সাক্ষাৎকার : মুহাম্মদ শামসুজ্জামান

ইসলামী ব্যাংকের সঙ্কট পুরো ব্যাংক খাতের তদারকি ব্যবস্থার ব্যর্থতা

ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান সঙ্কট আসলে একটি প্রতিষ্ঠানের পতন নয়, বরং পুরো ব্যাংকিং খাতের তদারকি ব্যবস্থার ব্যর্থতার দলিল। তবে আমি আশাবাদী। যদি এই সরকার নির্মোহ হয়ে সংস্কার করতে পারে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে, তবে ইসলামী ব্যাংক পুনরায় তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে এবং দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

ইসলামী ব্যাংকের সাবেক অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও আর্থিক খাতের বিশ্লেষক মুহাম্মদ শামসুজ্জামান বলেছেন, ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান সঙ্কট আসলে একটি প্রতিষ্ঠানের পতন নয়, বরং পুরো ব্যাংকিং খাতের তদারকি ব্যবস্থার ব্যর্থতার দলিল। তবে আমি আশাবাদী। যদি এই সরকার নির্মোহ হয়ে সংস্কার করতে পারে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে, তবে ইসলামী ব্যাংক পুনরায় তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে এবং দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে।

দৈনিক নয়া দিগন্তকে দেয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন। জনাব শামসুজ্জামান ইসলামী ব্যাংকের প্রারম্ভিক সময় থেকে চার দশকের কাছাকাছি সময় ব্যাংকটিতে কর্মরত ছিলেন। অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে তিনি অবসর গ্রহণ করেন।

নিচে তার সাক্ষাৎকারের বিস্তারিত-

প্রশ্ন : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক নীতি অনুযায়ী, সাবেক মালিকদের ফিরে আসার যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তাকে আপনি দীর্ঘমেয়াদে কেমন দেখছেন?

মুহাম্মদ শামসুজ্জামান : ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে পাস হওয়া ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬’-এর ১৮(ক) ধারা বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে সবচেয়ে আলোচিত ও সমালোচিত বিষয়। এই ধারার মূল উদ্দেশ্য হলো একীভূত (সবৎমবফ) বা রেজুল্যুশন প্রক্রিয়ায় থাকা দুর্বল ব্যাংকের পুরনো মালিকদের পুনরায় মালিকানা ফিরে পাওয়ার সুযোগ দেয়া। এটি একটি দ্বিমুখী তলোয়ারের মতো। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্রের বক্তব্য অনুসারে, যারা ১৮ক ধারায় ফিরে আসতে চান, তাদের ৭.৫ শতাংশ শেয়ারের অর্থ পরিশোধ এবং বিএফআইইউ ও সিআইবির কঠোর স্ক্রিনিং পার হতে হবে। এটি যদি স্বচ্ছভাবে হয়, তবে দক্ষ উদ্যোক্তারা ফিরে এসে ব্যাংক খাতে ভারসাম্য ফেরাতে পারবেন।

কিন্তু আমার ভয়ের জায়গা হলো প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা নিয়ে। অতীতে আমরা দেখেছি, কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেই রাজনৈতিক চাপে নতি স্বীকার করে নিয়ম ভেঙেছে। যদি ‘শেল কোম্পানি’ বা বেনামী প্রতিষ্ঠানগুলো এই সুযোগে পুনরায় বৈধতা পেয়ে যায়, তবে তা হবে দেশের আর্থিক ইতিহাসের বড় ট্র্যাজেডি। আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি শিল্পকারখানা বা ব্যাংক সচল রাখা মানে কেবল মালিককে সুবিধা দেয়া নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও কর্মসংস্থান রক্ষা করা।

বলা হয়েছে ৭.৫% পরিশোধের পর বাকি ৯২.৫ শতাংশ অর্থ ১০ শতাংশ সরল সুদে দুই বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, আগের অধ্যাদেশে যেখানে অপরাধীদের জন্য কোনো ছাড় ছিল না, সেখানে এভাবে ‘কিস্তিতে মালিকানা কেনা’র সুযোগ ব্যাংক লুটপাটকারীদের জন্য নতুন সরকারের এক বড় উপহার। আমি অবশ্য এমন নেতিবাচক কিছু দেখছি না যদি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ভিন্ন কিছু না হয়। কেননা ১৮ ক এ পূর্বতনের কোনো সীমা-পরিসীমা বলা হয়নি। আমি আরো স্পষ্ট করে যদি ধারাটিই উল্লেখ করি, তাতে যেমন যা বলা হয়েছে- ‘আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইন কিংবা এ আইনের অন্যান্য বিধানে যা কিছু থাকুক না কেন, ব্যাংক রেজুল্যুশন অধ্যাদেশ ২০২৫-এর আওতায় তালিকাভুক্ত হওয়ার আগের শেয়ার ধারক অথবা শেয়ার ধারকরা অথবা বাংলাদেশ ব্যাংক উপযুক্ত বিবেচিত ব্যক্তি ওই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ-দায় পুনঃ ধারণ বা ধারণ করার জন্য রেজুল্যুশন কর্তৃপক্ষ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক বরাবর আবেদন করতে পারবে।’

সুতরাং এখানে আদি স্পনসরদেরও ব্যাংক পরিচালনার সুযোগ রাখা হয়েছে। যদি তারা

‘রিক্যাপিটালাইজেশন’ করে, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেয়া অর্থ পুনর্ভরনের অঙ্গীকার করে এবং বাস্তব অর্থে সেরকম সক্ষমতা থাকে তা হলে বরং প্রস্তাবটি প্রশংসিত হতে পারে। আমাকে বলুন এর বাইরে আর উত্তম বিকল্প কী আছে। সরকার তো অর্থের সংস্থান করে ব্যাংক চালাবে না। সে কথা মাননীয় অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেই দিয়েছেন।

প্রশ্ন : আপনার বিশ্লেষণে আপনি ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার হস্তান্তরের ক্ষেত্রে ‘লেয়ারিং’ ও ‘শেল কোম্পানির’ কথা বলেছেন। এই প্রক্রিয়াটি সাধারণ মানুষের বোঝার জন্য সহজভাবে ব্যাখ্যা করবেন কি?

মুহাম্মদ শামসুজ্জামান : এটি আসলে একটি আধুনিক ‘আর্থিক জালিয়াতি’। আইন বলছে, একটি গোষ্ঠী বা পরিবার ৫ শতাংশের বেশি শেয়ার নিতে পারবে না। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট গ্রুপ চাতুর্যের আশ্রয় নিয়েছে অথবা তাকে এমনটি করতে সরকারের দুষ্ট লোকেরাই পরামর্শ দিয়ে করিয়েছে। তারা ২৪টি কাগুজে বা ‘শেল কোম্পানি’ খুলেছে। মজার ব্যাপার হলো, এই কোম্পানিগুলোর প্রতিটির পরিশোধিত মূলধন মাত্র ১০ লাখ টাকা। কিন্তু তারা শেয়ার কিনেছে ১০০০ থেকে ২০০০ কোটি টাকার! ১০ লাখ টাকার পুঁজি দিয়ে কীভাবে হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ সম্ভব? এই কোম্পানিগুলোর ফিজিক্যাল কোনো অস্তিত্ব নেই, কোনো উৎপাদন বা বাণিজ্যিকি তৎপরতা নেই, এমনকি আর্থিক ক্যাপাসিটিও নেই।

এখানেই কাজ করেছে ‘লেয়ারিং’ বা অর্থের উৎস আড়াল করার প্রক্রিয়া। এই কাজটি বাংলাদেশের ‘মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ ও সন্ত্রাস দমন আইন ২০০২’-এ নিষিদ্ধ। বাংলাদেশ ব্যাংক নজিরবিহীনভাবে কোনোরূপ যাচাই-বাছাই ছাড়াই তড়িঘড়ি অধিক রাত জেগে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করে এসব অনৈতিক কাজের অনুমোদন দিয়েছে। এই কোম্পানিগুলো ‘ছায়াসঙ্গী’ হিসেবে একটি বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করেছে। যদি এগুলো প্রকৃত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হতো, তবে তাদের প্রকৃত মালিকদের পর্ষদে দেখা যেত, কিন্তু তারা সবসময় পর্দার আড়ালে থেকে মনোনীত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে ব্যাংকটি নিয়ন্ত্রণ করেছে।

প্রশ্ন : ইসলামী ব্যাংকের প্রতিষ্ঠার পেছনে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের বড় ভূমিকা ছিল। তাদের বিদায় করার বিষয়টি ব্যাংকটির আন্তর্জাতিক ইমেজে কী প্রভাব ফেলেছে?

মুহাম্মদ শামসুজ্জামান : এটি ছিল একটি পরিকল্পিত ‘এক্সপেল স্ট্র্যাটেজি’ বাংলায় বললে ‘খেদাও কৌশল’। ১৯৮৩ সালে আইডিবির মতো প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগ এবং ২৪ শতাংশ স্থানীয় ও ৭৬ শতাংশ বিদেশী বিনিয়োগ নিয়ে যে স্বপ্নের শুরু হয়েছিল, ২০১৭ সালের পর তা চূর্ণ করা হয়। আইডিবি, কুয়েত ফাইন্যান্স হাউজ, আলরাজির মতো বড় বিনিয়োগকারীদের একরকম বাধ্য করা হয়েছে শেয়ার বিক্রি করে চলে যেতে। এমনকি বিদেশী প্রতিনিধিদের এজিএমে যোগ দিতে বাধা দিয়ে শাস্ত্রীর গোয়েন্দা সংস্থার লোকদের সহায়তায় হোটেল থেকে বিমানে তুলে দেয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের বিশ্বাসযোগ্যতা তলানিতে ঠেকেছে। যে ব্যাংকটি এক সময় বিদেশী রেমিট্যান্সের ৩০ শতাংশ একাই আনত, তাকে একঘরে করে ফেলার চেষ্টা হয়েছে।

প্রশ্ন : আপনি উল্লেখ করেছেন যে, কেবল আর্থিক নয়, কর্মকর্তাদের ‘নৈতিক ও আদর্শিক’ ক্ষতিও হয়েছে। এটি বলতে আপনি ঠিক কী বুঝিয়েছেন?

মুহাম্মদ শামসুজ্জামান : দেখুন, ইসলামী ব্যাংক কেবল একটি ব্যাংক নয়, এটি ছিল একটি আস্থার সংস্কৃতি। আমি যখন ১৯৮৪ সালে ব্যাংক প্রতিষ্ঠার বছর প্রথম ব্যাচ প্রবেশনার হিসাবে এই ব্যাংকে যোগ দিই তখন নিজের চোখে দেখেছি, মানুষ অজু করে পবিত্র মনে করে এই ব্যাংকে ঢুকতো। শুধু দেখার উদ্দেশ্য বহু দূর জেলা-উপজেলা থেকে বয়োবৃদ্ধ লোকেরা আসত, জোহর ও আসর সালাত পড়ে দোয়া করত। একটি ইসলামী প্রতিষ্ঠান জ্ঞানলাভ নিয়োগের প্রক্রিয়াও ছিল স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক। কিন্তু বিগত ৮-৯ বছরে রাজনৈতিক বিবেচনায় কেবল একটি উপজেলা থেকেই ১১ হাজার কর্মী নিয়োগ দেয়া হয়েছে- যাদের অনেকেরই প্রয়োজনীয় মেধা বা নৈতিক ভিত্তি ছিল না। ‘বাক্স সিভি’ কালচারের মাধ্যমে নিয়োগ দেয়ায় পেশাদারিত্বের চেয়ে তোষামোদ প্রাধান্য পেয়েছে। ফলে ব্যাংকের সার্ভিস রুল এবং ইসলামী পরিবেশ- উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কাউন্টারে সেবার মান থেকে শুরু করে কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত আচরণেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

প্রশ্ন : বর্তমান সঙ্কটময় অবস্থা থেকে ইসলামী ব্যাংককে পুনরায় ‘মডেল প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে গড়তে আপনি কী কী পদক্ষেপ জরুরি মনে করেন?

মুহাম্মদ শামসুজ্জামান : আমি মনে করি নিচের সাতটি ক্ষেত্রে সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের মতো সংস্কার প্রয়োজন :

প্রথমত, কমপ্লায়েন্সের শত ভাগ বাস্তবায়ন করা, এ ব্যাপারে কোনো ছাড় নেই। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড (কৎড়ষষ-এর মতো প্রতিষ্ঠানের গাইডলাইন) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০০৯-এর সার্কুলার কঠোরভাবে মানতে হবে। আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা ও বিনিয়োগ (ঋণ) অনুমোদনে ইসলামী শরিয়াহ নীতিমালা ও বাংলাদেশ ব্যাংক সার্কুলার বিনা ব্যত্যয়ে মানা বাধ্যতামূলক। এ বিষয়ে আরো সুস্পষ্টভাবে একক গ্রাহক সীমা কোনোভাবেই লঙ্ঘন করা যাবে না। ইসলামী ব্যাংক এর তাবৎ বিপর্যয়ের শুরু এখান থেকেই।

দ্বিতীয়ত, মালিকানা পুনর্গঠন ও শেয়ার বাজেয়াপ্ত- অবৈধ বা বেনামি শেয়ারগুলো বাজেয়াপ্ত করে তা পুনরায় বিদেশী বা দক্ষ বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করতে হবে। কোনোভাবেই যেন একক পরিবারের হাতে ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার না থাকে। এর জন্য কোনো আইন সংশোধনের প্রয়োজন নেই। আইন বিদ্যমান আছে, এখন মানা দরকার।

তৃতীয়ত, আমানতকারীর আস্থা পুনরুদ্ধার- ২০২৫ সালে ব্যাংকটি যেভাবে নতুন ২২ হাজার কোটি টাকা আমানত সংগ্রহ করেছে, সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে আমানতকারীদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও লাভের নিশ্চয়তা দিতে হবে। ব্যাংক বাজার কম্পেটিটিভ হবে। যদিও ইসলামী নীতিমালায় মুদারাবায় লাভ নিশ্চিত নয় এবং এখানে ক্ষতির ঝুঁকিও আছে সাহেবে মাল এর। সে কারণেই এটা ইসলামী ব্যাংক। কিন্তু আপনি গ্রাহক চুজ করবেন, বিনিয়োগ করবেন এমন দায়সারা গোছের, একজনকে ভোল্ট খুলে টাকা দিবেন এবং দিনশেষে ক্ষতির দায়ভার গ্রাহকের ঘাড়ে ‘মুদারাবা’র নামে চালাবেন এটা শরিয়াহ সমর্থিত নয়। এর পর আবার তথাকথিত ‘হেয়ার কাট’ করবেন। এগুলোকে আমি ‘আর্ধিক ছোটলোকি’ নামে অভিহিত করি।

চতুর্থত, বিনিয়োগ তদারকি ও আদায়- বর্তমানে যে ৩৭ শতাংশ মন্দ ঋণের কথা শোনা যাচ্ছে, তা কমিয়ে আনতে ‘অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি’ (অগঈ) গঠন করতে হবে। অদক্ষ ম্যানেজারদের কারণে যে ওভারডিউ বাড়ছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। সব স্তরের কর্মকর্তাদের শাখার বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনার স্বাস্থ্য ভালো রাখতে ডেডিকেটেড হতে হবে। আপনি যদি প্রতিস্থাপনকে ভালোবাসেন, ওন করেন তা হলে সীমান্ত পাহারা দেয়া অতন্দ্র প্রহরীর মতো সদা জাগ্রত ও সচেতন হতে হবে। আমি ক্যাটাগরিক্যালি বলি, ব্যাংকগুলোতে ইদানীং একটা কালচার এমন গড়ে উঠেছে যে আগের ম্যানেজারের আমলে হওয়া ওভারডিও ও ক্লাসিফাইড নিয়ে বর্তমান ম্যানেজার নিশ্চুপ ও নিশ্চল থাকেন। মামলাগুলো তামাদি বা তদবিরবিহীন পড়ে থাকে, কোনো ফলোআপ নেই। তা হলে খেলাপি আদায় হবে কী করে ?

পঞ্চমত, পেশাদার ও দক্ষ এইচআর পলিসি- নতুন জনবল নিয়োগ হবে প্রোপার এসেসমেন্ট হবে, পর্ষদ অনুমোদন দিবে তার পর। ব্যাংকের খরচ কমাতে অতিরিক্ত জনবল কমানোর যে পরামর্শ বিশেষজ্ঞরা দিচ্ছেন, সেটি ভেবে দেখতে হবে। তবে সেটাও ঢালাওভাবে নয়। এর মধ্যে সবাই অযোগ্য নয়। অনেকের শিক্ষাগত সনদের ভার বেশি এবং ডিলিভারিও অপেক্ষাকৃত ভালো। ইতোমধ্যে ছাঁটাই করা লোকবলকে নিয়মিতকরণের জন্য, আমার জানামতে, প্রতিযোগিতামূলক বিকল্প পরীক্ষার সুযোগ দেয়া হলেও তা কার্যকর করা যায়নি তাদের অসহযোগিতার জন্য। আইনে বারিত না থাকলে ভবিষ্যৎ কোনো নিয়মিত নিয়োগে এদের বয়সসীমা বিবেচনায় নিয়ে ওই গ্রুপে আরো একবার প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নেয়ার সুযোগ দেয়া যেতে পারে এবং সেটাই হবে তাদের প্রতি চূড়ান্ত অনুকম্পা।

ষষ্ঠত, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংকিং- পরিচালক বা কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ বন্ধ করে পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। ‘ব্যাংক আগে, দল পরে’- এই নীতি হতে হবে মূলমন্ত্র। এটা খুব আনফরচুনেট যে আমাদের সম্মানিত রাজনীতিবিদরা ব্যাংক খাতের সেনসিটিভিটি সম্পর্কে কম অবহিত। ব্যাংক বরাবরই বিশ্বস্ত ও গ্রাহক আস্থার জায়গা। এখানে যারা গ্রাহক তারা সব দলেরই গ্রাহক। সব মতেরই বাহক। আপনার কি বিশ্বাস কেবল একটি বিশেষ ধর্ম ও একটি বিশেষ রাজনৈতিক বিশ্বাসের লোকেরাই এখানে আমানত রেখেছে? মোটেও নয়। এই প্রচারণা কেন করা হচ্ছে যে ইসলামী ব্যাংক অমুক দলের বা গোষ্ঠীর ব্যাংক! আপনি এসব মিথ্যা ও ফ্যাবরিক্যাটেড বয়ান দিয়ে আর্থিক সেক্টরের পিলার নড়বড়ে করে তুলছেন।

শেষত, শরিয়াহ বোর্ড ও সুশাসন- কেন্দ্রীয় শরিয়াহ বোর্ড পুনর্গঠন করতে হবে এবং প্রতিটি বিনিয়োগ যেন শরিয়াহ সম্মত হয়, তা কঠোরভাবে নজরদারি করতে হবে। আমি এ কথা সব সময় বলি এবং নিজেও ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে এ ব্যাপারে আনকম্প্রোমাইজড ছিলাম। এতে বিনিয়োগ কম হয়নি। এটা ব্যাংকারের দায়িত্ব, গ্রাহক তো অনৈতিক সুবিধা দিলে নিবেই। আপনি তার মনে পরকালভীতি জাগ্রত করুন, তাকে ইসলামী ব্যাংকের মোড ম্যাকানিজম বোঝান। এখানে শান্তি মিললে তিনি কেন সুদের দ্বারস্থ হবেন। আমি শেষবারে আবার স্মরণ করিয়ে দিই যে ইসলামী ব্যাংকের বিনিয়োগ সব সময়ই তদারকিভিত্তিক। তদারকি হেলাবে মালের মুভমেন্ট জানা থাকলে কোনো বিনিয়োগ খেলাপি হতে পারে না। পরীক্ষা করা যেতে পারে।