মো: সাজ্জাতুল ইসলাম ময়মনসিংহ
ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার হরিপুর দেওলী গ্রামের এক নিরিবিলি পরিবেশে দাঁড়িয়ে আছে শতাব্দী প্রাচীন ঐতিহাসিক ভূঁইয়াবাড়ি জামে মসজিদ। স্থানীয়দের কাছে প্রায় সাত শতকের পুরনো হিসেবে পরিচিত দুই গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদটি শুধু একটি উপাসনালয়ই নয়, এটি ধর্মীয় ঐতিহ্য, লোককথা ও বাংলার মধ্যযুগীয় স্থাপত্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। তবে দীর্ঘদিনের অবহেলা, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ও সংস্কার না হওয়ায় ঐতিহাসিক স্থাপনাটি এখন ধ্বংসের দাঁড়প্রান্তে এসে পৌছেছে।
সরজমিন দেখা যায়, ইট-সুরকির গাঁথুনিতে নির্মিত মসজিদটির বিভিন্ন স্থানে পলেস্তারা খসে পড়েছে, দেয়ালে বড় বড় ফাটল ধরেছে। মসজিদের মুসল্লিরা জানান, দ্রুত সংস্কার ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া না হলে যেকোনো সময় স্থাপনাটির অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে।
স্থানীয় ইতিহাস-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, আঠারো শতকের শেষ দিকে ব্রিটিশবিরোধী ফকির-সন্ন্যাসী আন্দোলনের সময় আত্মগোপনে থাকা ফকিররা এই মসজিদে ইবাদত করতেন। জানা যায়, ১১৩৫ বঙ্গাব্দে মসজিদটির সর্বশেষ সংস্কার হয়েছিল। এরপর প্রায় তিন শতক পেরিয়ে গেলেও আর উল্লেখযোগ্য কোনো সংস্কার হয়নি।
মসজিদটিকে ঘিরে রয়েছে নানা জনশ্রুতি। স্থানীয়রা জানান, কখনো কখনো মসজিদের দেয়াল থেকে ঘামের মতো পানি বের হয়, এমনকি সেই পানি বেয়ে বেয়ে নিচে নেমে এসে মসজিদের মেঝেতে পেতে রাখা জয়নামাজকেও ভিজিয়ে দেয়। কিছু সময় পর দেয়াল আবার স্বাভাবিকভাবে শুকিয়ে যায়। এ ঘটনার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা না মিললেও এটি দীর্ঘ দিন ধরে এলাকাবাসীর বিশ্বাস ও কৌতূহলের অংশ হয়ে আছে।
মসজিদের খতিব মো: বাদি বিল্লাহ বলেন, বাইরে প্রচণ্ড গরম থাকলেও মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করলে শীতল পরিবেশ ও মানসিক প্রশান্তিতে মন জুড়িয়ে যায়। তার ভাষ্য, শুধু নামাজ আদায়ের জন্য নয়, আত্মিক প্রশান্তির খোঁজেও অনেক মানুষ এখানে আসেন। অতীতে বহু আলেম-ওলামা ও বুজুর্গ ব্যক্তি এ মসজিদে ইবাদত করতেন বলেও তিনি জানান।
প্রবীণ মুসল্লিদের অনেকে বলেন, তাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকেও তারা শুনে এসেছেন যে এটি অত্যন্ত প্রাচীন একটি মসজিদ। স্থানীয় মুসল্লি আবুল হোসেন বলেন, এখানে নামাজ আদায় করলে অন্য রকম প্রশান্তি অনুভূত হয়। আরেক মুসল্লি কাদির মিয়ার মতে, মসজিদের নির্মাণশৈলী, ব্যবহৃত ইট ও গাঁথুনির ধরন মধ্যযুগীয় বা মুঘল স্থাপত্যরীতির সাথে মিল রয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত গবেষণা হলে এর প্রকৃত ইতিহাস আরো স্পষ্ট হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা ফরহাদ আলী জানান, মসজিদের পাশের দু’টি পুরনো কবরের একটি ইতোমধ্যে প্রায় বিলীন হয়ে গেছে। পুরো স্থাপনাটিই ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছে। এখনই সংরক্ষণ না করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো এই ঐতিহাসিক নিদর্শন দেখার সুযোগ আর পাবে না।
২০১৯ সালে প্রতœতত্ত্ব অধিদফতর মসজিদটিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে গেজেটভুক্ত করে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, এরপরও দৃশ্যমান কোনো সংস্কারকাজ শুরু হয়নি। এমনকি এটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি- এ তথ্য জানিয়ে কোনো স্থায়ী সাইনবোর্ডও স্থাপন করা হয়নি।
প্রতœতত্ত্ব গবেষক স্বপন ধর বলেন, মসজিদটি প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ বছরের পুরোনো একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনা। বারো ভূঁইয়ার ইতিহাস, বিশেষ করে ঈশা খাঁর শাসনামলের সাথে এর সম্পর্ক থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়। মধ্যযুগীয় এক বা দুই গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদগুলোর স্থাপত্যরীতির সাথে এর মিল রয়েছে। তার ভাষ্য, দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর মসজিদটি গেজেটভুক্ত হলেও এখনো সংস্কার শুরু না হওয়া অত্যন্ত হতাশাজনক।
স্থানীয়দের দাবি, ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় দ্রুত সংরক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজ শুরু করা জরুরি। তা না হলে সময়ের নির্মমতায় দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাটি হারিয়ে যাবে চিরদিনের মতো।



