সিলেট ব্যুরো
হজরত শাহজালাল (রহ:) মাজারে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও কোটি কোটি টাকার লুটপাট বন্ধে পরিকল্পনা কমিশন ও সরকারের নির্দেশনায় প্রশাসনিক উদ্যোগ নেয়ার শুরুতেই সিলেটের আলোচিত জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো: সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহারপূর্বক বদলি করা হয়েছে। রোববার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব জেতী প্রু স্বাক্ষরিত এক আদেশে তাকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে উপসচিব হিসেবে বদলি করা হয়।
তথ্যটি নিশ্চিত করে বিদায়ী জেলা প্রশাসক মো: সারওয়ার আলম গতকাল জানান, সোমবারই তাকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে যোগ দিতে বলা হয়েছে। মাজারের আয়ের স্বচ্ছতা ফেরাতে সাহসী পদক্ষেপ নেয়ার মাত্র তিন দিনের মাথায় এই আকস্মিক বদলির আদেশ জানাজানি হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেটিজেনদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও বিস্ময় ছড়িয়ে পড়েছে।
সম্প্রতি হজরত শাহজালাল (রহ:) মাজারে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের অংশ হিসেবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেন ডিসি সারওয়ার আলম। দীর্ঘদিনের চরম দুর্নীতি, লুটপাট ও অনিয়মের দেয়াল ভেঙে দিতে গত বৃহস্পতিবার মাজারের দানের ঐতিহ্যবাহী ডেগ সিলগালা করে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নতুন দানবাক্স বসান তিনি। একই সাথে সংগৃহীত অর্থের সুরক্ষায় এই দানবাক্সের পাহারায় আনসার সদস্য নিযুক্ত এবং সিসি ক্যামেরা স্থাপন করেন এই জেলা প্রশাসক।
ডিসি সারওয়ার আলম জানান, মাজারের আয়ের সার্বিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এমন উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। তবে মাজার সংশ্লিষ্টরা দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও রেওয়াজ ভেঙে প্রশাসনের এমন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেন। মাজার কর্তৃপক্ষের এই আপত্তির পরপরই সরকারের এই শীর্ষ কর্মকর্তাকে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত এলো।
গত বছর সিলেটে জেলা প্রশাসক হিসেবে যোগ দেয়ার পর থেকেই নানা ক্ষেত্রে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরব ভূমিকা পালন করে আসছিলেন মো: সারওয়ার আলম। বিশেষ করে মহানগরের ফুটপাথ দখলমুক্ত করা এবং বিপুল পরিমাণ সরকারি জায়গা উদ্ধারসহ তার বেশ কিছু জনকল্যাণমুখী পদক্ষেপ সর্বমহলে ব্যাপক প্রশংসিত হয়।
২৭তম বিসিএসের প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা মো: সারওয়ার আলম এর আগে র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচিত ছিলেন। সিনিয়র সহকারী সচিব পদে থাকাকালীন র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে তিনি তিন শতাধিক ভেজালবিরোধী ও দুর্নীতিবিরোধী সফল অভিযান চালিয়ে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করেন।
২০২০ সালের ৯ নভেম্বর তাকে র্যাবের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব হিসেবে বদলি করা হয়। পরবর্তী সময়ে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হয়ে তিনি নিজের ক্ষোভ ও হতাশা জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার তার এই স্ট্যাটাস দেয়াকে সরকারি চাকরিবিধি লঙ্ঘন ও অসদাচরণ হিসেবে গণ্য করে এবং ২০২২ সালের মে মাসে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাকে ‘তিরস্কারমূলক’ শাস্তি প্রদান করে। দীর্ঘ প্রতিকূলতা পেরিয়ে ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট তিনি উপসচিব পদে পদোন্নতি লাভ করেন।
জনপ্রিয় এই কর্মকর্তার আকস্মিক বদলির আদেশটি প্রকাশ হওয়ার পর থেকেই ফেসবুকে নেটিজেনদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। জেলা প্রশাসকের সততা ও সাহসী ভূমিকার পক্ষে দাঁড়িয়ে কমপক্ষে শতাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তি ও সাধারণ নাগরিক ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন। মাফিয়া ও মাজারের দুর্নীতিবাজ চক্রের স্বার্থ রক্ষার্থেই একজন সৎ কর্মকর্তাকে এভাবে আকস্মিক প্রত্যাহার করা হলো কি না, তা নিয়ে অনেকেই গভীর বিস্ময় ও প্রশ্ন প্রকাশ করেছেন।



