ক্রীড়া প্রতিবেদক
২০০৩ সালে স্টিভ ওয়াহর পরাক্রমশালী অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশ দু’টি টেস্টই তিন দিন পর্যন্ত নিতে পেরেছিল। খালেদ মাহমুদ সুজনের নেতৃত্বাধীন সেই দলের সবাই ক্রিকেট ছেড়েছেন আরো আগেই। দীর্ঘ দুই যুগ পর তাসমানপাড়ের দেশটির বিপক্ষে যে দল নিয়ে টেস্ট খেলবে বাংলাদেশ, সে দলের প্রায় বেশির ভাগ ক্রিকেটারের জন্যই অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশন বড্ড অচেনা।
বাংলাদেশের জন্য অস্ট্রেলিয়া সিরিজের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সেখানকার পেস সহায়ক উইকেট। ঐতিহ্যগতভাবেই সেখানে পেসাররা বাড়তি সুবিধা পেয়ে থাকে। নিজেদের মাঠে প্যাট কামিন্স, স্কট বোল্যান্ড, মিচেল স্টার্ক, জশ হ্যাজেলউডের মতো বিশ্বমানের পেসাররা যে অতিথিদের কঠিন পরীক্ষা নেবেন- তা বলাই যায়।
অস্ট্রেলিয়ার সফরে বাংলাদেশের দুই টেস্ট হবে ডারউইন ও ম্যাকাইতে। ম্যাকাইতে এখন পর্যন্ত কোনো টেস্ট ম্যাচ হয়নি। দু’টি টেস্ট হয়েছে ডারউইনে। যেখানে স্পিনারদের ১৪টির বিপরীতে পেসাররা নিয়েছেন ৪২ উইকেট। এই পরিসংখ্যানও অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে পেসারদের দাপটের সাক্ষী। অথচ এই কন্ডিশনে বাংলাদেশ পাচ্ছে না তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র নাহিদ রানাকে। ২৩ বছর বয়সী ফাস্ট বোলার চোটে পড়ে ছিটকে যাওয়ার খবরটা কদিন আগে বেশ ফলাও করে ছেপেছে অস্ট্রেলিয়ান মিডিয়া।
সিডনি মর্নিং হেরাল্ডই যেমন নাহিদ রানাকে নিয়ে ক’দিন আগে লিখেছিল, ‘রানা জুনে ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে বোলিং করার পাশাপাশি বাউন্স ও নিখুঁত লাইন-লেন্থ দিয়ে তিনি সবাইকে মুগ্ধ করেছিলেন।’ নাহিদ রানার মতো ফাস্ট বোলিং সেনসেশনের অনুপস্থিতি অস্ট্রেলিয়ান সংবাদমাধ্যমও যেন বেশ অনুভব করছে। পেস সহায়ক উইকেটে প্রতিপক্ষের আগুনে বোলিং তারাও দেখতে চেয়েছিল।
আগস্টে দুই টেস্টের ভেনু ডারউইন ও ম্যাকাইতে বৃষ্টির সম্ভাবনা বেশ কম। স্বাভাবিকভাবে পিচ থাকবে শক্ত ও শুকনা। নতুন বলে বাড়তি বাউন্স আদায় করতে পারবেন পেসাররা। সেই সাথে কিছুটা সিম মুভমেন্ট পাওয়া যায়। তবে ম্যাচ যত এগোয়, উইকেট ধীরে ধীরে ব্যাটিংয়ের জন্যও সুবিধাজনক হয়ে ওঠে। এমন কন্ডিশনে খুব বেশি খেলার সুযোগ হয় না বাংলাদেশের। চিন্তার কারণ সেখানেই।
একে তো অস্ট্রেলিয়ার পেস সহায়ক উইকেট, তার ওপর বাড়তি চিন্তা যোগ করছে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের হতাশাজনক ব্যাটিং। সর্বশেষ জিম্বাবুয়ে সিরিজে চূড়ান্ত ব্যর্থ বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপ। ফুটবল বিশ্বকাপের ডামাডোলে এমন বাজে ব্যাটিং নিয়ে তেমন সমালোচনা না হলেও কপালে চিন্তার ভাঁজ থেকেই যাচ্ছে। জিম্বাবুয়ে সিরিজের সেই হতাশাজনক ব্যাটিং থেকে ঘুরে দাঁড়াতে না পারলে খুব বাজে কিছুই অপেক্ষা করছে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে।
পেস আক্রমণে নাহিদ রানা নেই। চোটে পড়ে প্রথম টেস্টের দলে নেই শরীফুল ইসলাম। দ্বিতীয় টেস্টের আগে ফিট হলে দলে ফিরবেন এই বাঁ হাতি পেসার। রানা-শরীফুলের অনুপস্থিতিতে কিছুটা দুর্বল শক্তির পেস আক্রমণ নিয়েই খেলতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। চোট থেকে রিকভার করা তাসকিন হয়তো কিছুটা ভরসা হতে পারেন, যদি একাদশে থাকতে পারেন।
ওপেনিং জুটি
অস্ট্রেলিয়ায় ঐতিহাসিক দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ শুরুর আগে উদ্বোধনী জুটির দীর্ঘ দিনের সমস্যা নতুন করে চিন্তায় ফেলেছে বাংলাদেশকে। আসন্ন দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে সাফল্য পেতে হলে বাংলাদেশের উদ্বোধনী জুটিতে পারফরম্যান্স করা গুরুত্বপূর্ণ। তবে পরিসংখ্যান বলছে, দলের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা হচ্ছে এই উদ্বোধনী জুটি। গত চার বছরে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের কোনো ম্যাচেই বাংলাদেশের কোনো ওপেনার সেঞ্চুরি করতে পারেননি। ওপেনারদের ভূমিকা অত্যন্ত কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং বলে জানান বাংলাদেশের টেস্ট অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত।
অস্ট্রেলিয়া সফরে বাংলাদেশ দলে ওপেনার হিসেবে আছেন সাদমান ইসলাম, তানজিদ হাসান তামিম ও সৌম্য সরকার। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বাংলাদেশের সর্বশেষ টেস্ট ম্যাচে এরা কেউই খেলেননি। টেস্ট ফরম্যাটে মাত্র একটি টেস্ট খেলেছেন তানজিদ। দীর্ঘ পাঁচ বছর পর টেস্ট দলে ফিরেছেন সৌম্য। পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা না থাকলেও দলে রাখা হয়েছে সাদমানকে।
বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে উদ্বোধনী জুটিতে ধারাবাহিক হতে না পারা বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। টেস্টে বাংলাদেশি ওপেনার হিসেবে সর্বশেষ সেঞ্চুরি করেছেন জাকির হাসান। সেটি প্রায় চার বছর আগে ভারতের বিপক্ষে। এরপর নিজের শেষ ১৩টি টেস্ট ইনিংসে একটিও হাফ-সেঞ্চুরি পাননি জাকির। ফলে দল থেকে বাদ পড়েন তিনি।
টেস্ট ক্রিকেট থেকে তামিম ইকবাল অবসর নেয়ার পর সাতজন ভিন্ন ভিন্ন ওপেনারকে পরখ করেছে বাংলাদেশ। এ সময়ে খেলা ২১টি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ম্যাচে কোনো সেঞ্চুরি করতে পারেননি ওপেনাররা। মাত্র ১০টি হাফ-সেঞ্চুরি করেছেন তারা। যা টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেয়া দলগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন। ২০২৩ সালের শুরু থেকে ইনিংসে বাংলাদেশের ওপেনিং জুটির গড় সংগ্রহ ২০.১৭ রান। যা বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেয়া দলগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন।
বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের বাইরের সিরিজে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে সেঞ্চুরি করেছেন মাহমুদুল হাসান। সাম্প্রতিক বাজে ফর্মেও কারণে অস্ট্রেলিয়া সফরের দলে রাখা হয়নি তাকে। টেস্টে সর্বশেষ ছয় ইনিংসে চারবার এক অঙ্কের ঘরে আউট হন তিনি।



