নিজস্ব প্রতিবেদক
চলতি মাসের মধ্যেই মানবতাবিরোধী অপরাধের পৃথক দু’টি মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনু এবং আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণার আশাবাদ ব্যক্ত করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন দল।
গতকাল বুধবার বিকেলে ট্রাইব্যুনালের নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, হাসানুল হক ইনু ও মাহবুবউল আলম হানিফের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা আলাদা দু’টি মামলায় আমরা আমাদের যাবতীয় সাক্ষ্য-প্রমাণ ও যুক্তি উপস্থাপন সম্পন্ন করেছি। জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে কুষ্টিয়ায় সংঘটিত হত্যাযজ্ঞে এই দু’জনের সরাসরি উসকানি ও ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ (ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায়) ছিল। তারা তৎকালীন সরকারের সব সিদ্ধান্ত ও দমনপীড়নের সহযোগী ছিলেন।
তিনি আরো বলেন, নিজ নিজ রাজনৈতিক কর্মীদের আন্দোলন দমনের জন্য বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন ইনু ও হানিফ। তাদের সেই নির্দেশনায় তৎকালীন পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতায় কুষ্টিয়ায় নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়, যাতে ছয়জন নিহত হন। প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে আদালতে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি আশা প্রকাশ করেন, চলতি মাসের মধ্যেই এই দু’টি মামলার রায় পাওয়া যাবে।
সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ, প্রসিকিউটর সহিদুল ইসলাম সরদার, প্রসিকিউটর আবদুস সাত্তার পালোয়ান এবং প্রসিকিউটর শাইখ মাহদী উপস্থিত ছিলেন।
স্বীকারোক্তি না দিলে মেরে ফেলার হুমকি দেয়া হয় : ট্রাইব্যুনালে আসামি
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে রাজধানীর রামপুরায় কার্নিশে ঝুলে থাকা এক তরুণকে গুলি করাসহ দু’জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ভয়ভীতি দেখিয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী নেয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন গ্রেফতার এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকার। গতকাল বিকেলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারক মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে আত্মপক্ষ সমর্থনে দেয়া সাফাই সাক্ষ্যে তিনি এ দাবি করেন।
চঞ্চল বলেন, গ্রেফতারের পর আমাকে থানা হেফাজতে রাখা হয়। ২০২৫ সালের ২৭ জানুয়ারি বিকেলে নেয়া হয় ওসির কক্ষে। এর কিছুক্ষণ পর একজন পুরুষ ও একজন নারী ঢোকেন। ওসির কক্ষে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দেন পুরুষ লোকটি। তিনি নিজেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর জোহা হিসেবে পরিচয় দেন। সাথে থাকা নারীকে তার হবু স্ত্রী বলে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়। একপর্যায়ে জোহা আমাকে বলেন, ‘আমি যা বলব তা আপনাকে স্বীকার করতে হবে।’ তখন আমি বলি, ‘রামপুরার নির্মাণাধীন ভবনে ঝুলে থাকা ব্যক্তিকে আমি গুলি করিনি।’ এ কথা বলার পর আমার সাথে উগ্র আচরণ করেন তিনি। একই সাথে তার কথামতো স্বীকারোক্তি দিতে বলেন। এই আসামি বলেন, স্বীকারোক্তি দিতে রাজি না হলে আমাকে ভয়ভীতি দেখান জোহা। মেরে ফেলার হুমকিও দেন তিনি। এতেও রাজি না হলে আমার নিকট আত্মীয়-স্বজনকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়। চঞ্চলের দাবি, ‘এ সময় থানার ওসিও আমাকে চাপ দেন। ওসি সাহেব বলেন, জোহা যা বলে তা মেনে নাও। পরে আমি জবানবন্দী দেই, যা দাখিল করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। তবে জবানবন্দী দেয়ার সময় আমার মানসিক অবস্থা খারাপ ছিল। পরবর্তী সময়ে স্বীকারোক্তি দেয়া ভিডিওটি দেখিয়ে আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। সাফাই সাক্ষ্য শেষে চঞ্চলকে জেরা করেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম।
জেরায় আসামির উদ্দেশে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, গ্রেফতারের পর কবে আইনজীবী নিয়োগ দিয়েছেন। জবাবে চঞ্চল বলেন, আইনজীবী নিয়োগের তারিখ মনে নেই।
রাষ্ট্রপক্ষের জেরায় চঞ্চল বলেন, আমার উপস্থিতিতে এ মামলার সব সাক্ষ্যগ্রহণ হয়েছে। আমি সবকিছু পর্যবেক্ষণ করেছি। আমার আইনজীবীও এসব কার্যক্রমে উপস্থিত ছিলেন। ট্রাইব্যুনালে যেদিন আমি সাফাই সাক্ষ্য দিয়েছি, সেদিন কেউ আমাকে ভয়ভীতি দেখাননি। আমি নির্ভয়ে সাক্ষ্য দিয়েছি। ওই দিন আজকের কথাগুলো বলিনি। আইনজীবীর শেখানো সাক্ষ্য আমি দেইনি।
এদিন সকালে এ মামলায় আবার সাফাই সাক্ষ্য দেয়ার অনুমতি পান এএসআই চঞ্চল। তিনি ছাড়াও আরো সাক্ষী রয়েছেন বলে ট্রাইব্যুনালকে জানিয়েছেন আইনজীবী সারওয়ার জাহান নিপ্পন। পরে আজ বৃহস্পতিবার আরো একজন সাক্ষীর সাক্ষ্য নেয়ার দিন ধার্য করেন আদালত। এর আগে, চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি সাক্ষ্য দেন রামপুরা পুলিশফাঁড়ির তৎকালীন এই এএসআই। জবানবন্দীতে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন তিনি।
এদিকে, গত ৪ মার্চ এ মামলার রায় ঘোষণার জন্য দিন ধার্য ছিল। কিন্তু নতুন করে ডিজিটাল এভিডেন্স জমা দেয়ার আবেদন করে প্রসিকিউশন। এরপর প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দী দেয়া আমির হোসেনকে আবার সাক্ষ্য দিতে হয়।
এ মামলায় মোট আসামি পাঁচজন। এর মধ্যে চঞ্চল ছাড়া অন্যরা পলাতক রয়েছেন। বাকিরা হলেন ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, খিলগাঁও জোনের সাবেক এডিসি মো: রাশেদুল ইসলাম, রামপুরা থানার সাবেক ওসি মো: মশিউর রহমান ও রামপুরা থানার সাবেক এসআই তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়া। গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর পাঁচজনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-১। ৭ আগস্ট ফর্মাল চার্জ দাখিল করে প্রসিকিউশন।
সোহায়েলের তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলে আরো ৩ মাস সময়
আওয়ামী লীগের শাসনামলে ছাত্রশিবিরের এক নেতাকে গুমের ঘটনায় হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব:) মোহাম্মদ সোহায়েলের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলে আরো তিন মাস সময় দেয়া হয়েছে। প্রতিবেদন জমার জন্য আগামী ৭ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
গতকাল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ দিন ধার্য করেন। প্যানেলের অপর সদস্য বিচারক মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। এদিন শুনানি করেন প্রসিকিউটর শাইখ মাহদী। তিনি মামলার অগ্রগতি তুলে ধরে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আরো তিন মাস সময় চান। পরে আবেদনটি মঞ্জুর করে নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন আদালত।
এ মামলায় মোহাম্মদ সোহায়েলকে একমাত্র আসামি করা হয়েছে। গুমের ঘটনার সময় র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখায় পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। প্রসিকিউশনের তথ্যানুযায়ী, ২০১২ সালে ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবর থেকে ইসলামী ছাত্রশিবিরের তৎকালীন নেতা গোলাম মোর্তোজাকে তুলে নিয়ে যান র্যাব সদস্যরা। পরে তাকে ৪৭ দিন পর্যন্ত আয়নাঘরে বন্দী রাখা হয়। সোহায়েলের নির্দেশে তাকে গুম করা হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রসিকিউশন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর সোহায়েলকে নৌবাহিনী থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন।



