প্রথম ম্যাচে ১-৭ গোলে হার। জার্মানির বিপক্ষে ওই বাজে হারেই বিশ্বকাপ ফুটবলে অভিষেক হয়েছিল কুরাসাওয়ের। তখন সবার মুখেই এক কথা ছিল, এবারের বিশ্বকাপ ফুটবলের সবচেয়ে বাজে দল এই কুরাসাও। যাদের যাত্রাই শুরু হয় নিজ জাল থেকে সাতবার বল কুড়ানোর মাধ্যম, তাদের কাছে পরে বড় কিছু আশা করাটা বোকামি। তবে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের কাছে ক্যারিবিয়ান সাগরে ভেসে থাকা ছোট্ট এই দ্বীপ রাষ্ট্রটির ওই বড় হার ছিল স্রেফই এক দুর্ঘটনা। তা পরের ম্যাচেই প্রমাণ। গত পরশু রাতে এই কুরাসাও গোলশূন্যেতে রুখে দিয়েছে ইকুয়েডরকে। এই ল্যাতিন দেশটি কিন্তু তাদের জোনে অনেক বড় শক্তি। ইকুয়েডরকে ঠেকিয়ে দিয়ে এই প্রথম পয়েন্টের দেখা কুরাসাওয়ের। আর এই অর্জনের নেপথ্য নায়ক গোলরক্ষক ইলয় রুম। ম্যাচে তিনি ১৫টি সেভ করে শুধু দলকে ইতিহাস গড়া এক পয়েন্টই এনে দেননি, সেই সাথে গড়ে ফেলেছেন নতুন রেকর্ডও। ৯০ মিনিটের ম্যাচে ১৫ সেভ করা প্রথম গোলরক্ষক তিনি। তার আগে ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপে ১৬টি সেভ করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের টিম হাওয়ার্ড। বেলজিয়ামের বিপক্ষে সেই ম্যাচ অবশ্য অতিরিক্ত সময়ে গড়িয়েছিল। ফলে রেকর্ড এখন ইলয় রুমেরই। কুরাসাওয়ের মতোই এবারের বিশ্বকাপে অভিষেক কেপ ভার্দের। আটলান্টিক মহাসাগরের পূর্ব পাড়ে থাকা এই আফ্রিকান দেশও প্রথম ম্যাচে রুখে দিয়েছিল সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনকে। সেই ম্যাচেও নায়ক ছিলেন গোলরক্ষক ভোজিনহা। সেই ম্যাচে তিনি সাতটি সেভ করে দলকে প্রথম পয়েন্ট এনে দেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবল এবং আবহাওয়ার সাথে অতি পরিচিত এই ইলয় রুম। যুক্তরাষ্ট্রেরই ইউএসএল চ্যাম্পিয়শিপের দল মিয়ামিতে খেলেন। এই লিগ লিওনেল মেসিদের মেজর লিগের নিচের স্তরের। নিজ দেশ আটলান্টিক মহাসাগরে দ্বীপে হলেও ইলম রুমের জন্ম নেদারল্যান্ডসে। সেখানেই ফুটবলে হাতে খড়ি। এরপর ভিতেসে, পিএসভি, কলম্বাস ক্রু, বেলজিয়ামের সার্কেল ব্রুজের হয়ে এখন যুক্তরাষ্ট্রের লিগে।
ভোজিনহা বা জসিমার জোসে এভারো দিয়াজ তিনি যেমন স্পেনকে রুখে দিয়ে ম্যাচসেরা হয়েছেন, বনে গেছেন জাতীয় বীরে, ইলয় রুমও তাই। তার একক কৃতিত্বেরই ইতিহাস গড়া প্রথম পয়েন্ট বিশ্বকাপে কুরাসাওয়ের। লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো দুইজনের কেউই কোনো দেশের প্রথম স্তরের লিগের খেলোয়াড় নন। ইলয় রুম যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় স্তরের লিগের ক্লাব মিয়ামিতে খেলেন। আর ভোজিনহা পর্তুগালের দ্বিতীয় টায়ারের লিগের ক্লাব চেভেজের গোলরক্ষক। ভোজিনহা ও ইলম রুম দুইজনই বয়স্ক গোলরক্ষক। ভোজিনহার বয়স ৪০। আর ইলম রুমের বয়স ৩৭।
বিশ্বকাপ ফুটবলে ২০০২ সালে অভিষেক ইকুয়েডরের। এ নিয়ে পাঁচবার তারা বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চে খেললেও দ্বিতীয় রাউন্ডের বেশি যেতে পারেনি। এবার তো প্রথম ম্যাচেই আইভোরি কোস্টের কাছে শেষ মুহূর্তের গোলে ০-১-এ হার। ফলে নক আউটের আশা জিইয়ে রাখার জন্য কুরাসাওয়ের বিপক্ষে জয়ের বিকল্প ছিল না। আর যেহেতু জার্মানির কাছে আগের ম্যাচে কুরাসাও ১-৭ গোলে হেরেছিল তাই তাদের দুর্বলই ভেবেছিল ইকুয়েডর। যে কারণে শুরু থেকেই চড়াও হওয়া। এই ঝড়ের মধ্যে একাই লড়ে গেলেন ইলয় রুম।
ম্যাচে ২৭ বার গোল প্রচেষ্টা চালায় ল্যাতিন আমেরিকার দেশটি। এর মধ্যে ১৫টি ছিল অন টার্গেট। এই ১৫টি চেষ্টাই রুখে দিয়েছেন কুরাসাওয়ার গোলরক্ষক। ফলে নিশ্চিত হয় একটি পয়েন্ট। এই পয়েন্টের ওপর ভর করে এখন এই দ্বীপ রাষ্ট্রটি স্বপ্ন দেখছে সেরা ৩২-এ যাওয়ার। এ জন্য জিততে হবে আইভোরি কোস্টের বিপক্ষে।
সেই লক্ষ্য যদি নাও পূরণ হয়, এর পরও বিশ্বকাপে এসেই খালি ফেরার বদলে এক পয়েন্ট ভাণ্ডারে ভরাটাও কিন্তু কম নয়। বিশ্বকাপে আসার আগে কুরাসাও চারটি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলে তিনটিতেই বড় ব্যবধানে হেরেছিল। চীনের কাছে ০-২ গোলে, অস্ট্রেলিয়ার কাছে ১-৫ ও স্কটল্যান্ডের কাছে ১-৪ হার। অবশ্য শেষ প্রস্তুতি ম্যাচে নিজ এলাকার দেশ আরুবার বিপক্ষে ৪-০ তে জিতেছিল। আর বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব এবং কনকাকাফ গোল্ডকাপ মিলে ২০২৫ সালের জুন থেকে খেলা ৯ ম্যাচের আটটিতেই ছিল অপরাজিত। সুতরাং আইভোরি কোস্টের বিপক্ষেও তাদের জয়ের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না।
স্বপ্ন বেঁচে আছে কেপ ভার্দেরও। তারা পুরের দুই ম্যাচ থেকে তিন পয়েন্ট পেলেও সম্ভাবনা জিইয়ে রাখবে। এই কেপ ভার্দে বাছাই পর্বে ক্যামেরুন, অ্যাঙ্গোলার মতো দলকে টপকে বিশ্বকাপে এসেছে। প্রায় ৫ লাখ লোক বসতির দেশ কেপ ভার্দের আয়তন ১৫৫৭ মাইল। আর কুরাসাও মাত্র ১১৭ মাইলের দেশ। লোক সংখ্যা দেড় লাখের ওপরে। ক্ষুদ্র এই দুই দেশ এখন দুই গোলরক্ষকের কৃতিত্বে সবার কাছে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে।



