ন্যাটোতে সামরিক সহায়তা কমাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

ইউরোপের নিরাপত্তায় দীর্ঘদিনের প্রধান অংশীদার হলেও উত্তর আটলান্টিক জোটে সামরিক সহায়তা কমানোর পরিকল্পনা নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির প্রশাসন জোটভুক্ত ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর প্রতিরক্ষা দায়িত্ব আরো বেশি করে ছেড়ে দিতে চায় বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে জানা গেছে।

নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক খবরের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, সঙ্কটকালীন পরিস্থিতিতে ন্যাটোর জন্য বরাদ্দ মার্কিন সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর আওতায় যুদ্ধবিমান, নজরদারি বিমান, আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান এবং কিছু নৌসামরিক সম্পদের সংখ্যা হ্রাস করা হতে পারে।

এই খবর অনুযায়ী, ইউরোপে ন্যাটো অভিযানের জন্য বরাদ্দ যুদ্ধবিমানের সংখ্যা কমানোর কথা বিবেচনা করছে ওয়াশিংটন। পাশাপাশি সামুদ্রিক নজরদারি সক্ষমতা এবং আকাশপথে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাতেও কাটছাঁট আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর আগে মে মাসে ইউরোপীয় মিত্রদের জানানো হয় যে, সঙ্কট বা যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ন্যাটোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র যে সামরিক শক্তি প্রস্তুত রাখে, তার পরিধি ছোট করা হবে। একই সাথে ইউরোপীয় দেশগুলোকে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা দ্রুত বাড়ানোর আহ্বানও জানিয়েছে ওয়াশিংটন।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ন্যাটো মিশনের জন্য বরাদ্দ করা যুক্তরাষ্ট্রের এফ-১৬ ও এফ-১৫ই যুদ্ধবিমানের সংখ্যা প্রায় ১৫০ থেকে কমিয়ে ১০০ করা হতে পারে। একই সাথে সামুদ্রিক টহল বিমানের সংখ্যা ২৬ থেকে কমিয়ে ১৫-এ নামিয়ে আনার কথাও বিবেচনায় রয়েছে।

এ ছাড়া বর্তমানে ইউরোপের জন্য বরাদ্দ করা আকাশপথে জ্বালানি সরবরাহকারী আটটি বিমান প্রত্যাহারের পরিকল্পনাও রয়েছে। এসব বিমান ন্যাটো বাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি অভিযান পরিচালনা এবং যুদ্ধবিমানগুলোর কার্যক্ষমতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।

খবরে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, এই পুনর্বিন্যাসের আওতায় একটি বিমানবাহী রণতরী, একটি ক্ষেপণাস্ত্রবাহী সাবমেরিন, কয়েকটি যুদ্ধজাহাজ এবং কৌশলগত বোমারু বিমানও অন্যত্র স্থানান্তর করা হতে পারে। ফলে ইউরোপ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি আগের তুলনায় কমে যেতে পারে।

ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের মতে, এই পদক্ষেপ ন্যাটোর দূরপাল্লার হামলা পরিচালনার সক্ষমতা এবং আকাশপথে নজরদারি কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে বর্তমান বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে এ ধরনের সক্ষমতা ন্যাটো জোটের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, আঞ্চলিক সঙ্ঘাত ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে ন্যাটোর ভূমিকা আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এমন প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের এই পরিকল্পনা মিত্র দেশগুলোর মধ্যে নতুন করে আলোচনা ও উদ্বেগের জন্ম দিতে পারে। তবে এখনো এই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এবং সময়সীমা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট মহল পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে এবং ন্যাটোর ভবিষ্যৎ সামরিক সক্ষমতার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে মূল্যায়ন করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এ পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর কৌশলগত পুনর্বিন্যাসের অংশ। বর্তমান প্রশাসন ইউরোপের পরিবর্তে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বেশি মনোযোগ দিতে আগ্রহী। ফলে ইউরোপের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ন্যাটোর সদস্য দেশগুলোকেই আরো বড় ভূমিকা নিতে হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এ সিদ্ধান্তে ইউরোপের কয়েকটি দেশের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ও সহায়তা কমে গেলে রাশিয়ার সম্ভাব্য হুমকির মুখে জোটের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা দুর্বল হতে পারে। অন্য দিকে ন্যাটোর সামরিক কর্মকর্তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পিত পরিবর্তনের পরও জোটের প্রতিরোধ সক্ষমতা বজায় থাকবে। একই সাথে সম্ভাব্য ঘাটতি পূরণে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এ পদক্ষেপ ন্যাটোর ভবিষ্যৎ কাঠামো ও ইউরোপের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি এবং নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা জোরদারের প্রশ্নটি এখন আরো বেশি গুরুত্ব পাবে।