সংশোধন হচ্ছে জাতীয় সংসদ (সংরক্ষিত মহিলা আসন) নির্বাচন আইন

গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন মন্ত্রিপরিষদ সভায় উঠছে আজ

শামছুল ইসলাম
Printed Edition

গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশ নির্ধারিত সময়ে সংসদে অনুমোদন না করায় কার্যকারিতা হারিয়েছে। এখন গুমকে গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে আলাদা আইন করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’-এর খসড়া নীতিগতভাবে ও চূড়ান্তভাবে অনুমোদনের জন্য আজ সোমবার বিকেল ৪টায় অনুষ্ঠিতব্য মন্ত্রিপরিষদ সভায় উপস্থাপন করবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ ছাড়াও বৈঠকে ‘জাতীয় সংসদ (সংরক্ষিত মহিলা আসন) নির্বাচন (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদনের উপস্থাপনসহ পাঁচটি বিষয় নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। মন্ত্রিপরিষদ সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গত বছর ২৮ আগস্ট উপদেষ্টা পরিষদের সভায় ‘গুম প্রতিরোধ, প্রতিকার ও সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়া নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়। একই বছর ৬ নভেম্বর গুম প্রতিরোধ, প্রতিকার ও সুরক্ষা অধ্যাদেশের চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়। ওই দিনই গুমের অপরাধের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড রেখে অধ্যাদেশ জারি করা হয়। তবে নতুন আইনে গুম প্রতিরোধ, প্রতিকার ও সুরক্ষা থাকছে না। নাম দেয়া হয়েছে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন। সুরক্ষা শব্দটি বাদ দেয়া হচ্ছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ী হয়ে বিএনপি এসব অধ্যাদেশের বিষয়ে জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি গঠন করে। ওই কমিটির সুপারিশের আলোকে চারটি অধ্যাদেশ বাতিল করে বিএনপি সরকার। ১৬টি অধ্যাদেশ পরবর্তী যাচাই-বাছাই করে নতুন বিল আনার সিদ্ধান্ত নেয়। যার মধ্যে গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশও ছিল। সরকার এটি এখন নতুন আইন করে নিয়ে আসছে। আর বাতিল করা অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ রয়েছে। ওই অধ্যাদেশে গুমের অপরাধ তদন্তের দায়িত্ব জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে দেওয়া হয়েছিল। প্রস্তাবিত আইনে গুমের ঘটনা তদন্তের দায়িত্ব পুলিশকে দেয়া হচ্ছে।

এ দিকে গুম প্রতিরোধ আইনের খসড়ার ওপর মতামত দিতে মাত্র এক দিন সময় দেয়াকে প্রহসনমূলক আখ্যায়িত করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। এই সময়সীমা বাড়িয়ে অন্তত দুই সপ্তাহ করার দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।

বুধবার টিআইবির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘এই আইনের খসড়া ২৭ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে আপলোড করে ২৮ জুলাইয়ের মধ্যে মতামত প্রদানের সময় নির্ধারণ করা প্রহসনমূলক।’

সংশ্লিষ্ট অংশীজনের কার্যকর সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা এবং মতামত দেয়ার সময় কমপক্ষে দুই সপ্তাহ সময় প্রয়োজন বলে মনে করছে টিআইবি। সময় বাড়ানোর পর যেসব সুপারিশ পাওয়া যাবে, তার আলোকে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রক্রিয়ায় খসড়াটি ঢেলে সাজানোর দাবিও জানিয়েছে সংস্থাটি।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, খসড়া আইনটিতে বেশ কিছু ইতিবাচক ধারা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যেমন গুমকে একটি স্বতন্ত্র ফৌজদারি ও চলমান অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও নির্দেশদাতাদের জবাবদিহির আওতায় আনা, গুমের ঘটনায় রাষ্ট্রের নিরাপত্তা অথবা অন্য ধরনের অজুহাতকে অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা ইত্যাদি। তবে মাত্র এক দিনের সময় দেয়ায় আইনের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী ও অংশীজনের মতামত সংগ্রহের ব্যাপারে সরকারের সদিচ্ছার ঘাটতি দৃশ্যমান হয়েছে, মন্তব্য করেন ইফতেখারুজ্জামান। এ ছাড়াও ‘জাতীয় সংসদ (সংরক্ষিত মহিলা আসন) নির্বাচন আইন, ২০০৪’ সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ‘জাতীয় সংসদ (সংরক্ষিত মহিলা আসন) নির্বাচন (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ শিরোনামের এই খসড়া আজ মন্ত্রিপরিষদ সভায় উপস্থাপন করা হবে।

আইনের প্রস্তাব অনুযায়ী, সাধারণ আসনে নির্বাচিত সদস্যদের জন্য নির্ধারিত সংসদীয় এলাকার উন্নয়ন কার্যক্রমে সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যের ভূমিকা রাখার লক্ষ্যে দায়িত্ব-কার্যাবলি বণ্টন করা যাবে। এক বা একাধিক সাধারণ আসন (কার্যক্ষেত্র) নির্ধারণ করবে তার দল বা জোট। আর দায়িত্ব-কার্যাবলি ঠিক করবেন তার দল বা জোটের সংসদীয় দলের প্রধান।

খসড়া অনুযায়ী, সংরক্ষিত নারী আসনে নির্বাচিত কোনো সদস্যের নাম সরকারি গেজেটে প্রকাশের পর যেকোনো সময় তার এই দায়িত্ব বণ্টন করা যাবে। যে দল বা জোটের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে তিনি নির্বাচিত হয়েছেন, সেই দল বা জোট তার কার্যক্ষেত্র হিসেবে এক বা একাধিক সাধারণ আসন নির্ধারণ করবে। এরপর তা লিখিতভাবে স্পিকারকে জানাবে। এ ক্ষেত্রে স্পিকারের অনুমোদন নেয়ার কথা নেই খসড়ায়। তাকে কেবল ‘অবহিত’ করার বিধান রাখা হয়েছে। অর্থাৎ সংরক্ষিত নারী সদস্যের জন্য সাধারণ আসন নির্ধারণের সিদ্ধান্ত তার দল বা জোটের নেতৃত্বের হাতেই থাকবে।

প্রস্তাবে বলা হয়েছে, নির্দলীয় জোটভুক্ত স্বতন্ত্র সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠের লিখিত প্রস্তাবের ভিত্তিতে সংরক্ষিত নারী সদস্যের কার্যক্ষেত্র হিসেবে এক বা একাধিক সাধারণ আসন নির্ধারণ করবেন স্পিকার। স্বতন্ত্র সদস্যদের মধ্যে ঐকমত্য না থাকলে সংরক্ষিত নারী সদস্য নিজেই তার পছন্দের আসন উল্লেখ করে স্পিকারের কাছে আবেদন করবেন। আবেদনসহ সংশ্লিষ্ট বিষয় বিবেচনা করে স্পিকার যে সিদ্ধান্ত দেবেন, তা চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, সাধারণ আসনে নির্বাচিত সদস্যদের জন্য নির্ধারিত সংসদীয় এলাকার উন্নয়ন কার্যক্রমে সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যের ভূমিকা রাখার লক্ষ্যে দায়িত্ব-কার্যাবলি বণ্টন করা যাবে। এক বা একাধিক সাধারণ আসন (কার্যক্ষেত্র) নির্ধারণ করবে তার দল বা জোট। আর দায়িত্ব-কার্যাবলি ঠিক করবেন তার দল বা জোটের সংসদীয় দলের প্রধান।

সংবিধানের ৬৫(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, একক আঞ্চলিক নির্বাচনী এলাকাগুলো থেকে জনগণের সরাসরি ভোটে ৩০০ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। আর ৬৫(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদে নারীদের জন্য ৫০ আসন সংরক্ষিত রয়েছে। তারা নির্বাচিত হন সাধারণ আসনের সদস্যদের ভোটে।

‘জাতীয় সংসদ (সংরক্ষিত মহিলা আসন) নির্বাচন আইন, ২০০৪’-এ সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টনের পদ্ধতি বলা আছে। সংসদে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতির ভিত্তিতে দল ও জোটের মধ্যে এই ৫০ আসন বণ্টন করা হয়। প্রতি ছয়জন সাধারণ সদস্যের বিপরীতে একটি সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টন হয়। সে অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে বিএনপি জোট ৩৬টি, জামায়াত জোট ১৩টি ও স্বতন্ত্ররা মিলে একটি সংরক্ষিত নারী আসন পেয়েছে।

এই সদস্যরা আইন প্রণয়ন, সংসদীয় বিতর্ক, সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে কাজ করাসহ সাধারণ সদস্যদের মতো দায়িত্ব দায়িত্ব পালন করেন। তাদের বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও সাধারণ সদস্যদের সমান।

এই দুইটি আইন ছাড়াও আইন ও বিচার বিভাগের পক্ষ থেকে ‘দ্য ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (সংশোধন) অ্যাক্ট, ২০২৬’-এর খসড়া নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদনের প্রস্তাব, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ২০২৬ এবং ওষুধের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি ২০২৬ বাতিলের প্রস্তাব, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় গত ৪ থেকে ৬ জুন উজবেকিস্তানের সমরখন্দে অনুষ্ঠিত অষ্টম গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটি (জিইএফ) অ্যাসেম্বলিতে মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের অংশগ্রহণ সম্পর্কে মন্ত্রিসভাকে অবহিত করবে।