ক্রীড়া প্রতিবেদক
বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব মানেই স্নায়ুর যুদ্ধ। এখানে অতীতের গৌরব, বর্তমানের ফর্ম আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন সব কিছু মিশে যায় ৯০ মিনিটের এক রোমাঞ্চে। কিন্তু এবার ব্রাজিলের সামনে যে প্রতিপক্ষ দাঁড়িয়ে, তাদের নাম শুনলেই সেলেকাও সমর্থকদের বুকের ভেতর কেমন যেন অস্বস্তি জেগে ওঠে। কারণ বিশ্বফুটবলের পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল এখনও নরওয়ের বিপক্ষে জয়ের স্বাদ পায়নি! যে নরওয়েকে কখনো হারাতে পারেনি ব্রাজিল, তাদের সামনে এবার ইতিহাস বদলানোর সবচেয়ে বড় সুযোগ।
তারকাদের লড়াইটাও হবে জমজমাট। ব্রাজিলের আক্রমণে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লি কিংবা রদ্রিগোদের গতি ও ড্রিবলিং যেমন ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। তেমনি নরওয়ের হলান্ডের পাশাপাশি মার্টিন ওডেগার্ডের সৃজনশীলতা হতে পারে সবচেয়ে বড় অস্ত্র। এক দিকে ব্রাজিলের সাম্বার ছন্দ, অন্য দিকে নরওয়ের ভাইকিং সাহস, দুই ভিন্ন দর্শনের সংঘর্ষে ফুটবলপ্রেমীরা পাচ্ছেন এক দুর্দান্ত উপহার। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত এই লড়াই শুধু শেষ ষোলোর নয়, এটি ইতিহাস বনাম ঐতিহ্যের, পরিসংখ্যান বনাম সামর্থ্যরে, আর অভিশাপ ভাঙার এক মহারণ।
হেড-টু-হেড পরিসংখ্যান অনুযায়ী চারবার মুখোমুখি হয়েছে ব্রাজিল-নরওয়ে। এর মধ্যে নরওয়ের জিতেছে দু’টি, ড্র হয়েছে দু’টি। তার মানে নরওয়ের পক্ষে নিক্তি। ১৯৮৮ সালে ২৮ জুলাই ফিফা প্রীতিম্যাচে নরওয়ে ১-১ গোলে ড্র করে ব্রাজিলের সাথে। ১৯৯৭ সালে ৩০ মে ফিফা প্রীতিম্যাচে নরওয়ে ৪-২ গোলে হারায় ব্রাজিলকে। ১৯৯৮ সালে ২৩ জুন বিশ্বকাপ গ্রুপ পর্বে নরওয়ে ২-১ গোলে হারায় সাম্বার দেশটিকে। বেবেতোর গোলে ব্রাজিল এগিয়ে গেলেও শেষ মুহূর্তে তোরে আন্দ্রে ফ্লো এবং কেতিল রেকদালের গোলে নরওয়ে জয় পায়। ২০০৬ সালের ১৬ আগস্ট ফিফা প্রীতিম্যাচে নরওয়ে ১-১ গোলে ড্র করে ব্রাজিলের সাথে।
ব্রাজিলের কাছে সেটি যেন এক অমোচনীয় দাগ। এবারের শেষ ষোলোই শুধু কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট নয়, ঝুঁকিতে রয়েছে দীর্ঘদিনের এক অপূর্ণ হিসাবও। তবে ইতিহাসের পাতায় এগিয়ে থাকলেও বাস্তবতা বলছে, এই ব্রাজিলকে থামানো মোটেও সহজ হবে না। নকআউটের আগের ম্যাচে জাপানের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের নাটকীয় ২-১ জয় দলটিকে নতুন আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। চাপের মুহূর্তেও গোল বের করে আনার মানসিকতা দেখিয়েছে কার্লো আনচেলোত্তির দল। যদিও মাঝমাঠের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় লুকাস পাকেতার ইনজুরি এবং রাফিনিয়ার ফিটনেস কিছুটা উদ্বেগ তৈরি করেছে।
অন্য দিকে নরওয়ে এসেছে আত্মবিশ্বাসে টইটম্বুর হয়ে। আইভরি কোস্টকে ২-১ গোলে হারিয়ে তারা প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউটে জয় তুলে নিয়েছে। আর সেই অভিযানের সবচেয়ে বড় নায়ক আর্লিং হলান্ড। বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর স্ট্রাইকারদের একজন। বক্সের ভেতরে এক মুহূর্তের অসতর্কতাই প্রতিপক্ষের জন্য সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে।
এই ম্যাচের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হতে পারে দুই দলের দুই দর্শনের সংঘর্ষ। ব্রাজিল খেলতে চায় বল পায়ে রেখে, ছোট ছোট পাসে প্রতিপক্ষকে ছিন্নভিন্ন করে। অন্য দিকে নরওয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি দ্রুতগতির কাউন্টার অ্যাটাক এবং শারীরিক সামর্থ্য। মাঝমাঠে যদি ব্রাজিল নিয়ন্ত্রণ হারায়, তাহলে হলান্ডের জন্য একটি সুযোগই যথেষ্ট হতে পারে। পরিসংখ্যানের খাতায় ব্রাজিল পিছিয়ে। কিন্তু বিশ্বকাপের ইতিহাসে বড় দলগুলো প্রায়ই নিজেদের অতীতকে নতুন করে লিখেছে। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা কি অবশেষে নরওয়ে-অভিশাপ কাটিয়ে ইতিহাস বদলাবে? নাকি হলান্ডদের হাত ধরে আরো একবার কেঁপে উঠবে হলুদ জার্সির স্বপ্ন? উত্তর মিলবে মাঠে।
এবার সম্ভবনা ক্ষীণ-হলান্ড
আইভরি কোস্টের বিপক্ষে নাটকীয় জয়ের পর ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের শেষ ১৬ নিশ্চিত করেই আগামী রোববারের প্রতিপক্ষ ব্রাজিলকে ফেবারিটের তকমা দিয়ে দিলেন নরওয়েজিয়ান গোলমেশিন আর্লিং ব্রাউট হলান্ড। ব্রাজিলের বিপক্ষে জয় নিয়ে প্রশ্ন করা হলে কোনো রকম রাখঢাক না রেখেই ম্যান সিটি তারকা স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘সুযোগ খুবই ক্ষীণ’।
ডালাস স্টেডিয়ামে আইভরি কোস্টকে ২-১ গোলে বিদায় করার পর ফিফাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ২৬ বছর পর নরওয়েকে বিশ্বকাপে ফিরিয়ে আনা এই তারকা বেশ বিনয়ের সাথেই নিজের মনোভাব প্রকাশ করেন। ‘শেষ ১৬-তে ব্রাজিলের মুখোমুখি হওয়া এমন একটি বিষয় যা আমাদের এখন মোকাবেলা করতেই হবে। নরওয়ের মানুষ এখন প্রচণ্ড উচ্ছ্বসিত। জাতীয় দলকে ঘিরে পুরো দেশের এই যে ঐক্য, তা আমাদের পারফরম্যান্সকে আরো সমৃদ্ধ করে।’
ব্রাজিলকে সমীহ করে হলান্ড আরো যোগ করেন, ‘আমরা এখন শেষ ১৬-তে, যেখানে অত্যন্ত শক্তিশালী সব দল থাকবে এবং কাজটা মোটেও সহজ হবে না। পরবর্তী রাউন্ডে যাওয়া আমাদের জন্য কঠিন হবে। আমি নিশ্চিত নই আমরা পারব কি না, তবে আমরা অনেক প্রস্তুতি নিয়েছি এবং অত্যন্ত প্রস্তুত হয়েই মাঠে নামবো।’
ম্যাচ শেষে গ্যালারিতে থাকা নরওয়েজিয়ান সমর্থকদের সাথে ঐতিহ্যবাহী ‘ভাইকিং রোয়িং’ উদযাপনে মেতে ওঠেন হলান্ডরা, যেখানে ড্রাম বাজিয়ে দলের নেতৃত্ব দেন অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড। হলান্ড মুখে ব্রাজিলকে শতভাগ ফেবারিট বললেও ফুটবল ইতিহাসের পরিসংখ্যান কিন্তু ব্রাজিলের জন্য এক বড় মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা। বিশ্ব ফুটবলে নরওয়েই একমাত্র দল, যারা একাধিকবার মুখোমুখি হয়েও ব্রাজিলের কাছে কখনো হারেনি।



