বিস্কুট আর পানি খেয়েই আন্দোলনে ছুটে গিয়েছিল ছেলে : শহীদ এলেমের মা

হাবিবুল বাশার
Printed Edition
বিস্কুট আর পানি খেয়েই আন্দোলনে ছুটে গিয়েছিল ছেলে : শহীদ এলেমের মা
বিস্কুট আর পানি খেয়েই আন্দোলনে ছুটে গিয়েছিল ছেলে : শহীদ এলেমের মা

দুপুর বেলা ছেলেটা না খেয়েই চলে গিয়েছিল। বিকাশের দোকান বন্ধ থাকায় এক বন্ধুর কাছ থেকে ১০০ টাকা ধার নেয়। সেই টাকা দিয়ে নৌকা ভাড়া দেয়, আর ১০ টাকা দিয়ে এক প্যাকেট বিস্কুট ও একটা পানির বোতল কেনে। একটু বিস্কুট আর পানি মুখে দিয়েই আমার ছেলেটা বুলেটের আঘাতে দুনিয়া ছেড়ে চলে গেল, দুপুরে ভাতটাও খেতে পারল না- কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ নাদিমুল হাসান এলেমের মা কিশমত আরা। হত্যায় যাদের নির্দেশ ও হাত ছিল তাদের সকলের মৃত্যুদণ্ড চায় এই শহীদ পরিবার।

২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রাজধানীর লক্ষ্মীবাজারে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন শেখ বোরহানুদ্দীন পোস্ট গ্রাজুয়েট কলেজের ডিগ্রি ১ম বর্ষের ছাত্র নাদিমুল হাসান এলেম। তার মায়ের দেয়া হৃদয়বিদারক সাক্ষাৎকার এবং স্থানীয় সূত্রে এই বীর শহীদের জীবনের নানা অধ্যায় ও পরিবারের বর্তমান পরিস্থিতি উঠে এসেছে।

প্রতিবাদী এক তরুণ

এলাকার এক প্রতিবেশী জানিয়েছেন, এলেম এই এলাকায় ছাত্রদের মধ্যকার যেকোনো বিবাদ বা ঝামেলা খুব সুন্দরভাবে মীমাংসা করে দিতেন। তিনি সবসময় ন্যায়ের পক্ষে ছিলেন। এলেমের সহপাঠী শরিফ বলেন, এলেম মায়ের অত্যন্ত ভক্ত ছিল। বন্ধুদের যেকোনো বিপদে ও প্রয়োজনে সে সবসময় সবার আগে এগিয়ে আসত।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, শুধু পরোপকারীই নয়, ছাত্রজীবন থেকেই দেশের চলমান পরিস্থিতি, সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার হরণ এবং কোটা প্রথার নামে বৈষম্যের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ ও সচেতন ছিলেন এলেম। মায়ের দেয়া তথ্যমতে, এলেম কেবল শেষ দিনই নয়, এর আগেও বেশ কয়েকটি আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন। মঙ্গলবার ও বৃহস্পতিবারের পর বুধবার সকালেও তার আন্দোলনে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মায়ের মন সন্তানের বিপদের আশঙ্কায় তাকে সকালে ডেকে দেয়নি। তা নিয়ে মায়ের সাথে সামান্য অভিমানও করেছিলেন এলেম। পরদিন শুক্রবার জুমার নামাজ শেষেই বন্ধুদের ফোনে তিনি লক্ষ্মীবাজারের উদ্দেশে ছুটে যান।

১৯ জুলাইয়ের নৃশংসতা ও শেষ মুহূর্ত

১৯ জুলাই শুক্রবার জুমার নামাজ পড়ে এলেম যখন আন্দোলনের উদ্দেশ্যে রওনা হন, তখন তার পকেটে টাকা ছিল না। এলাকায় যে সেলুনে বন্ধুরা আড্ডা দিত, সেখান থেকে ১০০ টাকা ধার নিয়ে কেরানীগঞ্জের তেলঘাট থেকে নৌকা পার হয়ে লক্ষ্মীবাজারে পৌঁছান।

বিকেল ৩টা ১৫ মিনিটে লক্ষ্মীবাজারের ওয়াসা ভবনের সামনে কবি নজরুল কলেজের পাশে অবস্থানকালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতর্কিত হামলার শিকার হন তিনি। পুলিশের ছোড়া গুলি সরাসরি এলেমের চোখে গিয়ে লাগে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল এবং নির্বিচার বুলেটের মুখে দীর্ঘ সময় তার রক্তাক্ত দেহটি রাস্তায় পড়ে ছিল। পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলে বিকেলের দিকে অন্য ছাত্ররা তাকে উদ্ধার করে রিকশায় তুলে হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরদিন কেরানীগঞ্জে নামাজে জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হয়।

কেমন আছে শহীদ পরিবার

শহীদ নাদিমুল হাসান এলেম ছিলেন তিন ভাইয়ের মধ্যে সবার বড়। পড়াশোনার পাশাপাশি কেরানীগঞ্জের লায়ন মার্কেটের একটি পোশাকের শোরুমে চাকরি করে পরিবারকে আর্থিক সহায়তা করতেন তিনি। তার বাবা শাহ আলম পাঞ্জাবির কাপড়ের সামান্য ব্যবসা করেন।

নিজস্ব কোনো জমি বা মাথা গোঁজার ঠাঁই না থাকায় কেরানীগঞ্জের তেলঘাটে একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করে মধ্যবিত্ত পরিবারটি। এলেমের মা কিশমত আরা দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসে ভুগছেন। তার হার্টে ৩টি ব্লক ধরা পড়েছিল। মা জানান, সরকার থেকে যে অনুদান পাওয়া গিয়েছিল, তা দিয়ে সম্প্রতি তার হার্টের অপারেশন করা হয়েছে এবং ৩টি রিং বসানো সম্ভব হয়েছে। অশ্রুসিক্ত চোখে তিনি বলেন, আমার তো অপারেশন করার সামর্থ্য ছিল না, আমার বড় ছেলের বদৌলত আজ হার্টটা অপারেশন হয়েছে। কিন্তু ও তো আর আমার মাঝে নেই।

বিচার পাওয়ার আকুতি

নাদিমুল হাসান এলেমের মামলাটি বর্তমানে সিআইডির কাছে তদন্তাধীন রয়েছে। তবে পরিবারের অভিযোগ, শুরুতে তদন্ত কর্মকর্তারা যোগাযোগ করলেও বর্তমানে আর কোনো খোঁজখবর তাদের দেয়া হচ্ছে না। ছেলের হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করে শহীদ এলেমের মা বলেন, যাদের নির্দেশে ও হাত দিয়ে আমার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে, সেই শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের পরিকল্পনাকারীদের ফাঁসি চাই। হাসিনাকে ভারত থেকে ফিরিয়ে এনে দেশের মাটিতে সমস্ত শহীদদের মা-বাবার সামনে বিচার করতে হবে। আমার ছেলেকে তো আর ফিরে পাব না; কিন্তু এই দেশে যেন আর কোনো মায়ের বুক খালি না হয়, আমরা সেই বিচার চাই।