ব্রহ্মপুত্রে বিলীন হচ্ছে খোদাবক্সপুর গ্রাম

Printed Edition
ব্রহ্মপুত্র নদের আগ্রাসী ভাঙনে বিলীন হচ্ছে গৌরীপুরের খোদাবক্সপুর গ্রামের একটি সড়ক : নয়া দিগন্ত
ব্রহ্মপুত্র নদের আগ্রাসী ভাঙনে বিলীন হচ্ছে গৌরীপুরের খোদাবক্সপুর গ্রামের একটি সড়ক : নয়া দিগন্ত

সাজ্জাতুল ইসলাম ময়মনসিংহ

ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার ভাঙনামারী ইউনিয়নের খোদাবক্সপুর গ্রামে ব্রহ্মপুত্র নদের অব্যাহত ভাঙনে গত দুই বছরে বাস্তুচ্যুত হয়েছে প্রায় ১৫০টি পরিবার। ভাঙনের কারণে গ্রামের প্রায় অর্ধেক এলাকা এর আগে নদে বিলীন হয়ে গেছে। চলতি বর্ষা মৌসুমেও ১৫ থেকে ২০টি পরিবার তাদের ঘরবাড়ি সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। বর্তমানে জিও ব্যাগ ফেলে সাময়িক ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করা হলেও স্থায়ী প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় বাসিন্দারা।

গতকাল শনিবার সরেজমিন দেখা যায়, নদতীরবর্তী বাড়িগুলোর উঠান ও ঘরের কোলঘেঁষে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলো তাদের ঘরবাড়ির টিন, আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় মালামাল নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছে। অনেকেই নিজেদের উদ্যোগে ঘর ভেঙে ব্রহ্মপুত্রের ওপারে জেগে ওঠা চরে অথবা স্বজনদের জমিতে নতুন করে বসতি স্থাপন করছেন।

ভাঙনের কারণে খোদাবক্সপুর গ্রামের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আশির দশক থেকে শুরু হওয়া ভাঙন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরো তীব্র রূপ নিয়েছে। গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা আবদুল মান্নান জানান, ১৯৮৮ সালের পর থেকে দফায় দফায় এর ভাঙনে তার প্রায় ২০ একর কৃষিজমি ও বসতভিটা বিলীন হয়েছে। এ পর্যন্ত তিনি পাঁচবার বাড়ি সরাতে বাধ্য হয়েছেন। সম্প্রতি তার আরো দু’টি ঘর নদে তলিয়ে গেছে। ফলে গৃহহীন হওয়ায় তার দুই ছেলে চরের জমিতে বসতি গড়েছেন।

একই গ্রামের বাসিন্দা সোহেল রানা জানান, এর আগে তিনবার ভাঙনে তাদের ৩০ থেকে ৩৫ কাঠা কৃষিজমি বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে তাদের ভিটায় থাকা আটটি ঘরই ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনের মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। এভাবে বারবার বাড়িঘর স্থানান্তর ও কৃষিজমি হারানোয় এলাকার বেশির ভাগ পরিবার আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। আয়-রোজগারের পথ বন্ধ হওয়ায় অনেকেই ঋণগ্রস্ত হয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন।

স্থানীয় ভুক্তভোগী এলাকাবাসী জানান, জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন সাময়িকভাবে ঠেকানোর চেষ্টা করা হলেও তা দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য পর্যাপ্ত নয়। গ্রামটিকে পুরোপুরি বিলীন হওয়া থেকে রক্ষা করতে টেকসই ও স্থায়ী প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের কোনো বিকল্প নেই।

ময়মনসিংহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী শামীম হাসনাইন মাহমুদ বলেন, গৌরীপুরের খোদাবক্সপুর, ঈশ্বরগঞ্জের মরিচারচরসহ সদর উপজেলার কয়েকটি এলাকায় ব্রহ্মপুত্রের ভাঙন দেখা দিয়েছে। বর্তমানে প্রায় ২৭০ মিটার এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চলছে, যা আগামী ১০ দিনের মধ্যে শেষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া এলাকাটিতে স্থায়ী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ডিপিপি প্রণয়নের কাজ চলছে এবং পরে সিসি ব্লক দিয়ে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মো: সাইফুর রহমান বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা তৈরি করে শুকনো খাবার ও আর্থিক সহায়তা দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের জন্য পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে লিখিত সুপারিশ পাঠানো হয়েছে। এর ভাঙনের অন্যতম প্রধান কারণ অবৈধভাবে বালু উত্তোলন। গত তিন মাসে অভিযান চালিয়ে ৪৭টি ড্রেজার ধ্বংস করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট ও নিয়মিত মামলা করা হচ্ছে।