কৃষক স্মার্ট কার্ড বাস্তবায়নে আজ আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে কৃষি খাতে ডিজিটাল রূপান্তরের বড় উদ্যোগ ‘কৃষক স্মার্ট কার্ড’ প্রবর্তনের প্রক্রিয়া জোরদার করছে সরকার। এ লক্ষ্যে আজ বৃহস্পতিবার কৃষি মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হবে। ভর্তুকি, কৃষি উপকরণ ও সেবা বিতরণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রকল্পটিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার।

কৃষিসচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিতব্য সভায় কৃষি মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালক আব্দুর রহিম, পল্লী উন্নয়ন একাডেমি বগুড়ার ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ড. আব্দুল মজিদ এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের বৃহত্তম প্রকল্প ‘পার্টনার’-এর প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর আবুল কালাম আজাদসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন। বৈঠকে কার্ড বাস্তবায়নের রূপরেখা, কারিগরি প্রস্তুতি, ডেটাবেজ সমন্বয় ও মাঠপর্যায়ের কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসে। সরকার গঠনের পরপরই কৃষক কার্ড প্রবর্তনের উদ্যোগ নেয়া হয়। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে উচ্চপর্যায়ের এক সভায় দ্রুত সময়ের মধ্যে কৃষকদের স্মার্ট কার্ড প্রদান নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এরপর থেকেই প্রশাসনিক তৎপরতা বেড়েছে।

জানা যায়, ২০২৩ সালে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরসহ সাতটি সংস্থাকে নিয়ে ‘পার্টনার’ প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু হয়। প্রায় সাত হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্পে শুধু কৃষক স্মার্ট কার্ড বাস্তবায়নের জন্য ৭২১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে প্রশাসনিক ও কারিগরি জটিলতায় গত আড়াই বছরে বাস্তবায়ন অগ্রগতি মন্থর ছিল। ২০২৫ সালে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর ‘কৃষক স্মার্ট কার্ড নীতিমালা ২০২৫’-এর খসড়া প্রণয়ন করে, যা বর্তমানে চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

নীতিমালার রূপরেখা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত কৃষক ডেটাবেজ গড়ে তোলা হবে। আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষক ও কৃষাণীদের কাছে ই-কৃষি ও ই-এক্সটেনশন সেবা পৌঁছে দিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর, টেকসই কৃষি ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপনই এর লক্ষ্য। প্রত্যেক কৃষকের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই সাপেক্ষে একটি ডিজিটাল প্রোফাইল তৈরি করা হবে, যা ইউনিক আইডি হিসেবে ব্যবহৃত হবে।

স্মার্ট কার্ডের মাধ্যমে সরকারি ভর্তুকি ও পুনর্বাসন সহায়তা দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে বিতরণের জন্য ই-ভাউচার ও ই-সাবসিডি ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব রয়েছে। সার, বীজ, সেচ ও কীটনাশক সংগ্রহ এবং সরকারিভাবে কৃষিপণ্য সরাসরি ক্রয়ের ক্ষেত্রেও কার্ড ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে ভর্তুকি ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম কমবে এবং প্রকৃত কৃষক সরাসরি উপকৃত হবেন বলে সংশ্লিষ্টদের আশা।

নীতিমালায় কার্ডটির নাম নির্ধারণ করা হয়েছে ‘কৃষক স্মার্ট কার্ড’ (সংক্ষেপে কেএসসি)। এটি ফিজিক্যাল, ভার্চুয়াল অথবা উভয় রূপে চালু হতে পারে- সরকার তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। কার্ডে কৃষকের পরিচয়, ভূমির মালিকানা, মৌসুমভিত্তিক উৎপাদন তথ্য এবং ই-কৃষি সেবা গ্রহণের বিবরণ সংরক্ষিত থাকবে।

কার্ডের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্রধারী ১৮ বছর বা তদূর্ধ্ব যেকোনো বাংলাদেশী নাগরিক, যিনি সরাসরি ফসল উৎপাদনের সাথে সম্পৃক্ত, আবেদন করতে পারবেন। ভূমিহীন (বর্গাচাষি/ভাগাচাষি) থেকে শুরু করে প্রান্তিক, ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ- সব শ্রেণীর কৃষক এর আওতায় থাকবেন। জমির পরিমাণ অনুযায়ী প্রান্তিক (০.৫ একরের কম), ক্ষুদ্র (০.৫-২.৫ একর), মাঝারি (২.৫-৭.৫ একর) ও বৃহৎ (৭.৫ একরের বেশি) কৃষকের সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধনযোগ্য।

নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয়, ইউনিয়ন পরিষদের কৃষি বিষয়ক কমিটি এবং মনোনীত সেবা কেন্দ্রের মাধ্যমে কার্ড বিতরণ করা হবে। প্রতি ১০ বছর অন্তর নবায়নের বিধান রাখা হয়েছে। ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও জাতীয় পর্যায়ে পৃথক কমিটি গঠনের প্রস্তাবও রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফ্যামিলি কার্ডের মতো দ্রুততা হয়তো সম্ভব হবে না; তবে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পে যেন ধীরগতি না আসে, সে বিষয়ে বিশেষ নজর রাখা হবে। প্রয়োজনে ‘পার্টনার’ প্রকল্পে স্মার্ট কার্ড খাতে বরাদ্দ ও কার্যক্রমের পরিধি বাড়ানো হতে পারে। আজকের বৈঠকে এসব বিষয়েই দিকনির্দেশনা আসতে পারে বলে জানা গেছে। সব মিলিয়ে কৃষক স্মার্ট কার্ড বাস্তবায়িত হলে দেশের কৃষি খাতে সমন্বিত ও তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠবে- এমন প্রত্যাশাই সংশ্লিষ্টদের।