কাউয়ান বাসিল : ব্রাজিলের নতুন সূর্য

Printed Edition
মাত্র ৮ বছর বয়সে নাইকির সাথে চুক্তি করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন সান্তোস তারকা কাউয়ান বাসিল
মাত্র ৮ বছর বয়সে নাইকির সাথে চুক্তি করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন সান্তোস তারকা কাউয়ান বাসিল

জসিম উদ্দিন রানা

ব্রাজিলিয়ান ফুটবলে বহু বছর ধরেই কথিত আছে ব্রাজিলে প্রতিটি গলির মোড়েই নাকি একজন করে নতুন নেইমার জন্ম নেয়। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সেই দাবিগুলো মিলিয়ে যায়। কেউ চাপ সামলাতে পারে না, কেউ হারিয়ে যায় ইনজুরিতে, আবার কেউ বড় মঞ্চের আলোয় নিজের ছায়াকেই খুঁজে ফেরে।

কিন্তু এবার গল্পটা যেন একটু আলাদা। কাউয়ান বর্তমানে ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি পেলে ও নেইমারের জনপ্রিয় ক্লাব সান্তোসের বয়সভিত্তিক দলে খেলছেন। ২০১২ সালের ২১ জুন জন্ম। বর্তমানে বয়স ১৪ বছর। অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার বা ফরোয়ার্ড হিসেবে খেলেন। নেইমার জুনিয়রের মতো কাউয়ান বাসিলও সান্তোসের যুব অ্যাকাডেমিতে ফুটবল ক্যারিয়ার শুরু করেছেন। মাত্র আট বছর বয়সে বিখ্যাত ক্রীড়াসামগ্রী প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ‘নাইকি’র সাথে স্পনসরশিপ চুক্তি স্বাক্ষর করে তিনি বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। নেইমার ১১ বছর বয়সে নাইকির সাথে চুক্তি করেছিলেন, সেই রেকর্ড ভেঙে বাসিল সর্বকনিষ্ঠ ব্রাজিলিয়ান হিসেবে এই কীর্তি গড়েন। তার ড্রিবলিং, বল কন্ট্রোল এবং ক্রিয়েটিভ খেলার ধরন তাকে নিজ প্রজন্মের সবচেয়ে প্রতিভাবান খেলোয়াড় হিসেবে পরিচিতি দিয়েছে। ২০৩০ বিশ্বকাপকে সামনে রেখে ব্রাজিলিয়ান ভক্তরা বড় স্বপ্ন দেখছে।

কিশোর বয়সেই কাউয়ান বাসিলকে ঘিরে যে উন্মাদনা তৈরি হয়েছে, সেটি কেবল ইউটিউবের স্কিল ভিডিও কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রশংসায় সীমাবদ্ধ নয়। ব্রাজিলের ফুটবল বিশ্লেষক, সাবেক তারকা এবং স্কাউটরা বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন এই ছেলেটির মধ্যে আছে ভবিষ্যৎ সেলেকাওকে নেতৃত্ব দেয়ার সামর্থ্য। অনেকেই তাকে নেইমারের উত্তরসূরি হিসেবে বলতে শুরু করেছেন।

এই তুলনা অবশ্য কেবল প্রতিভার জন্য নয়। বাসিলের খেলার ধরনেও যেন নেইমারের ছায়া স্পষ্ট। বল পায়ে অবিশ্বাস্য আত্মবিশ্বাস, একের পর এক ডিফেন্ডার কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা, সঙ্কীর্ণ জায়গায় ভারসাম্য ধরে রাখা, হঠাৎ গতি বদলে প্রতিপক্ষকে হতবাক করে দেয়া, সব মিলিয়ে তিনি যেন ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের চিরচেনা জোগো বনিতো দর্শনের নতুন প্রতিনিধি।

তবে এখানেই শেষ নয়। আধুনিক ফুটবলের চাহিদা অনুযায়ী বাসিলের খেলায় রয়েছে আরো কিছু বিশেষ গুণ। তিনি কেবল ড্রিবলার নন, সুযোগ তৈরি করতে পারেন, শেষ পাস দিতে পারেন, আবার নিজেও গোল করতে জানেন। আক্রমণের বাম প্রান্ত থেকে শুরু করে কেন্দ্র কিংবা ফলস নাইন বিভিন্ন ভূমিকায় সমান স্বাচ্ছন্দ্যে খেলতে পারেন তিনি। এই বহুমুখী সামর্থ্যই তাকে সমসাময়িক প্রতিভাদের ভিড়ে আলাদা করে তুলছে।

ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের ইতিহাসে উত্তরসূরি হওয়ার চাপ নতুন কিছু নয়। একসময় পেলের পর এলেন জিকো, তারপর রোমারিও, রোনালদো, রিভালদো, রোনালদিনহো, কাকা ও নেইমার। প্রত্যেকেই নিজেদের সময়ে একটি প্রজন্মের মুখ হয়ে উঠেছেন। এখন নেইমারের ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায় যখন সামনে, তখন নতুন প্রজন্মের চোখ স্বাভাবিকভাবেই কাউয়ান বাসিলের দিকে।

তবে ইতিহাস এটাও শেখায়, প্রতিভা থাকলেই কিংবদন্তি হওয়া যায় না। প্রয়োজন কঠোর পরিশ্রম, ধারাবাহিকতা, মানসিক দৃঢ়তা এবং বড় মঞ্চে নিজেকে প্রমাণ করার ক্ষমতা। ব্রাজিলিয়ান ফুটবল এমন অসংখ্য বিস্ময় বালকের গল্প জানে, যারা বয়সভিত্তিক পর্যায়ে দারুণ আলো ছড়িয়েও সিনিয়র পর্যায়ে হারিয়ে গেছেন। তাই বাসিলের সামনে সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ হচ্ছে প্রত্যাশার পাহাড়।

বিশ্ব ফুটবলও এখন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর যুগ প্রায় শেষ। কিলিয়ান এমবাপ্পে, আর্লিং হলান্ড, লামিন ইয়ামালের মতো তরুণদের হাতে ভবিষ্যতের মঞ্চ তৈরি হচ্ছে। সেই তালিকায় নিজের নাম লেখাতে চাইলে কাউয়ান বাসিলকে শুধু ব্রাজিলের নয়, বিশ্বের সেরাদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত প্রতিযোগিতা করতে হবে।

তবু আশার জায়গা রয়েছে। কারণ বাসিলের মধ্যে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে, সেটি হলো ভয়হীনতা। বয়স যতই কম হোক, বল পায়ে নিলে তার মধ্যে কোনো দ্বিধা দেখা যায় না। যেন ছোটবেলার সেই রাস্তার ফুটবল এখনো তার রক্তে বইছে। আর ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্যও তো এখানেই- আনন্দ নিয়ে খেলা, স্বাধীনভাবে সৃজনশীলতা প্রকাশ করা।

নেইমারের সাথে তুলনা হয়তো এখনই অনেক বড় বোঝা। বরং কাউয়ান বাসিলের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হওয়া উচিত নিজের পরিচয় তৈরি করা। কারণ ইতিহাস কখনো দ্বিতীয় নেইমারকে মনে রাখে না, ইতিহাস মনে রাখে প্রথম কাউয়ান বাসিলকে। হয়তো কয়েক বছর পর আমরা সত্যিই বলব নেইমারের বিদায়ের পর ব্রাজিল আবারো খুঁজে পেয়েছিল তাদের নতুন জাদুকরকে। আবার এটাও হতে পারে, প্রত্যাশার ভারে হারিয়ে যাবে আরেকটি উজ্জ্বল নাম- উত্তরটা সময়ই দেবে।

তবে একটি বিষয় নিশ্চিত আজ যে কিশোরটিকে নিয়ে ব্রাজিল স্বপ্ন দেখছে, আগামী দিনের সেলেকাওর ভাগ্যরেখা আঁকার তুলি হয়তো তার হাতেই।

বিশ্ব ফুটবলে কাউয়ান বাসিলের জেনারেশন বা সমসাময়িক সবচেয়ে আলোচিত কয়েকজন ‘বিস্ময়বালক’ হলেন :

১. লুকাস ইয়ান : তিনি কাউয়ান বাসিলের আপন বড় ভাই এবং তিনিও সান্তোস এফসি অ্যাকাডেমিতে উইঙ্গার পজিশনে খেলছেন। বাসিল পরিবারের এই বড় ছেলেও সান্তোসের যুব দলে খেলছেন। দুই ভাইয়ের রসায়ন এবং মাঠে বলের ওপর নিয়ন্ত্রণ অসাধারণ।

২. ইংল্যান্ডের জাইডন ডানস : লিভারপুলের এই অ্যাকাডেমি গ্র্যাজুয়েটকে বর্তমান যুব ফুটবলের অন্যতম সেরা ফিনিশার ধরা হচ্ছে। লিভারপুল এফসির মূল দলে ইতোমধ্যেই সুযোগ পেয়ে গোল করা এই স্ট্রাইকারকে ইংলিশ ফুটবলের ভবিষ্যৎ ভাবা হচ্ছে। কাউয়ান যেভাবে ব্রাজিলে অ্যাকাডেমি মাতাচ্ছেন, ডানস একইভাবে ইংল্যান্ডে আলো ছড়াচ্ছেন।

৩. ইতালির পিয়েত্রো তোমাসেত্তি : অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার। কাউয়ান বাসিল যেমন আট বছর বয়সে নাইকির সাথে চুক্তি করে রেকর্ড গড়েছিলেন, তোমাসেত্তিও ঠিক তেমনি মাত্র ৯ বছর বয়সে তার অবিশ্বাস্য ড্রিবলিং স্কিলের জন্য এএস রোমা ক্লাবের নজরে আসেন। তার স্কিলের ভিডিও বাসিলের মতোই ভাইরাল।

৪. ফ্রান্সেস্কো কামার্দা : ইতালিতে জন্ম ২০০৮ সালে। ইতালির ফুটবলের ইতিহাসে সিরি এ তে ডেবিউ করা সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড়। এসি মিলানের যুব দলের হয়ে তিনি প্রায় ৫০০-এর বেশি গোল করেছেন। বাসিল যেমন ২০৩০ বিশ্বকাপের স্বপ্ন, কামার্দা তেমনি ইতালির ২০৩০ বা ২০৩৪ বিশ্বকাপের মূল বাজি।

৫. বলিভিয়ার মিগুয়েলিটো : সান্তোস অ্যাকাডেমি বর্তমানে কাউয়ান বাসিলের পাশাপাশি মিগুয়েলিটোকে তাদের অন্যতম বড় সম্পদ মনে করে। সম্প্রতি ২০২৯ সাল পর্যন্ত তার চুক্তি নবায়ন করা হয়েছে। সান্তোসের মাঝমাঠের মূল কারিগর।