১৮০ দিনের কর্মসূচি, সংস্কার উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা

মেধাভিত্তিক রাষ্ট্রগঠনের পরিকল্পনা জনপ্রশাসনের

বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোকে দক্ষ, জবাবদিহিমূলক এবং জনবান্ধব রূপ দেয়ার লক্ষ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় একাধিক উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতির আলোকে মন্ত্রণালয়টি ১৮০ দিনের কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রশাসনিক সংস্কার, নিয়োগ প্রক্রিয়া আধুনিকায়ন এবং মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে বলে জানিয়েছে।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোকে দক্ষ, জবাবদিহিমূলক এবং জনবান্ধব রূপ দেয়ার লক্ষ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় একাধিক উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতির আলোকে মন্ত্রণালয়টি ১৮০ দিনের কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রশাসনিক সংস্কার, নিয়োগ প্রক্রিয়া আধুনিকায়ন এবং মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে বলে জানিয়েছে।

মেরিটোক্র্যাসি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ : সরকারের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার ছিল ‘মেরিটোক্র্যাসির বাংলাদেশ’ বিনির্মাণ। এ লক্ষ্যে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে মেধা, দক্ষতা, সততা, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণকে একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

এই লক্ষ্য পূরণে উপ সচিব ও তদূর্ধ্ব পদে পদোন্নতির বিদ্যমান বিধিমালা (২০০২) যুগোপযোগী করার কাজ শুরু হয়েছে এবং সব মন্ত্রণালয়ের পদোন্নতি নীতিমালা হালনাগাদের জন্য আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

শূন্য পদে নিয়োগ : দেশের সরকারি দফতরগুলোতে প্রায় পাঁচ লাখ শূন্য পদের বিপরীতে দ্রুত নিয়োগের প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ১৮০ দিনের কর্মসূচিতে দুই হাজার ৮৭৯টি শূন্য পদে নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে; ১১-২০ গ্রেডের শূন্য পদের তালিকা সংগ্রহ করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রেরণ করা হয়েছে; এ উদ্যোগ প্রশাসনে জনবলঘাটতি কমিয়ে সেবা প্রদানের গতি বাড়াতে সহায়ক হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

পে-স্কেল ও প্রশাসনিক সংস্কার : নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও অর্থ বিভাগের সাথে সমন্বয় করে কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। একই সাথে প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন গঠনের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে, যার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কারের ভিত্তি তৈরি হবে।

সংবিধানের আলোকে একটি আধুনিক সিভিল সার্ভিস আইন প্রণয়নের লক্ষ্যে কমিটি গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি- সরকারি চাকরি সংক্রান্ত বিদ্যমান আইনগুলো পর্যালোচনা; সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়াল (২০২০) এবং নির্দেশিকা (২০২২) হালনাগাদ করা হয়েছে। এই পদক্ষেপগুলো প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়াবে।

প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন : দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে দেশে ও বিদেশে ব্যাপক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। ১৮০ দিনে : দেশে এক হাজার ৫০০ এবং বিদেশে ১০০ কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে লক্ষ্য : দেশে চার হাজার এবং বিদেশে ৪০০ কর্মকর্তার প্রশিক্ষণ। এতে প্রশাসনের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নে গুণগত পরিবর্তন আসবে।

ই-গভর্ন্যান্স ও ডিজিটাল রূপান্তর : ডিজিটাল প্রশাসন গড়ে তুলতে একাধিক মডিউল চালু বা উন্নয়ন করা হয়েছে : জিইএমএস (সরকারি কর্মচারী ব্যবস্থাপনা সিস্টেম); অনলাইন বদলি ও পদায়ন ব্যবস্থা; অনলাইন পেনশন মডিউল; প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার- এসব উদ্যোগ প্রশাসনে স্বচ্ছতা, দ্রুততা এবং তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিশ্চিত করবে।

বেসরকারি খাতেও নীতিমালা : বেসরকারি চাকরিজীবীদের অধিকার নিশ্চিত করতে বেসরকারি সার্ভিস রুল প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে অংশীজনদের সাথে মতবিনিময় ও আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

পাবলিক সার্ভিস কমিশন শক্তিশালীকরণ : সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরো নিরপেক্ষ ও কার্যকর করতে পাবলিক সার্ভিস কমিশন পুনর্গঠনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে- লিখিত পরীক্ষায় স্বচ্ছ মূল্যায়ন পদ্ধতি; মৌখিক পরীক্ষায় যোগ্যতাভিত্তিক মূল্যায়ন; বিশেষজ্ঞ প্যানেল গঠন করা হয়েছে।

অর্থায়ন ও বাজেট পরিকল্পনা : ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ চার মাসে প্রায় ১৬.৫ কোটি টাকা এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুতে অতিরিক্ত বরাদ্দের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। বেশির ভাগ কর্মসূচি রাজস্ব বাজেটের আওতায় বাস্তবায়িত হবে।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা (৫ বছর) : আগামী পাঁচ বছরে মন্ত্রণালয়ের প্রধান লক্ষ্যগুলো- সম্পূর্ণ মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও পদোন্নতি ব্যবস্থা; ডিজিটাল মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা (জিইএমএস) সর্বস্তরে বাস্তবায়ন; ১২ হাজার + কর্মকর্তার প্রশিক্ষণ; প্রশাসনিক কাঠামোর পুনর্বিন্যাস; দলীয়করণমুক্ত পেশাদার প্রশাসন প্রতিষ্ঠা।

সামগ্রিক মূল্যায়ন : জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ১৮০ দিনের কার্যক্রমে একটি স্পষ্ট প্রবণতা দেখা যাচ্ছে- প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে দক্ষ, প্রযুক্তিনির্ভর এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থায় রূপান্তর করা। তবে বাস্তব চ্যালেঞ্জও কম নয়। পাঁচ লাখ শূন্য পদে নিয়োগ, নতুন আইন প্রণয়ন এবং প্রশাসনিক সংস্কারের মতো বড় লক্ষ্য অর্জনে ধারাবাহিকতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা অপরিহার্য হবে।

যদি ঘোষিত কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়নে ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, তবে বাংলাদেশের জনপ্রশাসন একটি আধুনিক, দক্ষ ও মেধাভিত্তিক কাঠামোয় রূপ নিতে পারে, যা রাষ্ট্রের সামগ্রিক সুশাসন ও উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।