মির্জা মুহাম্মদ নূরুন্নবী নূর
একজন মুসলিম হিসেবে জীবন চলার পথে অসংখ্য নিয়মনীতি মেনে চলতে হয়। আনুগত্য তার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে জীবন চলার প্রতিটি ক্ষেত্রে আনুগত্যের সীমা-পরিসীমা রয়েছে। আমরা কুরআন-হাদিসের আলোকে এ বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করতে চাই।
আনুগত্যের পরিচিতি
আনুগত্য শব্দের আরবি শব্দ ইতাআত। যার শাব্দিক অর্থ হচ্ছে বাধ্যতা, মানা, অধীনতা, স্বীকার করা ইত্যাদি। ইহা দ্বারা কোনো কিছুর প্রতি অটল অবিচল আনুগত্যের মনোভাব পোষণ করা বুঝায়। আনুগত্যের অর্থ দ্বারা কোনো আদেশ বা নির্দেশকে মেনে চলা এবং তা পালনের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ থাকাকেও প্রকাশ করে। এটি এমন একটি নৈতিক আদর্শ যা পরিপালনের মাধ্যমে যার আনুগত্য করা হয় তার সন্তুষ্টি অর্জনের সমূহ সুযোগ সৃষ্টি করে। তাই আমরা বলতে পারি আনুগত্য একটি মহৎকর্ম। অতএব এই গুণ অর্জন করা আমাদের অবশ্য পালনীয় কর্তব্য।
আনুগত্যের ইসলামিক পরিভাষা
ইসলামের দৃষ্টিতে আল্লাহ তায়ালা ও রাসূলুল্লাহ সা:-এর নির্ধারিত আদেশ-নিষেধ পূর্ণ আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সাথে মেনে চলাকে আনুগত্য বা ইতাআত বলে। আরবি ‘ইতাআত’ শব্দ আনুগত্যের পরিপূর্ণ অর্থ নির্দেশ করে। একজন মুসলিম আল্লাহকে নিরঙ্কুশভাবে সব ক্ষমতার মালিক হিসেবে মেনে চলবে এবং ভালো কাজে নিজেদের মতামতকে ত্যাগ করে আল্লাহর নির্দেশ অনুসরণ করবে- এটিই চিরন্তন সত্য এবং স্বাভাবিক। সচেতন বিশ্বাসী মানুষ আল্লাহ, রাসূল এবং তাদের নির্ধারিত নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য করবে- এটিই সঠিক কথা।
আনুগত্যের প্রকারভেদ
স্থান, কাল ও অবস্থাভেদে আনুগত্যের বিভিন্ন প্রকার হয়ে থাকে। আমরা ইসলামিক বিধিবিধান পরিপালনের ক্ষেত্রে তিন প্রকারের আনুগত্য নিয়ে আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ- ১. আল্লাহ তায়ালার আনুগত্য; ২. রাসূলের আনুগত্য ও ৩. উলিল আমরের আনুগত্য।
আল্লাহ তায়ালার আনুগত্য
আল্লাহ তায়ালার আনুগত্য দ্বিধাহীনভাবে মেনে নিতে হবে। এক্ষেত্রে সামান্যতম শৈথিল্য বা অবাধ্য হওয়ার সুযোগ নেই। আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ মানার বিষয়ে ‘আমরা শুনলাম এবং মেনে নিলাম’ এই নীতি অবলম্বন করতে হবে। আল্লাহ তায়ালার আনুগত্য করার গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ তায়ালা রাসূলকে নির্দেশ করে বলেন, ‘বলো, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো। তারপর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ কাফিরদেরকে ভালোবাসেন না।’ (সূরা আলে ইমরান-৩২)
আলোচ্য আয়াত থেকে প্রমাণিত হয়, আল্লাহর কোনো নির্দেশ অমান্য করার মানেই কুফরি করা। আর কাফিরদেরকে তিনি কখনোই ভালোবাসেন না। অতএব আল্লাহ তায়ালার আনুগত্যের গুরুত্ব অপরিসীম তাৎপর্যপূর্ণ। আল্লাহ তায়ালার আনুগত্যের গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন- ‘হে মুমিনগণ, তোমরা আনুগত্য করো আল্লাহর ও আনুগত্য কর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্য থেকে কর্তৃত্বের অধিকারীদের। অতঃপর কোনো বিষয়ে যদি তোমরা মতবিরোধ করো তাহলে তা আল্লাহ ও রাসূলের দিকে প্রত্যার্পণ করাও- যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখো। এটি উত্তম এবং পরিণামে উৎকৃষ্টতর।’ (সূরা আন নিসা-৫৯) আল্লাহ তায়ালার আনুগত্যের মাধ্যমে নিজেদের জীবনে রহমত নেমে আসে। যেমন আল্লাহ তায়ালার ইরশাদ হয়েছে- ‘আর তোমরা আনুগত্য করো আল্লাহ ও রাসূলের, যাতে তোমাদেরকে দয়া করা হয়।’ (সূরা আলে ইমরান-১৩২) আলোচ্য আয়াত থেকে প্রমাণিত হয়, আমরা যদি আল্লাহ তায়ালার সঠিক আনুগত্য করি তাহলে তিনি আমাদের তার রহমত দিয়ে কল্যাণ দান করবেন।
রাসূল সা:-এর আনুগত্য
আমরা যেমন আল্লাহ তায়ালার আনুগত্য করব ঠিক তেমনি রাসূলের আনুগত্যও করতে হবে বিনাবাক্যে। কোনো রকমের শর্তারোপ ছাড়াই রাসূলের আনুগত্য মেনে নিতে হবে। রাসূলের আনুগত্যের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার আনুগত্য, ভালোবাসা ও ক্ষমা অর্জিত হবে। এ বিষয়ের গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ তায়ালা রাসূল সা:-কে উদ্দেশ্য করে বলেন- ‘বলো, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো, তাহলে আমার অনুসরণ কর, আল্লাহ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন। আর আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সূরা আলে ইমরান-৩১) আলোচ্য আয়াত থেকে প্রমাণিত হয় যে, রাসূলের আনুগত্য করলে যেমন আল্লাহ তায়ালার আনুগত্য করা হবে ঠিক তেমনি আল্লাহর ভালোবাসা এবং ক্ষমাও অর্জন করা সম্ভব হবে। তাই রাসূলের আনুগত্যে আমাদের যতœশীল হতে হবে। যা ঈমানী দায়িত্বও বটে। এ বিষয়ে রাসূলের অনেক হাদিসও রয়েছে। যেমন- আল্লাহ তায়ালা, রাসূল এবং উলিল আমরের আনুগত্যের গুরুত্ব বর্ণনায় হাদিসে এসেছে- আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করল, সে আল্লাহ তায়ালার আনুগত্য করল। আর যে আমার অবাধ্যতা করল, সে আল্লাহ তায়ালার অবাধ্যতা করল। আর যে আমিরের (নেতার) আনুগত্য করল, সে আমারই আনুগত্য করল। যে আমিরের অবাধ্যতা করল, সে আমারই অবাধ্যতা করল।’ (বুখারি ও মুসলিম)
উল্লিখিত হাদিস থেকে প্রমাণিত হয়, উলিল আমরের আনুগত্যের মাধ্যমে রাসূলের এবং রাসূলের আনুগত্যের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার আনুগত্য অর্জিত হয়।
উলিল আমরের আনুগত্য
আল্লাহ তায়ালা এবং রাসূলের আনুগত্য কোনো প্রকার শর্তারোপ ছাড়াই বিনাবাক্যে মেনে নিতে হবে। কিন্তু উলিল আমরের আনুগত্য করতে কিছু শর্ত রয়েছে। তার অন্যতম হচ্ছে উলিল আমরের আদেশ-নিষেধ কুরআন এবং হাদিসের পরিপন্থী হওয়া যাবে না। তা যদি কুরআন-হাদিসসম্মত হয় তাহলে উলিল আমরের আনুগত্য করতে হবে। এ বিষয়ে উপরে বর্ণিত কুরআনের আয়াত এবং হাদিসের পাশাপাশি আরো বর্ণনা পাওয়া যায়। যেমন- আনাস রা: থেকে বর্ণিত- রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘তোমরা শুনো এবং আনুগত্য করো, যদিও তোমাদের ওপর হাবশি গোলামকে শাসক নিযুক্ত করা হয়, যার মাথা কিসমিসের ন্যায়।’ (বুখারি)
আরেকটি হাদিসে এসেছে- ইবনে উমার রা: থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘প্রত্যেক মুসলিমের (তার শাসনকর্তার নির্দেশ) শোনা এবং আনুগত্য করা অপরিহার্য; তার মনঃপূত হোক বা না হোক, যতক্ষণ না তাকে গুনাহের দিকে নির্দেশ করে। কিন্তু যদি তাকে গুনাহের কাজের নির্দেশ দেয়া হয়, তখন তা শোনা ও আনুগত্য করা কর্তব্য নয়।’ (বুখারি ও মুসলিম) আলোচ্য হাদিস দু’টি থেকে প্রমাণিত হয়, উলিল আমরের আনুগত্যও জরুরি, যদি না তিনি ইসলামবিরোধী কোনো কাজের নির্দেশ করেন। এছাড়াও ওমরে ফারুক রা: বলেন, ইসলাম নেই সংগঠন ব্যতীত, সংগঠন নেই নেতৃত্ব ব্যতীত এবং নেতৃত্ব নেই আনুগত্য ব্যতীত। এখানেও নেতৃত্ব ও আনুগত্যের গুরুত্ব প্রমাণিত হয়। সবশেষে বর্ণিত আয়াত এবং হাদিসের আলোকে আমরা বলতে পারি, আল্লাহ তায়ালার, রাসূলের এবং উলিল আমরের আনুগত্যের গুরুত্ব অত্যন্ত জরুরি। তাই আমাদের উচিত আনুগত্যের গুরুত্ব উপলব্ধি করে সে মোতাবেক নিজেদের জীবন গঠন করা। আল্লাহ তায়ালা আমাদের তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : প্রাবন্ধিক


