বিশেষ সংবাদদাতা
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাছে ৯ দফা দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে- এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নির্বাচনে প্রার্থিতার সুযোগ দেয়া, সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের পদে থাকা ব্যক্তিদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে সম্প্রতি নিয়োগ পাওয়া রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রশাসকদের নির্বাচনে প্রার্থিতার সুযোগ না দেয়া।
মঙ্গলবার আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে এই দাবিগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরা হয়। বৈঠকে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল অংশ নেয়। ইসির পক্ষে অন্য কমিশনাররা ও সচিব উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক শেষে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল জানান, লিখিতভাবে ৯ দফা দাবি সিইসির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তিনি বলেন, সম্ভাব্য স্থানীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তাদের এই বৈঠক অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রায় এক মাস আগেও তারা ইসির কাছে গিয়ে একই ধরনের কিছু দাবি জানিয়েছিলেন। মঙ্গলবারের এই বৈঠক মূলত আগের দেয়া দাবিগুলোর অগ্রগতি পর্যালোচনা ও অনুসরণভিত্তিক আলোচনার অংশ ছিল।
সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত দাবিগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, দেশের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৩০ হাজার এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মরত আছেন, যারা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগসহ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছেন। এমনকি সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তারা প্রার্থী হয়েছিলেন। তবে নির্বাচন কমিশন নিজস্ব এক সভায় এসব শিক্ষককে স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণা করার যে সুপারিশ অনুমোদন করেছে, তা বৈষম্যমূলক। সংবিধানের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদে বর্ণিত নাগরিকদের সমতা ও বৈষম্যহীনতার অধিকারের সাথে এটি সাংঘর্ষিক হওয়ায় জামায়াত অবিলম্বে এই সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি জানাচ্ছে।
নিষিদ্ধ দলের পদধারীদের প্রার্থিতা বাতিলের বিষয়ে জামায়াত নেতা বলেন, কোনো দলের রাজনৈতিক কার্যক্রম সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ হলে, সেই দলের দায়িত্বশীল নেতাদের স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিতে দেয়া উচিত নয়। কারণ তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণও এক ধরনের রাজনৈতিক তৎপরতা হিসেবে বিবেচিত হবে।
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে দলীয় পরিচয়ধারীদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়ার বিষয়ে তীব্র আপত্তি জানায় জামায়াত। দলটির অভিযোগ, বিভিন্ন উপজেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সভাপতি বা দলীয় পদধারীদের বসানো হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হচ্ছে যে, আসন্ন নির্বাচনে তাদের সুবিধা দিতেই এটি করা হয়েছে। পদায়িত ব্যক্তিরা সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও অর্থ ব্যবহার করে নির্বাচনী মাঠ নিজেদের অনুকূলে প্রস্তুত করার সুযোগ পাবেন। তাই কেবল তফসিল ঘোষণার পর পদত্যাগ করলেই হবে না, বরং তফসিলের আগে পদত্যাগ করলেও এই প্রশাসকদের আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ বন্ধ রাখার দাবি জানায় দলটি।
এদিকে নির্বাচন কমিশনে নতুন নিয়োগ পাওয়া অতিরিক্ত সচিব শামসুল আলমকে নিয়েও কমিশনের কাছে আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানিয়েছে জামায়াত। মিয়া গোলাম পরওয়ার দাবি করেন, ওই কর্মকর্তা সরাসরি একটি রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত ছিলেন এবং বিএনপির নির্বাচনবিষয়ক সাব-কমিটির সদস্য ছিলেন। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইসিতে এমন রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যক্তিকে নিয়োগ দেয়া সংবিধান ও আইনের পরিপন্থী। অবশ্য ইসির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ না হলেও জামায়াতের এই উদ্বেগের বিষয়টি লিখিতভাবে সরকারকে অবহিত করবে।
স্থানীয় নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণায় মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও সরকারি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের অংশগ্রহণে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে নতুন আচরণ বিধিমালা তৈরির আহ্বান জানিয়েছে দলটি। জামায়াত জানায়, অতীতে এ বিষয়ে অস্পষ্টতা ছিল, যা এবার দূর করা প্রয়োজন। ইসি এ বিষয়ে ইতিবাচক বিবেচনা করার আশ্বাস দিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, তারা এখনো নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থাশীল এবং এখনই নির্বাচন বর্জনের মতো কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। তবে ক্ষমতাসীন দলীয় সরকারের অধীনে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ইসির মধ্যে এক ধরনের ‘অসহায়ত্ব’ ও চাপ লক্ষ করা গেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। একই সাথে গণমাধ্যমে সমালোচনা ও আপত্তির মুখে অতিরিক্ত সচিবের নিয়োগের বিষয়টি নিয়ে সরকার উপযুক্ত পদক্ষেপ নেবে বলে আশা প্রকাশ করে জামায়াত।



