কাজী খোরশেদ আলম বুড়িচং (কুমিল্লা)
লাল, সাদা ও বিরল হলুদ পদ্মের অপরূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হচ্ছেন দর্শনার্থীরা। বর্ষা এলেই কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার দক্ষিণগ্রামের ঐতিহ্যবাহী পদ্মবিলজুড়ে ফুটে ওঠে হাজারো পদ্ম। শরতের নীল আকাশের নিচে পানির ওপর পদ্মের সমারোহ বদলে দেয় পুরো বিলের দৃশ্যপট। প্রকৃতির এমন সৌন্দর্যের টানে প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছে দর্শনার্থী। তবে যথাযথ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার অভাবে বিলটির প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের দক্ষিণগ্রামে অবস্থিত এ পদ্মবিল চট্টগ্রাম-সিলেট রেলপথের পূর্ব পাশে এবং কুমিল্লা-বাগড়া সড়কের পশ্চিম পাশে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্ষা মৌসুমে প্রায় ১৫ একর এলাকাজুড়ে পদ্মফুলে ভরে ওঠে বিলটি। লাল, সাদা ও হলুদ পদ্মের পাশাপাশি রয়েছে বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণী। ফলে এটি শুধু দর্শনীয় স্থানই নয়, স্থানীয় জলাভূমির জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থলও।
বিলটির অন্যতম বিশেষত্ব হলো বিরল প্রজাতির হলুদ পদ্ম। পদ্মের এই বৈচিত্র্য নিয়ে অতীতে গবেষণার উদ্যোগও নেয়া হয়েছিল। ২০২১ সালের একটি প্রতিবেদনে পদ্মের বৈচিত্র্য ও সংরক্ষণ নিয়ে গবেষণার অংশ হিসেবে দক্ষিণগ্রাম বিলকে গুরুত্ব দেয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। একই সাথে জলাভূমি ও প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষার বিষয়টিও সামনে আসে। স্থানীয়দের মতে, এই বিলকে সাধারণ কোনো জলাশয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি বুড়িচং তথা কুমিল্লার গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ।
সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পদ্মবিলের সৌন্দর্যের খবর ছড়িয়ে পড়ায় দর্শনার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। নৌকায় চড়ে পদ্মের সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসছেন বিভিন্ন বয়সী মানুষ। এতে স্থানীয়ভাবে নৌকা চলাচল ও ক্ষুদ্র ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টি হলেও অপরিকল্পিতভাবে দর্শনার্থীর চাপ বাড়লে বিলের পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পরিবেশ সচেতন মহলের মতে, দর্শনার্থীদের চলাচলের জন্য নির্দিষ্ট ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পদ্মফুল ও জলজ উদ্ভিদ রক্ষায় নিয়ম-কানুন এবং নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন। একই সাথে বিলের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ও জলজ পরিবেশ যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও নজর দিতে হবে।
স্থানীয়রা বলছেন, দক্ষিণগ্রাম পদ্মবিলকে ঘিরে পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। তবে অপরিকল্পিত পর্যটনের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার। নিরাপদ নৌযান চলাচল, নির্দিষ্ট দর্শনস্থান, পরিচ্ছন্নতা, বসার ব্যবস্থা ও তথ্যসমৃদ্ধ সাইনবোর্ড স্থাপন করা হলে দর্শনার্থীদের সুবিধার পাশাপাশি বিলের পরিবেশও সুরক্ষিত রাখা সম্ভব।
তাদের দাবি, প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, পরিবেশবাদী সংগঠন ও এলাকাবাসীর সমন্বয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ পরিকল্পনা নিতে হবে। বিলের জায়গা দখল, ময়লা-আবর্জনা ফেলা, পদ্মফুল ও জলজ উদ্ভিদের ক্ষতি কিংবা জলাশয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হয়- এমন কর্মকাণ্ড বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। বুড়িচং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো: তানভীর হোসেন বলেন, পদ্মবিল সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। পদ্ম যাতে কেউ ছিঁড়ে নিতে না পারে, সে জন্য সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে। স্থানীয় বাবুল মেম্বারকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে এবং তিনি গ্রাম পুলিশ নিয়ে নিয়মিত মনিটরিং করছেন।
তিনি বলেন, এ বছর পানি প্রায় শুকিয়ে গেছে। আগামী বছর স্থানীয়দের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হবে। যাতে নৌকা ভাড়া সহনীয় পর্যায়ে থাকে এবং কেউ বিল থেকে পদ্মফুল ছিঁড়ে নিতে না পারে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে। বর্ষার শুরু থেকেই বিলটি সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেয়া হবে।
প্রকৃতির অপূর্ব এ সম্পদ হারিয়ে যাওয়ার পর নয়, বরং হারানোর আগেই কার্যকর সংরক্ষণ উদ্যোগ নেয়া গেলে দক্ষিণগ্রাম পদ্মবিল যেমন জীববৈচিত্র্যের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠতে পারে, তেমনি পরিবেশবান্ধব পর্যটনের মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতিতেও ভূমিকা রাখতে পারে।



