সর্বোচ্চ দামে এলএনজি কিনছে সরকার

যুদ্ধের প্রভাবে ১ সপ্তাহে দাম বেড়েছে ৪ ডলারের বেশি

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

বেশি দামে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কিনতে যাচ্ছে সরকার। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি এমএমবিটিইউ (মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট) এলএনজির দাম বেড়েছে চার ডলারেরও বেশি। এবার প্রতি এমএমবিটিইউ ২৮ ডলারের বেশি দামে এলএনজি কেনার অনুমোদন দিয়েছে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।

গতকাল বুধবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কমিটির বৈঠকে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে এ অনুমোদন দেয়া হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বেড়েছে। এর ফলে আগের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। একটি কার্গো এলএনজি আমদানিতে এখন সরকারের ব্যয় হচ্ছে প্রায় এক হাজার ১০০ কোটি টাকা। যুদ্ধের আগে একই পরিমাণ এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হতো প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা।

এ দিকে গত ২৪ আগস্ট অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে প্রতি এমএমবিটিইউ ২৪ দশমিক ৬৩ ডলার দরে এলএনজি কেনার অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। এর এক সপ্তাহ আগে, ১৭ আগস্টের বৈঠকে প্রতি এমএমবিটিইউ ২৩ দশমিক ৯৩ ডলার দরে এলএনজি কেনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। অর্থাৎ মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে এলএনজির দর বেড়েছে চার ডলারের বেশি।

অথচ গত বছরের ডিসেম্বরেও সরকার প্রতি এমএমবিটিইউ ১০ দশমিক ৫০ ডলারের কম দামে এলএনজি কিনতে পেরেছিল। ফলে কয়েক মাসের ব্যবধানে আমদানি করা এলএনজির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

তিন কার্গো এলএনজি, দর ২৮ ডলারের কাছাকাছি

জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের প্রস্তাব অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক কোটেশন সংগ্রহের মাধ্যমে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে তিন কার্গো এলএনজি কেনা হবে। এর মধ্যে ২৫-২৬ সেপ্টেম্বরের জন্য ৪৯তম, ১-২ অক্টোবরের জন্য ৫০তম এবং ৫-৬ অক্টোবরের জন্য ৫১তম কার্গো কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে।

তিন কার্গোর জন্য পৃথক তিনটি প্রতিষ্ঠানের দর সুপারিশ করা হয়েছে। ৪৯তম কার্গোর জন্য আরামকো ট্রেডিং সিঙ্গাপুরের দর প্রতি এমএমবিটিইউ ২৭ দশমিক ৫৪ ডলার। ৫০তম কার্গোর জন্য বিপি সিঙ্গাপুরের দর ২৮ দশমিক ০৩ ডলার। আর ৫১তম কার্গোর জন্য ভিটল এশিয়া পিটিই লিমিটেড, সিঙ্গাপুরের দর ২৬ দশমিক ৬৬৮৮ ডলার।

অন্য দিকে জিটুজি (সরকার-টু-সরকার) ভিত্তিতে আরামকো ট্রেডিং সিঙ্গাপুর ও পেট্রোবাংলার মধ্যে স্বাক্ষরিত স্বল্পমেয়াদি এলএনজি ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির আওতায় অতিরিক্ত এক কার্গো এলএনজি কেনার প্রস্তাবও অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।

এ কার্গোটি ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে। আরামকো ট্রেডিং সিঙ্গাপুর থেকে প্রতি এমএমবিটিইউ ২৩ দশমিক ৯৮ ডলার দরে এলএনজি কেনা হবে। বৈঠকে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের উত্থাপিত উভয় প্রস্তাবই অনুমোদন করা হয়।

র‌্যবের সদর দফতর হচ্ছে ১৭২ কোটি টাকায়

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) জন্য ১১তলা সদর দফতর নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ভবনটি নির্মাণে ব্যয় হবে ১৭১ কোটি ৯০ লাখ সাত হাজার ৭৬৪ টাকা। সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এ অর্থ ব্যয়ের অনুমোদন দেয়া হয়েছে।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব উত্থাপন করে। ‘র‌্যাব ফোর্সেস সদর দফতর নির্মাণ’ প্রকল্পের আওতায় ভবনটি নির্মাণ করা হবে। প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে গণপূর্ত অধিদফতর।

দরপত্রের সব প্রক্রিয়া শেষে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে গ্রহণযোগ্য সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান এম জামাল অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের কাছ থেকে ১৭১ কোটি ৯০ লাখ সাত হাজার ৭৬৪ টাকায় কাজটি দেয়ার প্রস্তাব করা হয়। বৈঠকে সেই প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় ১৫ তলা ভিত্তির ওপর ১১ তলা র‌্যাব সদর দফতর ভবন নির্মাণ করা হবে। ভবনটিতে মহাপরিচালকের কার্যালয় ছাড়াও তিনটি ভূগর্ভস্থ তলা, নিচতলায় গাড়ি পার্কিং এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য সুবিধা থাকবে।

এ ছাড়া প্রকল্পের আওতায় তিনতলা ম্যাগাজিন ও কোর্ট ভবন, তিনতলা উপকেন্দ্র ভবন, গুদাম, পাম্প ও জলাধার, গভীর নলকূপ, পানি সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থা, অভ্যন্তরীণ সড়ক, গাড়ি ধোয়ার ব্যবস্থা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা, সালামি মঞ্চ, বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক ব্যবস্থা, বহির্বৈদ্যুতিক সংযোগ, লিফট, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং স্থানীয় নেটওয়ার্কসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে।

অষ্টম-নবম শ্রেণীর বই কিনতে ৭৩৯ কোটি টাকা অনুমোদন

২০২৭ শিক্ষাবর্ষে অষ্টম ও নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যের পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ, বাঁধাই ও সরবরাহে মোট ৭৩৯ কোটি ১৩ লাখ ২৩ হাজার ১৩৯ টাকা ব্যয়ের অনুমোদন দেয়া হয়েছে।

সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে অষ্টম শ্রেণীর বাংলা ও ইংরেজি সংস্করণ এবং দাখিল ও কারিগরি স্তরের বিনামূল্যের পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ, বাঁধাই ও সরবরাহের দরপ্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। এ জন্য ১০০টি দরপত্রের মাধ্যমে তিন কোটি ৯৩ লাখ ৭৩ হাজার ৫১৫টি পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ, বাঁধাই ও সরবরাহের উদ্যোগ নেয়া হয়।

উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বানের পর মোট ১৫৪টি দরপ্রস্তাব জমা পড়ে। এর মধ্যে ১৩৪টি দরপ্রস্তাব গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয়। সব প্রক্রিয়া শেষে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি ১০০টি দরপত্রের মধ্যে ৯৮টির বিপরীতে গ্রহণযোগ্য সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বই কেনার সুপারিশ করে।

সুপারিশ অনুযায়ী, তিন কোটি ৮৬ লাখ ৬১ হাজার ৩৮৩টি পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ, বাঁধাই ও সরবরাহে ব্যয় হবে ২৪৪ কোটি ২১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৫৯ টাকা। অর্থাৎ কাগজ, মুদ্রণ, বাঁধাই ও সরবরাহসহ প্রতিটি পাঠ্যপুস্তকে গড়ে ব্যয় হবে ৬৩ টাকা ১৭ পয়সা।

এ ক্রয় প্রস্তাবে ৯২টি লটে প্রথম সর্বনিম্ন দরদাতা এবং ছয়টি লটে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। বাকি দু’টি লটের জন্য পুনঃদরপত্র আহ্বানের সুপারিশ করা হয়।

সরকারি ভর্তুকি মূল্যে বিক্রির জন্য ৪৪৫ কোটি টাকার তেল ও ডাল কেনার প্রস্তাবও সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে অনুমোদন দেয়া হয়েছে।

মরক্কো থেকে ৬৮৯ কোটি টাকার সার কিনবে সরকার

মরক্কো থেকে ৭০ হাজার মেট্রিক টন ডিএপি ও টিএসপি সার আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ৪০ হাজার মেট্রিক টন ডিএপি এবং ৩০ হাজার মেট্রিক টন টিএসপি সার রয়েছে। দুই ধরনের সার আমদানিতে মোট ব্যয় হবে ৬৮৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা।

বৈঠকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি পর্যায়ে চুক্তির আওতায় মরক্কো থেকে ৪০ হাজার মেট্রিক টন ডিএপি সার আমদানির অনুমোদন দেয়া হয়। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) মাধ্যমে এ সার আমদানি করা হবে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতি মেট্রিক টন ডিএপি সারের দাম পড়বে ৮৯৪ ডলার। ৪০ হাজার মেট্রিক টন সারের মোট মূল্য তিন কোটি ৫৭ লাখ ৬০ হাজার ডলার, যা বাংলাদেশী মুদ্রায় ৪৪০ কোটি ৯২ লাখ আট হাজার টাকা। কৃষি ভর্তুকির বাজেট থেকে এ অর্থ পরিশোধ করা হবে।

মরক্কো থেকে সরকারি পর্যায়ে ডিএপি সার আমদানির আগের চুক্তির কার্যক্রম শেষ হওয়ায় গত ২৫ জুন নতুন করে চুক্তি নবায়ন করা হয়েছে। ওই চুক্তিতে নির্ধারিত মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারের বর্তমান দর বিবেচনায় নিয়ে এবার ডিএপি সারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।