ডিপ্লোম্যাটের বিশ্লেষণ

মিয়ানমারে মাইটসন বাঁধ ফের নির্মাণ করবে চীন

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

৩.৬ বিলিয়ন ডলারের মাইটসন বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পটি চীন আগামী ৮ বছরের মধ্যে নির্মাণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। মিয়ানমারের সামরিক সরকার ২০১১ সালে এ প্রকল্পটি স্থগিত করলেও চীন এ বাঁধ প্রকল্প পুনরায় চালু করার জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। মাইটসন বাঁধ প্রকল্পটি মূলত ২০০৬ সালে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকার অনুমোদন দেয়। এটি মালি এবং এন’মাই নদীর সংযোগস্থলে অবস্থিত, যেখান থেকে ইরাবতী নদীর উৎপত্তি।

২০১১ সালে ব্যাপক জনবিক্ষোভ এবং পরিবেশগত উদ্বেগের কারণে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন প্রকল্পটি স্থগিত করেছিলেন। তবে বর্তমান জান্তা সরকার এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে এবং জানিয়েছে যে প্রকল্পটি দ্রুতই শুরু হবে।

পুনরুজ্জীবনের প্রধান কারণ

চীনের চাপ ও নির্ভরতা : চীন এই প্রকল্প পুনরায় শুরু করার জন্য দীর্ঘকাল ধরে চাপ দিয়ে আসছে। বর্তমানে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জান্তা সরকার চীনের ওপর ক্রমবর্ধমানভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ায় বেইজিংয়ের এই দাবিকে গুরুত্ব দিতে হচ্ছে।

বিদ্যুৎ ঘাটতি পূরণ : জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং দাবি করেছেন যে, যদি প্রকল্পটি আগে সম্পন্ন হতো, তবে বর্তমানে মিয়ানমার দেশজুড়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎসুবিধা পেত।

প্রাথমিক প্রস্তুতি : কাচিন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী খেত হতেন নান জানিয়েছেন যে, প্রকল্পের অনেক প্রাথমিক কাজ আগেই শেষ হয়ে থাকায় এটি নির্ধারিত ১০ বছরের পরিবর্তে আট বছরে শেষ করা সম্ভব।

চ্যালেঞ্জ ও বিতর্ক প্রকল্পটি ঘিরে এখনো বেশ কিছু গভীর সঙ্কট বিদ্যমান : জনগণের বিরোধিতা : অতীতে এই প্রকল্পের উৎপাদিত বিদ্যুতের ৯০ শতাংশ চীনে রফতানি করার পরিকল্পনা নিয়ে তীব্র জনরোষ তৈরি হয়েছিল। বর্তমানেও জনমত গঠন একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

নিরাপত্তাঝুঁকি : কাচিন ইন্ডিপেন্ডেন্স আর্মি এই প্রকল্পের বিরোধিতা অব্যাহত রেখেছে। কাচিন রাজ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে প্রকল্পটি আবারো বাধাগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। স্বচ্ছতার অভাব : প্রকল্পের সংশোধিত চুক্তি, মালিকানা বা পরিচালনার কাঠামো নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো দাফতরিক তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তবে জান্তা সরকার প্রকল্পের কারিগরি এবং জনযোগাযোগের বিষয়গুলো দেখভালের জন্য একটি নতুন নেতৃত্ব দল গঠন করেছে। পরিবেশগত প্রভাব এবং স্থানীয় জনগণের উদ্বেগের বিপরীতে সরকার কিভাবে ভারসাম্য রক্ষা করবে, তা এখনো অনিশ্চিত, বেইজিংয়ের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার জন্য এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন মিয়ানমারের বর্তমান সরকারের কাছে একটি বড় দায়বদ্ধতা হিসেবে দেখা দিয়েছে।

এ দিকে কাচিন রাজ্য সংসদের সদস্য হতেত পাইং হতেত রয়টার্সকে জানিয়েছেন যে, প্রকল্পের কাজ ‘শিগগিরই শুরু হবে’। তিনি আরো বলেন, ‘একটি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা প্রকাশ করা হবে। স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ইতোমধ্যে জানিয়েছেন যে, এটি পুনরায় শুরু করা হবে’। জানুয়ারি মাস থেকে মুখ্যমন্ত্রী খেত হতেইন নান, যিনি আগে এই বাঁধের বিরোধিতা করেছিলেন, তিনি এখন কাচিন রাজ্যজুড়ে ধারাবাহিক জনসভা করছেন এবং স্থানীয়দের এই প্রকল্পে সমর্থন দেয়ার জন্য অনুরোধ করছেন। গত ২৩ জুন মোহন্যিন টাউনশিপে অনুষ্ঠিত এক সভায় মুখ্যমন্ত্রী স্বীকার করেন যে, তিনি মাইটসন বাঁধ প্রকল্পের বিরোধিতা করার জন্য অনুতপ্ত। তিনি ঘোষণা করেন যে, সামরিক সমর্থিত সরকার নির্মাণকাজ চালিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর।

মিয়ানমারের জান্তা সরকার বর্তমানে চীনের ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরশীল হওয়ায় তারা চীনা উদ্বেগগুলোকে গুরুত্ব সহকারে নিতে বাধ্য হচ্ছে। ২০২৪ সালের এপ্রিলে সামরিক জান্তা এই প্রকল্পের জন্য একটি নতুন নেতৃত্ব দল গঠন করে, যাদের কাজ হলো গবেষণা করা, প্রযুক্তিগত সমাধান খোঁজা এবং চীনের ডেভেলপার কোম্পানির সাথে মিলে জনসংযোগ পরিচালনা করা। সরকারের মুখপাত্র খাইং খাইং সোয়ে জানিয়েছেন যে, নেতিবাচক প্রভাবের বিপরীতে সুবিধার পরিমাণ বিশ্লেষণ করে একটি ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে এবং প্রশাসনকে জনসম্মতি নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তবে এ প্রকল্পের চুক্তির সংশোধিত শর্তাবলি বা মালিকানা স্বত্ব সম্পর্কে কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। উত্তর মিয়ানমারে চলমান সঙ্ঘাত, বিশেষ করে কাচিন ইন্ডিপেন্ডেন্স আর্মি যদিও সরাসরি ওই এলাকা দখল করেনি, তবে নিকটবর্তী অঞ্চলে যুদ্ধ শুরু হলে প্রকল্পটি আবারো বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।