোবাইল ফোনে কথা বলা কিংবা চেয়ার-টেবিল সরানোর শব্দে পড়াশোনার পরিবেশ ব্যাহত হয়। কার্যকর মনিটরিং ও সাউন্ড কন্ট্রোল ব্যবস্থার অভাব এই সমস্যাকে আরো প্রকট করে তুলেছে।
বহিরাগতদের দৌরাত্ম্য ও আধুনিকায়নের অভাব আসন সঙ্কটের মধ্যে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে বহিরাগতদের অবাধ প্রবেশ। আইডি কার্ড প্রদর্শনের নিয়ম থাকলেও সেটি সব সময় কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা হয় না। ফলে অনেক সময় প্রকৃত শিক্ষার্থীরা আসন না পেয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হন।
সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী জাহিদ বলেন, ‘প্রায় চার বছর ধরে এই লাইব্রেরিতে আসা-যাওয়া করি। কিন্তু কখনো দেখিনি নিয়মিতভাবে শিক্ষার্থীদের পরিচয় যাচাই করা হচ্ছে। মাঝে মধ্যে কয়েক দিন কড়াকড়ি করা হলেও পরে কোনো এক অজানা কারণে সেটি আর দীর্ঘস্থায়ী হয় না।’
আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বহিরাগত নিয়ন্ত্রণে আরএফআইডি গেট বা স্মার্ট কার্ডভিত্তিক প্রবেশ ব্যবস্থা চালু থাকলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেটি এখনো অধরা।
নিরাপত্তাহীনতা : সিসিটিভি থাকলেও চুরি হচ্ছে সাইকেল
নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে ধারাবাহিকভাবে সাইকেল চুরির ঘটনা ঘটছে। গত এক বছরে অন্তত ১০টির বেশি সাইকেল চুরির অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল জুনায়েদ বলেন, ‘২০২৪ সালের শেষের দিকে লাইব্রেরির সামনে তালাবদ্ধ করে রাখা আমার সাইকেল চুরি হয়ে যায়। পরে সিসিটিভি ফুটেজ দেখেও চোরকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি, কারণ ক্যামেরার ছবি ছিল ঝাপসা।’ নিরাপদ সাইকেল গ্যারেজ এবং পর্যাপ্ত হাই-রেজোলিউশন সিসিটিভি ক্যামেরা নিশ্চিত করার দাবি দীর্ঘ দিনের হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
এ বিষয়ে ট্রেজারার ড. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, বাজেট সঙ্কট ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) বার্ষিক প্রতিবেদনগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মোট বাজেটের খুব সামান্য একটি অংশই গ্রন্থাগার উন্নয়ন ও গবেষণায় বরাদ্দ দেয়া হয় (সাধারণত ১ থেকে ২ শতাংশের কাছাকাছি)।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক উপগ্রন্থাগারিক বলেন, ‘মেট্রোরেল নির্মাণের সময় আমরা এই রুট নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলাম। তখন আমাদের বলা হয়েছিল, মেট্রোরেলের কোনো শব্দ হবে না। কিন্তু এখন বাস্তবতা হলো সেই শব্দ লাইব্রেরির ভেতর পর্যন্ত শোনা যায়।’ তিনি আরো জানান, লাইব্রেরির সমস্যার বড় দু’টি কারণ হলো বাজেট সঙ্কট এবং কিছু অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনিয়ম। সীমিত বাজেটের মধ্যেও অনিয়ম হলে কাক্সিক্ষত মানের সেবা দেয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রশাসনের উদ্যোগ ও সীমাবদ্ধতা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) পাঠকক্ষ সম্পাদক উম্মে সালমা বলেন, ‘কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির অবস্থানই এমন জায়গায়, যার পাশ দিয়ে প্রধান সড়ক ও হাসপাতালগুলোর গাড়ি চলাচল করে। ফলে বাইরের শব্দ লাইব্রেরিতে প্রবেশ করে। এটি একটি পরিকল্পনাগত সীমাবদ্ধতা।’ তিনি জানান, লাইব্রেরির আলোকস্বল্পতা দূরীকরণে প্রায় ৩০০টি এলইডি লাইট স্থাপন করা হয়েছে এবং নিচতলায় দু’টি ওয়াশরুম নির্মাণের বরাদ্দ পাওয়া গেছে।
এয়ার কন্ডিশনিং ব্যবস্থা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা কয়েকটি হলে এসি স্থাপন করলেও প্রশাসন জানিয়েছে, এগুলোর ফলে বিদ্যুৎ বিল অনেক বেড়ে যাবে, আর সেই পরিমাণ ব্যয় ইউজিসি থেকে দেয়া হয় না। শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় একটি সুবিধা কেবল বিদ্যুৎ সংযোগের কারণে চালু করা যাচ্ছে না।’
গ্রন্থাগারিক অধ্যাপক ড. কাজী মোস্তাক গাউসুল হক জানান, পুরনো ভবন হওয়ায় গ্লাস লাগানো থাকলেও শব্দ পুরোপুরি রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। সিন্ডিকেটে ক্রয় প্রক্রিয়া স্থগিত থাকায় আরএফআইডি গেট স্থাপনও সম্ভব হয়নি। তবে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
মেগাপ্রকল্পের আশায় প্রশাসন
লাইব্রেরির এই রুগ্নদশা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশ্বিক র্যাঙ্কিংয়েও (যেমন- কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিং) নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, কারণ আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে গবেষণা সুবিধা ও লাইব্রেরির মান একটি বড় সূচক। সার্বিক বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ‘সাউন্ড প্রুফিংয়ের সমস্যাটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের নতুন বহুতল ভবন নির্মাণকে আমরা অগ্রাধিকার দিতে চাই। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন, গবেষণাবান্ধব ও পর্যাপ্ত আসনসংবলিত একটি গ্রন্থাগার শিক্ষার্থীরা পাবে। আমরা আশা করছি, নতুন ভবন নির্মিত হলে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ দিনের ভোগান্তির অবসান ঘটবে।’
তবে মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়নের দীর্ঘসূত্রতার কথা মাথায় রেখে শিক্ষার্থীরা মনে করেন, বর্তমান ভবনেই অবিলম্বে শব্দ নিয়ন্ত্রণ, কঠোর আইডি চেকিং এবং নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সুবিধাসহ দ্রুত কিছু সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। অন্যথায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানচর্চার এই প্রধান কেন্দ্রটি তার উপযোগিতা হারাবে।



