অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
সংশোধন-পরবর্তী সূচকের উন্নতির ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে দেশের পুঁজিবাজার। গতকাল টানা দ্বিতীয় দিনের মতো সূচকের উন্নতি ঘটেছে দুই পুঁজিবাজারে। এর আগে গত ১৫ ও ১৬ জুন বাজারগুলো সংশোধনের শিকার ছিল। তবে সূচকের এ ধারাবাহিক উন্নতি সত্ত্বেও অবনতি ঘটেছে ঢাকা শেয়ারবাজারের লেনদেনে। অন্য দিকে সাম্প্রতিক সময়ের সর্বোচ্চ লেনদেন নিষ্পত্তি করেছে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজার। এ ছাড়া ঢাকায় লেনদেনে অংশ নেয়া কোম্পানির বেশির ভাগ দরপতনের শিকার হলেও লেনদেন হওয়া কোম্পানির বেশির ভাগের দর বেড়েছে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে।
গতকালের বাজার আচরণকে বিশ্লেষকরা সংশোধন-পরবর্তী স্বাভাবিক আচরণ হিসেবেই দেখছেন। তারা মনে করেন, বেশ ক’দিন টানা বৃদ্ধির পর সম্প্রতি সংশোধন ঘটেছে পুঁজিবাজারে। বিনিয়োগকারীদের অনেকেই ইতোমধ্যে তাদের মুনাফার একটি অংশ তুলে নিয়েছেন। এ মুহূর্তে তারা বাজার পর্যবেক্ষণ করছেন। নতুন বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিয়ে তারা আবার নিজেদের অবস্থান নেবেন। তাই সংশোধন-পরবর্তী বাজারের গতি কিছুটা হলেও হ্রাস পায়।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাম্প্রতিক সংশোধনের পর গতকাল টানা দ্বিতীয় দিনের মতো বেড়েছে বাজার সূচক। এক দিকে গত দুই দিন দরপতনের শিকার ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান গতকাল হারানো দরের একটি অংশ ফিরে পেয়েছে। এ ছাড়া টেলিকমিউনিকেশন খাতের মূল্যবৃদ্ধিও দিনের সূচকের উন্নতিতে বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছে; অন্য দিকে এই কয়েকটি খাতের বাইরে বেশ কয়েকটি খাতে ঘটেছে সংশোধনও। এদের মধ্যে ছিল সিরামিকস, তথ্যপ্রযুক্তি, জ্বালানি ও টেক্সটাইল খাত। আবার প্রকৌশল, ওষুধ ও রসায়ন, খাদ্য ও আনুষঙ্গিক ও বিবিধ খাতে এরই অংশ হিসেবে ঢাকা শেয়ারবাজারে লেনদেনের কিছুটা অবনতির পাশাপাশি এ দিন লেনদেনে অংশ নেয়া কোম্পানির বেশির ভাগ দরপতনের শিকার ছিল।
প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৩৯ দশমিক ৭৫ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। ৫ হাজার ৬২১ দশমিক ৬২ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি বৃহস্পতিবার লেনদেন শেষে পৌঁছে যায় ৫ হাজার ৬৬১ দশমিক ৩৮ পয়েন্টে। বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ৩০ দশমিক ০৭ ও ১৪ দশমিক ০৪ পয়েন্ট। অন্য দিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক গতকাল ১১৬ দশমিক ৫৬ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। ১৫ হাজার ২৪৯ দশমিক ৮১ পয়েন্ট থেকে দিন শুরু করা সূচকটি গতকাল দিনশেষে ১৫ হাজার ৩৬৬ দশমিক ৩৭ পয়েন্টে স্থির হয়। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ২১২ দশমিক ৭৫ ও ৭৪ দশমিক ৩৫ পয়েন্ট।
সূচকের উন্নতি সত্ত্বেও গতকাল লেনদেন কিছুটা কমেছে ঢাকা স্টকে। বাজারটি গতকাল এক হাজার ১৯৩ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে, যা আগের দিন অপেক্ষা ১৮ কোটি টাকা কম। বুধবার ডিএসইর লেনদেন ছিল এক হাজার ২১১ কোটি টাকা। তবে লেনদেনে এগিয়ে রয়েছে চট্টগ্রাম স্টক। বাজারটি এ দিন ৮৪ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে, যা ছিল সাম্প্রতিক সময়ে বাজারটির সর্বোচ্চ। গত দুই বছরের মধ্যে সিএসইর লেনদেন আর এ পর্যায়ে পৌঁছেনি।
এ দিকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর ঋণপ্রাপ্তির েেত্র বিদ্যমান ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (সিআইবি) নীতিমালায় পরিবর্তন আনার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজ (বিএপিএলসি)। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সাথে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে বিএপিএলসির সভাপতি রিয়াদ মাহমুদের নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিতনিধিদল এ দাবি উত্থাপন করে।
সংগঠনটির মতে, কোনো কোম্পানির পরিচালক বা মনোনয়নকারী প্রতিষ্ঠানের ঋণখেলাপি অবস্থার কারণে আর্থিকভাবে সুস্থ কোম্পানিকে তিগ্রস্ত করা উচিত নয়। গভর্নরের সাথে অনুষ্ঠিত বৈঠকে দেশের শীর্ষস্থানীয় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম ও প্রবৃদ্ধির পথে থাকা বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে আলোচনা হয়। বিশেষ করে সিআইবি প্রতিবেদনের কারণে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর যেসব জটিলতা তৈরি হচ্ছে, তা গুরুত্বের সাথে তুলে ধরে সংগঠনটি।
বর্তমান ব্যবস্থায় কোনো মনোনয়নকারী প্রতিষ্ঠান যেমন মূল কোম্পানি বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হলে, সেই প্রতিষ্ঠানের মনোনীত পরিচালক যে কোম্পানির পর্ষদে রয়েছেন, সেই কোম্পানিটিও নানা ধরনের সমস্যার মুখে পড়ে। অথচ সংশ্লিষ্ট কোম্পানিটি আর্থিকভাবে লাভজনক ও বিধিবিধান মেনে পরিচালিত হলেও ঋণপ্রাপ্তি এবং ব্যবসা পরিচালনায় প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়। বিএপিএলসির নেতারা মনে করেন, এ ধরনের ‘প্রক্সি ডিফল্ট’ বা পরো ঋণখেলাপি ধারণা ব্যবসার জন্য অযৌক্তিক বাধা সৃষ্টি করছে। তাই কোনো কোম্পানির ঋণযোগ্যতা মূল্যায়নের েেত্র কোম্পানির নিজস্ব আর্থিক সমতা ও কর্মদতাকে বিবেচনায় নেয়া উচিত।
সংগঠনটি আরো জানায়, বর্তমানে কোনো গ্রুপের একজন উদ্যোক্তা, পরিচালক বা জামিনদারের সিআইবি প্রতিবেদন নেতিবাচক হলে একই গ্রুপের অন্যান্য কোম্পানির ঋণসুবিধাও কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। এতে আর্থিকভাবে সম ও নিয়ম মেনে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোও তিগ্রস্ত হচ্ছে।
এ দিকে গতকাল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেনে শীর্ষ কোম্পানি ছিল বেক্সিমকো গ্রুপের ওষুধ ও রসায়ন খাতের কোম্পানি বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস। ৬০ কোটি ৯৭ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ৪৩ লাখ ৬০ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় এ দিন। ৫৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকায় ৯১ লাখ ১২ হাজর শেয়ার বেচাকেনা করে লেনদেনের দ্বিতীয় স্থানে ছিল সেবা খাতের কোম্পানি সামিট অ্যালাইয়েন্স পোর্ট। ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে আইপিডিসি, রবি অজিয়াটা, এনসিসি ব্যাংক, ন্যাশনাল ফিড মিলস, বিডি থাই অ্যালুমিনিয়াম, ব্র্যাক ব্যাংক, বিডি থাই ফুডস ও এপেক্স স্পিনিং।



